শত্রুঘ্ন : রাজা দশরথের স্ত্রী সুমিত্রার গর্ভজাত যমজ পুত্রের মধ্যে লক্ষ্মণ জ্যেষ্ঠ ও শত্রুঘ্ন কনিষ্ঠ। ইনি লক্ষ্মণ ও রামের অনুগত ও সহায় ছিলেন। রামের বনগমনে পুত্রশোকে দশরথ দেহত্যাগ করেন। তখন শত্রুঘ্ন ভরতের সঙ্গে ভরতের মাতুলালয়ে ছিলেন। শত্রুঘ্নের সঙ্গে জনকরাজার কনিষ্ঠ ভ্রাতার অন্যতমা কন্যা শ্রুতকীর্তির বিবাহ হয়। রামের নির্বাসনে ইনি এতদূর বিরক্ত ও মর্মাহত হয়েছিলেন যে সকল অনর্থের মূল কৈকেয়ীর দাসী মন্থরাকে নিগৃহীত করেন এবং কৈকেয়ীকে কঠোর ভর্ৎসনা করেন। কবিবর বাল্মীকি শত্রুঘ্নর জন্য এটুকু কাজই। বরাদ্দ করেছিলেন। এর বেশি নয়। প্রায় ঠুটো জগন্নাথ!!
পরবর্তী প্রক্ষিপ্ত-সংসোজক রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে শত্রুঘ্নর কিছু কাজ সংযোজন করে দিলেন। তা না-হলে যে শত্রুঘ্নর নামের প্রতি সুবিচার হয় না! বন-ফেরত রামের রাজত্বকালের প্রথম বছরেই শত্রুঘ্নকে পাঠিয়ে দিলেন মথুরায় লবণাসুরকে হত্যা করতে। অযোধ্যা শত্রম্নমুক্ত হল। ভরতের কাছ থেকে শত্রুঘ্নকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া গেল। ভরত গন্ধবদেশ জয় করে ওখানেই থেকে গেলেন এবং শত্রুঘ্নকে মথুরার রাজপদে রাম অভিষিক্ত করে দিলেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। সঙ্গে লবণবধের জন্য চার হাজার ঘোড়া, দুই হাজার রথ আর একশো হাতি পাঠিয়ে দিলেন। সেনাদের একমাস আগে পাঠিয়ে দিয়ে শত্রুঘ্নকে একা শরাসন হাতে দিয়ে পাঠালেন। অযোধ্যায় ফিরে আসার কোনো অনুমতি ছিল না শত্রুঘ্নর। পাছে অযোধ্যা আক্রমণ করে বসে সেই সতর্কতায় কি সৈন্যবাহিনীসহ শত্রুঘ্নকে অযোধ্যায় অবস্থান করতে দেননি? শত্রুঘ্ন মধুদৈত্যের পুত্র লবণাসুরের মুখোমুখি হলেন। এসময় যমুনাতীরবাসী মহর্ষিরা অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে উঠছিল। শত্রুঘ্ন রামের আদেশে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযান করেন। লবণাসুর শত্রুঘ্নকে হুংকার দিলেন, বললেন–“পূর্বে অনেক বীরকে তৃণের মতো তুচ্ছ করে যমালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি।” জবাবে শত্রুঘ্নও বললেন–“শত্রুঘ্ন ন তদা জাতো যদান্যে নির্জিতস্তয়া।/তদদ্য বাণাভিহত ব্ৰজ ত্বং যমসদন।” অর্থাৎ, “তুমি যখন বীরদের যমালয়ে পাঠিয়েছিলে তখন শত্রুঘ্নর জন্ম হয়নি। এখন তুমি আমার বাণে যমালয়ে যাও।” এরপর তাঁকে শূলহীন অবস্থার সুযোগ নিয়ে আক্রমণ করেন এবং বিনষ্ট করেন। দেবতা প্রদত্ত শূলের জন্যই মধুদৈত্যের মতো তাঁর পুত্র লবণও অজেয় ছিল। লবণবধের পর শত্রুয় লবণের মথুরারাজ্য নিজের পুত্র সুবাহু ও শত্রুঘাতাঁকে অর্পণ করেন। সুবাহু পরবর্তীকালে মথুরার রাজা হিসাবে অভিষিক্ত হন। শত্রুঘাতী ছিলেন বিদিশার রাজা। এরপর শত্রুঘ্ন রামের সঙ্গে সরযু নদীতে প্রবেশ করে দেহত্যাগ করেন। মোদ্দা কথা, একটিমাত্র শত্রু হত্যা করে তিনি শত্রু।
শান্তা : রামায়ণে শান্তা নামে একটি চরিত্র পাওয়া যায়। রাজা দশরথের ও দশরথের পরম বন্ধু অঙ্গাধিপতি রাজা রোমপাদের পালিতা কন্যা। রাজা লোমপাদ যজ্ঞ করার জন্যে বিভাণ্ডক মুনির পুত্র ঋষ্যশৃঙ্গকে নিজের রাজধানীতে নিয়ে আসেন। যজ্ঞশেষে তিনি নিজের পালিতা কন্যা শান্তাকে ঋষ্যশৃঙ্গের হাতে তুলে দেন। শান্তার সঙ্গে ঋষ্যশৃঙ্গের বিবাহ হয়।
কিন্তু কবিরা তাঁর প্রতি বিন্দুমাত্র সুবিচার করেননি। অযোধ্যাপতি দশরথ ও তার প্রধানমহিষী কৌশল্যার প্রথম সন্তান হলেন শান্তা। সম্ভবত শান্তাই হলেন রামায়ণের সবথেকে স্বল্পত চরিত্র। শান্তা রামচন্দ্রের অগ্রজা, বড়ো দিদি। যথাক্রমে শান্তা, রাম, লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্রুঘ্ন–এই হল চার ভাই, এক বোন। শান্তা রামচন্দ্রের দিদি নিশ্চয়ই, কিন্তু দশরথের ঔরসজাত সন্তান নয় বলেই অনেকে মনে করেন। রাজা দশরথের সন্তানদানে অক্ষমতা ও দুর্বলতাকে নানা গল্পে জড়ানো হয়েছে। শান্তা কৌশল্যার ক্ষেত্রজ সন্তান–যা রাম-লক্ষ্মণদের মতো নিয়োগ প্রথার ফসল। অনেক পণ্ডিত মনে করেন, ঋষ্যশৃঙ্গের নিয়োগে বা কৃপায় (কৃপা = করে যা পাওয়া) রাম, লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্ৰুগ্নদের জন্ম হয়েছে। শান্তার জন্মবৃত্তান্ত নিয়েও বহু গল্প আছে। কোনও কোনও রামায়ণ বলে, রাবণ যখন জানলেন, দশরথের পুত্রের হাতে তাঁর বিনাশ, তিনি নতুন উপায় বের করলেন। শিবের কাছে বর প্রার্থনা করলেন, দশরথের যেন কোনও পুত্র না জন্মায়। তাঁর বর মঞ্জুর হল।
শান্তার জন্ম হয়েছে রোমপাদের নিয়োগে। রোমপাদ পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে না-পারার ব্যর্থতায় সম্ভবত পরবর্তীতে ঋষ্যশৃঙ্গের ডাক পড়ে। ঋষ্যশৃঙ্গ হতাশ করেননি। ঋষ্যশৃঙ্গ রোমপাদের পুত্রসন্তান। একটি নয়, দুটি নয়–চারটি পুত্রসন্তান উপহার দিলেন। দশরথ ও কৌশল্যার মেয়ে হয়ে জন্মালেও অঙ্গরাজ রোমপাদ ও তাঁর মহিষী ভার্ষিণী (যে সম্পর্কে কৌশল্যার বোন) তাকে দত্তক নেয়। ঋষি বিভাণ্ড ও স্বৰ্গবেশ্যা উর্বশীর পুত্র ঋষ্যশৃঙ্গকে বিবাহ করে উনি উনার পিতার রাজ্যকে খরামুক্ত করেছিলেন। পরবর্তীকালে উনার ও রাজা দশরথের অনুরোধে ঋষ্যশৃঙ্গ পুত্রকামাষ্টি যজ্ঞ করেন। যার ফলে কৌশল্যা ও দশরথের অন্য দুই স্ত্রী কৈকেয়ী ও সুমিত্রাও গর্ভধারণ করেন। ঋষ্যশৃঙ্গকে বাল্মীকির রামায়ণে আমদানি করিয়ে প্রক্ষিপ্ত-কবিরা বড়োই দ্বন্দ্বে ফেলে দিয়েছেন। জটিলতা বাড়িয়েছেন। তবে গোটা রামায়ণে আর কোথাও শান্তাকে পাওয়া যায়নি।
