বিভীষণ : যিনি না-থাকলে রামের পক্ষে কিছুতেই রাবণ ও রাবণের সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করা সম্ভব হত না, তিনি ‘একমেব অদ্বিতীয়ম’ বিভীষণ। ঘরশত্রু বিভীষণ’, ‘বেইমান বিভীষণ’, ‘ঘর জ্বালানি পর ভুলানি বিভীষণ, ‘বিশ্বাসঘাতক’ বিভীষণ। বিশ্বাসঘাতক মিরজাফরকে আমরা প্রাণ খুলে গাল পাড়ি, আবার বিশ্বাসঘাতকের ইতিহাসকে (যদি ইতিহাস বলেন) কুর্নিশও করি। চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই পরাজয়, বীরত্বে নয়। রামায়ণে বিভীষণের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় যেমন লঙ্কা ধ্বংস হয়েছে, তেমনই মহাভারতেও নিজেদেরই সেনাপতিদের বিশ্বাসঘাতকতায় কৌরব বংশ ধ্বংস হয়েছে। আঠেরো দিনের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষে সেনাপতির দায়িত্বে ছিলেন যথাক্রমে ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, কর্ণ, শল্য প্রমুখ অপ্রতিরোধ্য বীরপুরুষরা শত্রুপক্ষের শিবিরের কাছে আত্মসমর্পণ করে বসলেন। প্রতিরোধ তো দূরের কথা, যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র ত্যাগ করে কৌরবদের ধ্বংসের পথ নিশ্চিত করেছিলেন। সেনাপতি হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে এই ধরনের নিষ্ক্রিয় অবস্থানে পাণ্ডবদের প্রায় আয়েশেই যুদ্ধজয় হাতে তুলে নিয়েছেন। বিশ্বাসঘাতকতা না-করলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ফলাফল অন্যরকম হত অবশ্যই। বেইমান, বিশ্বাসঘাতক সেনাপতিদের চিনতে না-পারার মাশুল যেমন কৌরবদের। গুণতে হয়েছে, তেমনই বিভীষণকে কারাবন্দি বা মৃত্যুদণ্ড না-দিয়ে রাবণকেও একই মাশুল গুণতে হয়েছে।
‘রামায়ণ’ গ্রন্থখানির প্রধান খলনায়ক (?) চরিত্র রাবণের ‘অপদার্থ’ ভাই বিভীষণ। পৌরাণিক কাহিনি মতে বিশ্রবার ঔরসে নিকষা বা কৈকসী গর্ভে ইনি জন্মগ্রহণ করেন। বিভীষণের অপর দুই ভাইয়ের নাম রাবণ ও কুম্ভকর্ণ, স্ত্রীর নাম সরমা। দুটি সন্তান–পুত্র তরণীসেন ও কন্যা কলা। সুমালী কুবেরের মতো দৌহিত্র লাভের আশায় তাঁর কন্যা কৈকসীকে বিশ্রবা মুনির কাছে পাঠান। ধ্যানস্থ অবস্থায় বিশ্রবা, তাঁর কাছে কৈকসীর আসার কারণ অবগত হয়ে কৈকসীর সঙ্গে যৌনমিলন করেন। তবে ইনি ভবিষ্যৎ বাণী করেন যে, অসময়ে যৌনসম্ভোগ করার কারণে কৈকসী রাক্ষসের জন্ম দেবেন। এরপর কৈকসী উত্তম পুত্র প্রদানের জন্য বিশ্রবাকে অনুরোধ করলে, বিশ্রবা সন্তুষ্ট হয়ে বলেন যে, তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র ধর্মানুরাগী হবে। সেই বাণী মতে কৈকসীর প্রথম দুই পুত্র রাবণ ও কুম্ভকর্ণ রাক্ষস হয়ে জন্মান। শেষ পুত্র বিভীষণ রাক্ষস হলেও ধর্মানুরাগী হন। এই হল। এঁদের জন্মবৃত্তান্ত।
বস্তুত পৌরাণিক কাহিনি শুধুমাত্র বিভীষণকে ‘ধর্মানুরাগী’ বলে চিহ্নিত করলেও রাবণ ও কুম্ভকর্ণও কিছু কম ধর্মানুরাগী ছিলেন না। আসলে পক্ষপাতিত্বেই বিভীষণকে কবি এগিয়ে রেখেছেন। বস্তুত রাবণের পরিবর্তে বিভীষণ যদি লঙ্কার রাজা হতেন তাহলে রাবণ যা করেছেন বিভীষণও তাই-ই করতেন। বিরোধী হিসাবে মহান’ থাকতে পারলেও শাসক হিসাবে থাকতে পারতেন না। সরকার বা শাসনে থাকার সঙ্গে বিরোধীদের ব্যবধান অনেক যোজন দূর। বিরোধী টেবিলে বসে কাঠি দেওয়া অনেক সহজ। বিভীষণও ব্যতিক্রম নন। কারণ তিনি ছিলেন রাজার বিরোধী, দেশদ্রোহী তো বটেই। বিভীষণের ষড়যন্ত্র ব্যতীত লঙ্কা কিছুতেই ছারখার হত না।
রামায়ণ মহাকাব্যে তাঁর ভূমিকা কী, কতটুকু? খর, দূষণ, শূর্পণখা ও রাক্ষসদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে রাবণ সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় নিয়ে আসেন। বছর দুয়েক হল রাবণ সীতাকে তুলে এনেছেন। প্রতিবাদ তো দূরের কথা, আপত্তিটুকু পর্যন্ত কোনোদিন করেননি বিভীষণ। যখন জানতে পারলেন রাম অপরাজেয় বানরবাহিনী নিয়ে লঙ্কার কাছাকাছি এসে উপস্থিত হয়েছেন লঙ্কেশ্বরের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য, তখন কেমন যেন বিভীষণ বিদ্রোহ করতে শুরু করে দিলেন লঙ্কালাভের সুপ্ত বাসনায়। রাবণকে সীতাকে ফিরিয়ে দেওয়ার উপদেশ দেন। রামের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে রাবণ ও রাক্ষসবংশের সমূহ ক্ষতি হবে–এমন বক্তব্যও রাখলেন। এমন কোনো কথা তিনি আগে কখনো বলেননি, রাম-লক্ষ্মণরা যে তাড়কা-শূর্পণখা সহ হাজার হাজার রাক্ষসদের বিনা প্ররোচনায় মেরে ফেলছে তার কী হবে বিহিত! নিজের দেশের কথা না-বলে বিদেশি রামের পক্ষে সওয়াল করায় রাবণ বিভীষণকে অপমান এবং পদাঘাত করেন। “ন তু মিত্রপ্রবাদেন সংবসেৎ শত্রুসেবিনা”–রাবণ বললেন। এই অপমানের বদলা নিতে বিভীষণ তাঁর চারজন অনুগতকে রাক্ষস নিয়ে স্বদেশ ত্যাগ করেন এবং শত্রুপক্ষ রামের দলে সরাসরি যুক্ত হয়ে যান। কিন্তু বিভীষণ তো শত্রুপক্ষের, সুগ্রীব আর সুগ্রীবের সেনারা তাঁকে বিশ্বাস করবেন কেন? সুগ্রীব, জাম্ববান প্রমুখেরা যথারীতি সন্দেহ প্রকাশ করলেন। এমতাবস্থায় হনুমান এগিয়ে এলেন। হনুমান সুগ্রীবের মহামন্ত্রী, তাই বিভীষণের মতলব পড়ে নিতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হয়নি। হনুমান বললেন–“বালিনং তু হতং ত্বা সুগ্রীবঞ্চাভিষেতি। রাজ্যং প্রার্থয়মানস্তু বুদ্ধিপূর্বমিহাগতঃ”। অর্থাৎ “বালিকে হত্যা করে রাম যে সুগ্রীবকে কিষ্কিন্ধ্যার রাজা করেছেন, সে খবর বিভীষণ রেখেছেন। তাই বিভীষণ ভেবেছেন এ যুদ্ধে রাবণে মৃত্যু হলে তিনিই লঙ্কার রাজা হবেন। এটাই তাঁর আশা।” একথা অবগত হলেন রাম। বুঝলেন বিভীষণের সাধই রামশিবিরের সাধ্য পূরণ করতে পারে। রাম বিভীষণকে দলে নিলেন। গৃহভেদী’ বিভীষণ রাবণের শত্রুপক্ষে নাম লিখিয়েই জানিয়ে দিলেন–“ভবদগতং হি মে রাজ্যং জীবিতঞ্চ সুখানি চ।” অর্থাৎ “এখন আমার রাজ্যলাভ, জীবন ও সুখ সবই আপনার উপর।” বিনিময়ে বিভীষণ প্রতিশ্রুতি দিলেন–“রাক্ষসানাং বধে সাহং লঙ্কায়াশ্চ প্ৰধর্ষণে।” অর্থাৎ “রাক্ষস হত্যায় সাহায্য করব, লঙ্কার অধিকারে সাহায্য করব”।
