লবকুশ : বাল্মীকি যে উত্তরকাণ্ড রচনা করেননি, সে ইঙ্গিত মেলে রামায়ণের চতুর্থ সর্গের সপ্তম শ্লোকে। বাল্মীকি নারদের নির্দেশে যে রামকথা লিখেছিলেন, তার নাম ছিল ‘পৌলস্ত্যবধ কাব্য’–“কাব্যং রামায়ণং কৃৎস্নং সীতায়াশ্চরিতং মহৎ।/পৌলস্ত্যবধ ইত্যেবং চকার চরিতঃ৷” লবকুশকে আমরা উত্তরকাণ্ডেই পাই। উত্তরকাণ্ডের কবিই এই চরিত্র দুটি সৃষ্টি করেছেন। বাল্মীকি লবকুশ সৃষ্টি করেননি বলেই অনেক পণ্ডিতগণ মনে করেন। এখন প্রশ্ন লবকুশ যদি রাম-সীতার সন্তান হন, তবে কীভাবে বাল্মীকির চোখ এড়িয়ে গেল? বাল্মীকির কিছুই চোখ এড়ায় না, এক্ষেত্রেও এড়ায়নি। চোখ এড়িয়েছে উত্তরকাণ্ডের কবির। আগেপিছে কিছু না-দেখে একটা আষাঢ়ে গপ্পো ফেঁদে বসলেন। সীতার যখন গর্ভসঞ্চার হয় তখন তাঁর বয়স ছিল ১৮ + ১২ + ১৪ + ২৭ (১৮ বছর বয়সে বিয়ে + ১২ বছর স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে অযোধ্যার রাজগৃহে বাস + ১৪ বছর বনবাস + ২৭ বছর। বনবাসোত্তর স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বসবাস) = ৭১ বছর, মতান্তরে ৬ + ১২ + ১৪ + ২৭ = ৫৯ বছর। সীতাকে পরিত্যাগ করার পর বাল্মীকির আশ্রমে ১০ বছর যাপন। অশ্বমেধ যজ্ঞের সময়কালে রাম যখন দেখেন তখন লব ও কুশের বয়স ১০ বছর। এই ১০ বছর পিতার স্নেহ তো দূরের কথা, পিতার মুখ পর্যন্ত দেখার সুযোগ হয়নি দুর্ভাগা পুত্রদ্বয়ের।
বিজ্ঞান বলছে, বাস্তবিক কোনো নারী এই বয়সে গর্ভধারণ করতে পারেন না। নারীর গর্ভধারণের সময় কিছু কমবেশি ১২ বছর থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। মেনোপোজ বা পিরিয়ড বন্ধ হয়ে গেলে কোনো নারীর পক্ষেই সন্তানধারণ করা সম্ভব নয়। চরকসংহিতার পঞ্চম অধ্যায়ের চিকিৎসাস্থানে বলা হয়েছে–“দ্বাদশাদ্বৎসরাদূর্ধমা পঞ্চাশৎসমাঃ স্ত্রিয়ঃ।/মাসি মাসি ভগদ্বারা প্রকৃত্যৈবার্তবংস্রেবেৎ।” অর্থাৎ, স্ত্রীলোকের বারো বছর বয়সের পর থেকে পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত স্বভাবতই প্রতিমাসে তিনদিন করে রজঃ যোনিমুখ দিয়ে প্রস্রত হয়। চরক মুনি আরও বলেছেন–“দিনে ব্যতীতে নিয়তং সঙ্কুচিত্যম্বুজং যথা/ঋতৌ ব্যতীতে নাৰ্য্যাস্তু যোনিঃ সংব্রিয়তে তথা।” অর্থাৎ, দিনের শেষে যেমন পদ্ম সংকুচিত হয়, তেমনই ঋতুকাল অতিক্রান্ত হলে নারীদের যোনিও (জরায়ুপথ) সংকুচিত হয়ে যায়। অতএব এমন ভুল মহাকবি বাল্মীকি করতে পারেন না।
“রামঃ সীতানুপ্রাপ্য রাজ্যং পুনরবাপ্তবান্।/পিলয়ামাস চৈবেমাঃ পিতৃবনূদিতাঃ প্রজাঃ/অযোধ্যাপতিঃ শ্রীমান্ রামো দশরথাত্মজঃ।” মহাকবি তাঁর রামচরিত এভাবেই শেষ করেছেন। পরে আর কিছু ছিল না বলাই যায়। তবে পণ্ডিতগণ বলেন, মহাকাব্য এভাবে শেষ হয় না। অতএব উত্তরকাণ্ড বাল্মীকি লিখতেই পারেন। যেভাবে হোমারকে ইলিয়াডের পরেও ওডিসি গ্রন্থটি লিখতে হয়েছিল।
কিন্তু বাল্মীকি যে স্বয়ং বলেছেন–“প্রাপ্তরাজ্যস্য রামস্য বাল্মীকিৰ্ভগবানৃষিঃ।/চকার চরিতং কৃৎস্নং বিচিত্রপদমর্থবৎ।/চতুর্বিংশ সহস্রাণি শ্লোকানামুক্তবানৃষিঃ।/তথা সৰ্গ শতা পঞ্চ ষট্ কাণ্ডানি তথোত্তরম্।/কৃত্বাঃ তু তন্মহাপ্রাজ্ঞঃ সভবিষ্যং সহোত্তরম্।/চিন্তয়মানস্য মহর্ষের্ভাবিতাত্মনঃ।/অগৃহীতাং ততঃ পাদৌ মুনিবেশৌ কুশীলবৌ।/কুশীলবৌ তু ধৰ্ম্মজ্ঞে রাজপুত্রৌ যশস্বিনৌভ্রাতরৌ স্বরসম্পন্নৌ দদশাশ্রমবাসিনৌ।” কেদারনাথ মজুমদারের “রামায়ণের সমাজ” গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি উল্লেখ করতে পারি–“কুশীলবকে যে সীতার পুত্রদ্বয় বলিয়া পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা হইয়াছে, এবং নবম ছত্রে ঐ কুশীলবকে ‘রাজপুত্রৌ ও দশম ছত্রে ‘ভ্রাতরৌ’ বলিয়া যে নির্দেশ করা হইয়াছে, তাহা নারদ কথিত রামচরিত উপাখ্যানের বহির্ভূত। মুনিবেশৌ কুশীলবৌ’ প্রয়োগে আমাদের মোটেই কোনো আপত্তির কারণ নেই। ইহার অর্থ মুনিবেশধারী গায়কদ্বয়। বাল্মীকি রামচরিত গীতের জন্য রচনা করিয়াছিলেন এবং তাহা কুশীলব (গায়ক) দ্বারাই গান করাইয়া প্রচার করিয়াছিলেন। আমরা ‘কুশীলবৌ’ প্রয়োগটিকে সংগ্রাহকের প্রয়োগ বলিয়াই মনে করি; ইহার অর্থ ‘গায়কদ্বয়।এইএএএএ এই ‘কুশীলবৌ’ শব্দটিকে সীতার ‘রাজপুত্রৌ ও সেই প্রয়াস প্রসূত নবম ও দশম পংক্তির ‘পুত্রদ্বয়’ করিবার যে প্রয়াস ‘ভ্রাতরৌ’ ইত্যাদি শব্দ প্রয়োগকে উত্তরকাণ্ড রচয়িতার প্রয়াস বলিয়া নির্দেশ করিতেছি। উত্তরকাণ্ড রচয়িতা উক্ত কাণ্ডটিকে মূল রামায়ণের অঙ্গরূপে গণ্য করাইবার জন্য, এই সকল শব্দ প্রয়োগ করিয়াছিলেন এবং কোন কোন পংক্তি ও সর্গ নূতন করিয়া লিখিয়া দিয়াছিলেন।”
রাম-সীতার বিবাহের পর দীর্ঘ সাতাশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এর মাঝে অবশ্য বছর দুয়েক রামকে ছাড়াই সীতার একাকী জীবন লঙ্কায়। বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রী যেমন একত্রে একশয্যায় বসবাস করেন, রাম-সীতাও সেইভাবেই বসবাস করেছেন। তা সত্ত্বেও তাঁরা নিঃসন্তান। অন্যদিকে ভরত, লক্ষ্মণ, শত্রুয় সকলেই দুটি করে পুত্রসন্তানের পিতা হয়ে গেছেন। এঁরা কীভাবে জোড়া জোড়া পুত্রের পিতা হয়েছিলেন, সে ব্যপারে রচয়িতা অবশ্য নীরব। রামভক্তরা হয়তো বলতে পারেন শ্রীরামচন্দ্র আর পাঁচটি পাতি মানুষের মতো নয়, রামচন্দ্র স্বয়ং বিষ্ণু। তিনি ব্রহ্মচর্য পালন করতেন। তাই তিনি নিঃসন্তান। এখন প্রশ্ন, রাম কেন ব্রহ্মচর্য পালন করতে যাবেন? রামকে তো কেউ ব্রহ্মচর্য পালন করতে শর্ত দেননি। বাল্মীকি তো তেমন কিছু বলেননি। রাম তো ভীষ্ম নয়। রাম তো সেই বিরল পুরুষ চরিত্র ভীষ্ম নয়, যিনি শত প্রলোভনেও ত্যাগ করতে পারেন নারীসঙ্গ, কামতেজ। রামভক্তদের বলি, লবকুশের বিষয়ে আপনারা যদি রামকে বাঁচাতে যান, তাহলে সীতা মারা যাবেন। সীতা কলঙ্কিত হবেন। সীতার সন্তানদের পিতাকে নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন উঠে আসবে। রাবণ সন্দেহজনক হবে। আর যদি রামের বিপক্ষে থাকেন তাহলে বিবাহ-পরবর্তী সাতাশ বছরের হিসাবটাও মিলিয়ে দিতে হবে, তাই না? কারণ যাঁদের দীর্ঘ সাতাশ বছরে কিছু হল না, সেখানে সীতা লঙ্কা-ফেরত হয়েই গর্ভবতী! যদি এটা সংগত না-হয়, গোটা উত্তরকাণ্ডও সংগত হতে পারে না।
