সুবিপুল বানরসেনা, রাম-লক্ষ্মণের অস্ত্র-নিপুণতা আর বিভীষণের জ্ঞাতিবিরোধিতায় রাবণ পরাজিত হলেন। গুপ্তপথ, গুপ্তচর, গুপ্তঅস্ত্র–সবই রামকে চিনিয়ে দিয়েছিলেন বিভীষণ। বিভীষণ না-থাকলে রামের পক্ষে রাবণ নিকেশ অত সহজে সম্ভব হত না। বিভীষণ থাকলে একটা মামুলি বানরও রাবণ হত্যায় সক্ষম হতেন। রামের প্রয়োজন হত না। রাবণ রামের অপেক্ষা কয়েকশো গুণ শক্তিশালী ও বীর ছিলেন। একথা রামই স্বীকার করেছেন–“মহাত্মা বলসম্পন্নো রাবণো লোকরাবণঃ”। সেইজন্যই বোধহয় কবি রাবণের দশ মাথা কুড়ি হাত কল্পনা করেছেন। উত্তরকাণ্ডে রামের আত্মহননের সময় বিভীষণও সঙ্গী হয়েছিলেন।
এই বিভীষণকেই আমরা মহাভারতেও দেখা পাই। সেটা আবার কীভাবে সম্ভব হল!! মহাভারত বলছে–পাণ্ডবরা যখন রাজাসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেন, তখন বিভীষণ তাঁদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এবং তাঁদের বহুমূল্য সমস্ত সামগ্রী ও উপহার প্রদান করেন।
মন্দোদরী : মন্দোদরী প্রথমে রাবণের স্ত্রী এবং পরে বিভীষণের স্ত্রী। মন্দোদরী ছিলেন অ-সুররাজ ময়দানবের ও স্বর্গবশ্যা হেমার কন্যা। ময়দানব অ-সুর জাতির প্রখ্যাত স্থপতি। রামায়ণের কোনো কোনো সংস্করণ অনুযায়ী বলা হয়েছে–মন্দোদরী রামের স্ত্রী সীতারও গর্ভধারিণী মা। উল্লেখ্য, এই সীতাকেই তাঁর স্বামী রাবণ অপহরণ করে লঙ্কায় এনেছিলেন। সীতা, না বেদবতী? মন্দোদরী বারবার সীতাকে রামের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য রাবণকে পরামর্শ দিয়েছিলেন এই কারণেই। কিন্তু রাবণ তাঁর কথায় কর্ণপাত করেননি। তবে রামায়ণগুলিতে রাবণের প্রতি মন্দোদরীর ভালোবাসা ও আনুগত্যেরই প্রশংসা করা হয়েছে। রামায়ণের একাধিক সংস্করণে রামের বানরসেনার হাতে মন্দোদরীর হেনস্থার উল্লেখ পাওয়া যায়। হেনস্থার ব্যাপারটা অস্বাভাবিক কিছু ভাবার অবকাশ নেই, এমন তো আজও হয়! কৃত্তিবাসের রামায়ণেও তো বলা হয়েছে,–বানরেরা মন্দোদরীকে টেনে এনে তাঁর পোশক পর্যন্ত ছিঁড়ে দিয়েছিলেন। বিচিত্র রামায়ণ’-এর বর্ণনা অনুযায়ীও হনুমান মন্দোদরীকে হেনস্থা করেছিলেন। থাই রামায়ণ ‘রামাকিয়েন’-এ মন্দোদরীর প্রতীকী ধর্ষণের উল্লেখ আছে। রামাকিয়েনে বলা হয়েছে–হনুমান রাবণের রূপ ধরে এসে মন্দোদরীর সঙ্গে যৌনসম্ভোগ করেন। এর ফলে মন্দোদরীর সতীত্ব নষ্ট হয় এবং যেহেতু মন্দোদরীর সতীত্বই রাবণের জীবন রক্ষা করছিল, সেহেতু এই ঘটনা রাবণের মৃত্যুর কারণ হয়।
আবার রামায়ণের কোনো কোনো সংস্করণে বলা হয়েছে, তাঁকে ব্যবহার করে বানরেরা রাবণের যজ্ঞ ভণ্ডুল করেছিল। হনুমান কৌশলে তাঁর কাছ থেকে রাবণের মৃত্যুবাণের অবস্থান জেনে নিয়েছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর জন্য হনুমানকে পথ দেখিয়েছিলেন মন্দোদরীই। জানিয়েছিলেন স্বামীর মৃত্যুবাণ কোন্ স্তম্ভে (Pillar) সুরক্ষিত আছে। রাবণের মৃত্যুর পরে বিভীষণ বিধবা মন্দোদরীকে বিবাহ করেন। যদিও বিভীষণের নিজেরও এক স্ত্রী ছিল, তাঁর নাম সরমা। একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, রাবণ মাতৃতান্ত্রিক জাতির প্রতিনিধি ছিলেন। তাই তাঁর মৃত্যুর পর শাসনক্ষমতা পেতে বিভীষণ রাজমহিষীকে বিবাহ করেন। অপর একটি মতে, রাজমহিষীকে বিবাহ করা সম্ভবত অনার্য সভ্যতার লক্ষণ। মন্দোদরী ও বিভীষণের বিবাহ ছিল ‘রাজনৈতিক কূটবুদ্ধিপ্রসূত বলা হয়, এই বিবাহ কোনোভাবেই ‘পারস্পরিক দৈহিক আকর্ষণের ভিত্তিতে হয়নি। সম্ভবত রাজ্যের উন্নতি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে এবং রাজকীয় ক্ষমতা ভোগ করতে মন্দোদরী বিভীষণকে বিবাহ করতে রাজিও হয়েছিলেন। বিবাহের অপর একটি কারণ ছিল রাম মন্দোদরীকে ‘সতী’ হতে বারণ করেছিলেন।
বাল্মীকি রামায়ণে মন্দোদরীকে সুন্দরী নারীর রূপে চিত্রিত করা হয়েছে। রামের বানর বার্তাবাহক হনুমান সীতার সন্ধানে লঙ্কায় এলে, তিনি মন্দোদরীর সৌন্দর্যে বিস্মিত হয়ে প্রথমে তাঁকেই সীতা বলে ভুল করেন। ভুল কেন করবেন সেটা বোধগম্য নয়, হনুমান যে স্বয়ং দেবতা’! রাবণ সীতার মুণ্ডচ্ছেদ করতে উদ্যত হলে মন্দোদরী সেই সময় রাবণকে বাধা দিয়ে সীতার প্রাণরক্ষা করেন। মন্দোদরী উপদেশ দেন, রাবণ সীতাকে বিবাহের ইচ্ছা ত্যাগ করে তাঁর অন্যান্য মহিষীদের সম্ভোগ করতে পারেন। মন্দোদরী সীতাকে তাঁর অপেক্ষা কম সুন্দরী ও নিচকুলজাত মনে করলেও, রামের প্রতি সীতার ভক্তি সম্পর্কে তিনি অবহিত ছিলেন এবং সীতাকে দেবী শচী ও রোহিণীর সঙ্গে তুলনা করেন। যুদ্ধের আগে মন্দোদরী শেষবারের মতো রাবণকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছিল। শেষপর্যন্ত মন্দোদরী বাধ্য ও বিশ্বস্ত স্ত্রীর মতো রাবণের পাশে এসে দাঁড়ান স্বামীকে রক্ষাকরতে। যদিও তিনি তাঁর পুত্র মেঘনাদকেও রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করার উপদেশ দিয়েছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর মন্দোদরী করছেন–“নাথ! সীতা অপেক্ষাও তো তোমার বহুসংখ্যক রূপবতী রমণী আছে। … সীতা ও রূপগুণে কিছুতেই আমার অনুরূপ বা অধিক নয়।”
রামায়ণে মন্দোদরীর ভূমিকা সংক্ষিপ্ত। তাঁকে এক ধর্মপ্রাণা ও নীতিপরায়ণা রাজমহিষীরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের মতে, পঞ্চকন্যার অন্যান্যদের তুলনায় মন্দোদরীর জীবন ‘কম বর্ণময় ও কম ঘটনাবহুল। তিনি আরও বলেছেন, “মন্দোদরী বিশেষ গুরুত্ব পাননি। তাঁর ছবিটিতে বস্তুগত অভাব বোধ হয় এবং তা শীঘ্রই ক্ষীণ হয়ে আসে। যদিও স্বামীর প্রতি তাঁর ভালবাসা ও আনুগত্য বিশেষ গুরুত্বের দাবি রেখেছে।” ‘পঞ্চকন্যা উইমেন অফ সাবস্ট্যান্স গ্রন্থের রচয়িতা প্রদীপ ভট্টাচার্য বলেছেন, “বাল্মীকি তাঁর (মন্দোদরী) সম্পর্কে বিশেষ কিছু লেখেননি। শুধু এটুকুই উল্লেখ করার মতো যে তিনি সীতাকে ফিরিয়ে দিতে বলেছিলেন এবং সীতাকে ধর্ষণ করার থেকে রাবণকে নিরস্ত করেছিলেন।” মন্দোদরী যতটুকু সীতাকে রক্ষার জন্য ডুকরে উঠেছিলেন, তার একবিন্দুও তেমন করে ডুকরে উঠেননি রাম-লক্ষ্মণ কর্তৃক বিরাধ-তাড়কা-শূর্পণখামারীচ সহ ১৪ হাজার স্বজাতির মৃত্যুতে। তখন কোথায় ছিল তাঁর মানবিক মুখ, সে বিষয়ে উল্লেখ নেই রামায়ণে। তবে মন্দোদরী বিশ্বাস করেন না যে রামই তাঁর স্বামীকে হত্যা করতে পারেন। তাঁর দৃঢ় ঘোষণা, ইন্দ্রই রাবণকে হত্যা করেছেন।
