কুম্ভকর্ণ : বাল্মীকির উত্তরকাণ্ড থেকে জানতে পারি কেকসীর যখন প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হল তখন আকাশে নাকি বিনা মেঘে বজ্রপাত, রক্তবৃষ্টি, চিল-শকুনের রব, শেয়াল, গাধার কান্না, নানা রকম অশুভ চিহ্ন ইত্যাদি হয়েছিল। জন্মেই সেই শিশু এমন চিৎকার বা রব করতে থাকল যে চতুর্দিক কম্পিত হতে লাগল। তুমূল রব করার জন্য তার নাম হল রাবণ। এরপর কেকসি আর-একটি শক্তিশালী পুত্রের জন্ম দেন, তাঁর নাম কুম্ভকর্ণ। কুম্ভকর্ণের মতো ঘুম! কুম্ভকর্ণ আর গভীর ঘুম যেন সমার্থক। যেন শুধু ঘুমের কারণেই কুম্ভকর্ণের প্রসিদ্ধি। তারপরে শুভ লগ্নে যখন নানা শুভ চিহ্ন দেখা গেল তখন কেকসির গর্ভ থেকে একটি শিশু প্রসব হল, তাঁর নাম বিভীষণ। এরপর পুনঃ অশুভ লগ্নে কেকসি একটি কন্যার জন্ম দেন, তাঁর নাম শূর্পণখা। জন্মগ্রহণের অব্যবহিত পরেই সে ক্ষুধার্ত হয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য সহস্র প্রজা খেয়ে ফেলেছেন বলে খ্যাতি আছে। এই জাতিকে সকলের কাছে ঘৃণ্য করে তুলতেই জন্মের এহেন কুৎসিত বর্ণনা। যাই হোক, কুম্ভকর্ণ দৈত্যরাজ বলির দৌহিত্রী বজ্রমালাকে বিয়ে করেন। বজ্রমালার গর্ভে কুম্ভ ও নিকুম্ভ নামে দুই পুত্রের জন্ম হয়।
গোকর্ণ আশ্রমে উগ্র তপস্যার পর ব্রহ্মার বর চাইতে গেলে কুম্ভকর্ণ প্রত্যাখ্যাত হন। কারণ দেবতারা ব্রহ্মার কান ভাঙিয়ে বলে দিয়েছেন–কুম্ভকর্ণ সাতটি অপ্সরা, ইন্দ্রের দশটি অনুচর এবং বহু ঋষি ও মনুষ্য খেয়ে ফেলেছেন। বরপ্রাপ্তির ফলে সে ত্রিভুবন খেয়ে ফেলবে! এদিকে কুম্ভকর্ণের কঠোর তপস্যায় পৃথিবী এমন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, মনে হয় সমস্ত যেন অগ্নিদগ্ধ হয়ে ছাইয়ে পরিণত হবে। দেবতারা দেবী সরস্বতীর শরণাপন্ন হলেন। দেবী সরস্বতী অভয় দিয়ে কুম্ভকর্ণের জিহ্বায় অধিষ্ঠান করলেন। এই সুযোগে ইন্দ্র তাঁর গায়ের ঝাল মেটাতে সরস্বতীর সঙ্গে জোট বাঁধলেন। বললেন, কুম্ভকর্ণের জিভ বেঁধে রাখতে। সরস্বতীও সেই মতো কাজ করলেন। বর চাইতে পারলেন না কুম্ভকর্ণ, ব্রহ্মার কাছে বর চাইতে গিয়ে জড়িয়ে গেল কুম্ভকর্ণের জিভ। তিনি চেয়েছিলেন ইন্দ্রাসন’ কামনা করবেন। জিভের আড়ষ্টতার কারণে অশুদ্ধ উচ্চারণ করে ফেললেন। ইন্দ্রাসন জিহ্বার আড়ষ্টতার হয়ে গেল ‘নিদ্রাসন’। ছয় মাস ঘুমোবেন, আর ছয় মাস জেগে থাকবেন। জাগার সময়ে কুম্ভকর্ণকে কেউ হত্যা করতে পারবেন না। কিন্তু নিদ্রার সময়কালে কেউ যদি অকালনিদ্রা ভঙ্গ করেন, তবে তাঁর মৃত্যু অনিবার্য। সরস্বতী প্রভাবে কুম্ভকর্ণ বর চাইলেন–“হে প্রজাপতি। তপস্যা করে আমি ক্লান্ত। আমাকে বর দিন যেন আমি ছয় মাস ঘুমাই আর একদিন মাত্র জাগি।” ব্রহ্মা বললেন- “তথাস্তু। কিন্তু অকালে তোমার নিদ্রাভঙ্গ করলে তোমার মৃত্যু নিশ্চিত।”
যাই হোক, যখন ঘুম ভাঙত, পাগলের মতো খিদে পেত তাঁর। হাতের কাছে যা পেতেন ধরে কপাকপ মুখে পরে দিতেন। দীর্ঘ ছয় মাসের খিদে বলে কথা! জানা যায়, মানুষও সেই খাদ্যতালিকায় এসে পড়ত। রাবণ কুম্ভকর্ণের নিদ্রার জন্য দুই যোজন দীর্ঘ ও এক যোজন বিস্তৃত এক বিচিত্র ভবন নির্মাণ করে দেন। সেখানে ছয় মাসান্তে নিদ্রাভঙ্গের পর কুম্ভকর্ণ প্রচুর পান ও ভোজন করতেন। যে সময়টায় রাম-রাবণের যুদ্ধের সময়, তখন। কুম্ভকর্ণ তো নিদ্রার কাল। হাজার চেষ্টাতেও সেই ঘুম ভাঙানো সম্ভব হচ্ছে না। উপায়ান্তর না-পেয়ে অবশেষে ১০০০ হাতি তাঁর শরীরের উপর দিয়ে হাঁটিয়ে দেওয়া হল, ঘুম ভাঙল রাবণের এই ভাইয়ের। ছয় মাস ঘুমিয়ে থাকা আর ছয় মাস জেগে থাকা এবং ভোজনের বর্ণনা–এসব রূপকথার গপ্পো। বাড়াবাড়ি রকমের বানোয়াট।
রামশিবিরের যোদ্ধারা যখন সমুদ্রসৈকতে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন কুম্ভকর্ণ রীতিমতো জেগে ছিলেন। কেউ তাঁর অসময়ের কাঁচা ভাঙিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে টেনে আনেননি। যুদ্ধের নিমিত্ত রামশিবির যেসময় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন রাবণ যুদ্ধকালীন কুম্ভকর্ণ, ইন্দ্রজিৎ, বিভীষণ, মহাপার্শ্ব সহ সকলকে নিয়ে সভা করছিলেন। রাবণের সভায় কুম্ভকর্ণই ছিলেন অন্যতম বক্তা। শত্রুর বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ করবেন বলে অঙ্গীকারবদ্ধ হলেন। তর্কের খাতিরে যদি রূপকথাটি মান্য করি, অকালে ঘুম ভাঙিয়ে কুম্ভকর্ণকে হত্যা করা হয়েছে। এ সময়টায় জাগিয়ে কুম্ভকর্ণের স্বাভাবিক মৃত্যুর সময়। এ সময়ে কুম্ভকর্ণকে হত্যার মধ্যে কোনো বীরত্ব আছে বলে হয় না। বীরত্ব তখনই প্রকাশ পেত যদি কুম্ভকর্ণকে জাগার ছয় মাসের যে-কোনো সময়ে হত্যা করতেন।
অতিশয় ধার্মিক, বুদ্ধিমান এবং সাহসী ছিলেন। এতটাই যে তাঁকে স্বয়ং ইন্দ্র পর্যন্ত ঈর্ষা করতেন। রাম ও রাবণের যুদ্ধে লঙ্কা বীরশূন্য হয়ে পড়লে রাবণ বহু অনুচর পাঠিয়ে কুম্ভকর্ণকে ডেকে পাঠান। সীতা অপহরণ এবং রামেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য রাবণকে তিরস্কার করেন। রাবণের কামুকতা আর অহংবোধকে মহামতি কুম্ভকর্ণ অনুমোদন করতে পারেননি। বলেছেন–“দিষ্ট্যা ত্বাং নাবী রামো বিষমিশ্রমিবামিষ”।
দাদার প্রতি কর্তব্য পালনে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে যান। বহু বানরকে হত্যা করেন, গিরিশৃঙ্গের আঘাতে সুগ্রীবকে সংজ্ঞাহীন করে দেন এবং লঙ্কায় ধরে নিয়ে যান। কুম্ভকর্ণের আক্রমণে ছত্রখান হয়ে যায় রামচন্দ্রের সেনা। আহত হন হনুমান। অজ্ঞান হয়ে যান সুগ্রীব। কুম্ভকর্ণের দুই পুত্র কুম্ভ এবং নিকুম্ভকেও এ যুদ্ধে প্রাণ হারাতে হয়। শিবপুরাণ অবশ্য বলছে, কুম্ভকর্ণের ভীম নামে তৃতীয় পুত্রও ছিলেন।
