রাম আর দেরি করলেন না। শুভস্য শীঘ্রম্। প্রতিশ্রুতি বিভীষণের মুখ থেকে বেরলো কি বেরলো না, তৎক্ষণাৎ বিভীষণের রাজ্যাভিষেকের আয়োজন করলেন। লঙ্কার নকল রাজা হলেন বিভীষণ। রাবণের সিংহাসন পেতে বিভীষণের এখন সময়ের অপেক্ষা। অনায়াসে রাবণ বধের সমস্ত অন্ধিসন্ধি রামকে জানিয়ে দিলেন বিভীষণ। রাবণ ও রাক্ষসবংশকে ধ্বংস করতে বিভীষণ নির্লজ্জের মতো রামকে সাহায্য করেছিলেন। রাজ্য ও সিংহাসনের লোভ বিভীষণের এতটাই যে, মেঘনাদের আঘাতে রাম-লক্ষ্মণ যখন মৃতপ্রায় হন, তখন বিভীষণ হাউহাউ করে কেঁদেছিলেন। কেঁদেছিলেন কারণ, রাম-লক্ষ্মণ মরেই যায়, তাহলে তিনি লঙ্কেশ্বর হবেন কী করে–“যয়োর্বীর্যমুপাশ্ৰিত্য প্রতিষ্ঠা কাঙ্ক্ষিতা ময়া”। বিভীষণ বলছেন–“হায়, আমি যাঁহাদের বাহুবলে রাজ্যপদ কামনা করিয়াছিলাম, এক্ষণে তাঁহারাই মৃত্যুর জন্য শয়ান।” কিষ্কিন্ধ্যারাজ সুগ্রীব বোঝালেন বিভীষণকে–“রাজ্যং প্রান্সসি ধর্মজ্ঞ লঙ্কায়াং নেহ সংশয়”।
বিভীষণ অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যক্তি, ক্ষুরধার তাঁর বুদ্ধি। তিনি বুঝে নিয়েছেন রাম যে সৈন্যবাহিনী নিয়ে লঙ্কার কাছাকাছি এসে উপস্থিত হয়েছেন, যুদ্ধ হলে লঙ্কার কেউ বেঁচে থাকবেন না। নিজের ‘জান’ বাঁচাতে হলে শত্রুশিবিরে যোগ দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। বহুদিন ধরেই তক্কে তক্কে ছিলেন বিভীষণ, রাবণকে সরিয়ে লঙ্কার সিংহাসন তিনি অলংকৃত করবেন। রাবণও কুবেরকে হটিয়ে লঙ্কার দখল নিয়েছিলেন। তবে সীতাকে ইস্যু করে এসে গেল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সেই সুযোগের পিছনে বিভীষণকে দৌড়োত হয়নি, সুযোগ বিভীষণের কাছে এসে ধরা দিল। না-হলে দু-বছর যাবৎ সীতা লঙ্কায় আটক ছিলেন রাবণ, কোনোদিন বিদ্রোহ তো দূরের কথা ন্যূনতম অভিযোগ পর্যন্ত করেননি। যেই-না শুনেছেন রাম তাঁর সৈন্যসামন্ত নিয়ে লঙ্কায় হাজির, অমনি তিনি নীতিবাগীশ হয়ে উঠলেন। সীতার জন্য কাতর তিনি।
এসবই বিভীষণের পূর্বপরিকল্পিত। তাই ক্রমে ক্রমে রাবণে উত্যক্ত করেছেন বিভীষণ। নানা অকথা কুকথা বলেছেন। বলেছেন–“তুমি গিয়া রামকে ধনরত্ন ও বসনভূষণের সহিত সীতা সমর্পণ করো, তাহা হইলেই আমরা এই লঙ্কাপুরীতে নির্ভয়ে বাস করিতে পারিব।” অন্যথায় রামের হাতেই তাঁর পরাজয় এবং মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে। এমনকি শত্রুপক্ষের যোদ্ধা রামের জয়গানে মুখর হয়ে উঠলেন বিভীষণ। রাবণ এবার সত্যিই উত্তেজিত হয়ে পড়লেন, তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো কঠিন-কঠোর বাক্যবাণ–“বরং শত্রু ও রুষ্ট সর্পের সহিত বাস করিব, কিন্তু মিত্ররূপী শত্রুর সহিত সহবাস কদাচ উচিত নয়। .. রে কুলকলঙ্ক! যদি আমাকে অন্য কেহ এইরূপ কহিত, তবে দেখিতিস তদ্দণ্ডেই তাহার মস্তক দ্বিখণ্ড করিতাম।” বিভীষণ সফল। রাবণের মুখ থেকে চরম প্রতিক্রিয়াটি বের করতে পেরেছেন। বিভীষণ চেয়েছিলেন লঙ্কেশ্বর এরকম কিছুই বলুক। নাহলে বিভীষণের স্বপ্নপূরণ হবে না। রাজ্যলাভ হবে না। আর রাজ্যলাভ করতে হলে অবশ্যই শত্রুপক্ষে যোগ দেওয়া প্রয়োজন। ছুঁতো না-পেলে শত্রুপক্ষে যোগ দেওয়াটা বড়োই নগ্ন হয় পড়বে! শত্রুপক্ষে যোগ দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে এক মুহূর্তের জন্যেও বিভীষণ দেরি করেননি। যেখানে রাম-লক্ষ্মণ ও বানরসেনারা অপেক্ষা করে আছেন, সেখানে উপস্থিত হয়ে গেলেন। রামের ভক্ত হিসাবে নয়, লঙ্কায় ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য নয়–বিভীষণ রামের কাছে এসেছেন রাবণকে হত্যা করে লঙ্কার পরবর্তী রাজার হওয়ার বাসনায়। রামও স্পষ্টত বলেছেন–“তিনি স্বয়ং রাজ্যলাভার্থী, স্বার্থরক্ষার জন্য আমাদের সহিত সদ্ভাব স্থাপনই তাঁহার উদ্দেশ্য। সুতরাং বিভীষণকে সংগ্রহ করা কর্তব্য।”
ভাবুন, শত্রুপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রথম আলাপেই বিভীষণ সরাসরি তাঁর সুপ্ত ইচ্ছার কথা বলতে লজ্জাবোধ করেনি। লজ্জাবোধ থাকার কথাও নয়। কারণ নীতিগতভাবে তিনি তার বিনিময়ে রাবণের ধ্বংস সুনিশ্চিত করবেন। রামের জয় এনে দেবেন। গিভ অ্যান্ড টেক পলিসি। “বিষ্ণুর অবতার” রামকে দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন অপারেশনে সাহায্য করার জন্য বিভীষণ শত্রুপক্ষে যোগ দেননি। সুগ্রীব যদি কিষ্কিন্ধ্যা রাজ্য ও বালীর স্ত্রীকে পেতে পারে, তবে তিনি কেন লঙ্কারাজ্য ও মন্দোদরীকে পাবেন না! অতএব হাত মেলাও বন্ধু হও।
মাইকেল মধুসূদনের মহাকাব্যে বিভীষণ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারের গোপন অবস্থানে লক্ষণকে নিয়ে গিয়ে ভাইপো মেঘনাদের হত্যায় সহায়তা করেন। ইনিই লঙ্কার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাবণের শক্তি ইত্যাদি সমস্ত তথ্য রামের কাছে পাচার করেন। যুদ্ধে রাবণ সবংশে নিহত হলে রাম বিভীষণকে প্রতিদান ফিরিয়ে দিতে ভোলেননি। রাম লঙ্কার শাসনভার বিভীষণের হাতে শাসনভার তুলে দেন। ধর্মানুরাগী বিভীষণ নিজের সদ্য বিধবা বউদি মন্দোদরীকে (রাবণের স্ত্রী) বিবাহ করতে দেরি করেননি। না, কবি অবশ্য একথা কোথাও বলেননি যে, বিভীষণ বউদিকে নিজের করে ভোগ করার জন্য নিজের দাদা রাবণের মৃত্যুকে তরান্বিত করতে রামের পক্ষ নিয়ে কাজ হাসিল করেছিলেন। সুগ্রীবও একই পথে নিজের বউদিকে ভোগ করতে নিজের ভাইকে হত্যা করিয়েছিলেন রামকে দিয়ে। বউদিরা কি এতই সুস্বাদু!
