তৃতীয় দিনের যুদ্ধ : এবার ইন্দ্রজিৎ আবার মহা ভুল করে বসলেন। তিনি আবারও ভুলে গেলেন, শত্রুর শেষ রাখতে নেই। যেমন ঋণ, অগ্নি এবং ব্যাধির শেষ রাখতে নেই, তেমনি শত্রুর মৃত্যুকে নিশ্চিত না-করে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করা ইন্দ্রজিতের বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি। একটুর জন্য ইন্দ্রজিৎ শেষরক্ষা করতে পারলেন না। তাই শমন তাঁর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। অবশ্য রণক্ষেত্রে নয়, নিকুম্ভিলায়। সুস্থ হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে লক্ষ্মণ চললেন নিকুম্ভিলায়, ইন্দ্রজিৎকে হত্যা করতে। একা নন–সঙ্গে গেলেন ইন্দ্রজিতের খুল্লতাত বিভীষণ, চারজন বীর অমাত্য, সুগ্রীবের মহামন্ত্রী এবং হাজার হাজার বানরসেনা। নিকুম্ভিলা অবরুদ্ধ। নিকুম্ভিলা যুদ্ধে বিভীষণই হর্তাকর্তাবিধাতা। বিভীষণ লক্ষণকে বললেন–“তুমি সেনাদের ছিন্নভিন্ন করিতে যত্নবান হও। উহারা ছিন্নভিন্ন হইলে ইন্দ্রজিৎ নিশ্চয়ই দৃষ্ট হইবে।” হল। বিভীষণের পরামর্শে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল ইন্দ্রজিতের সেনাদের সঙ্গে। অবশেষে ইন্দ্রজিৎ রথে চড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে এলেন। দেখতে পেলেন খুল্লতাত বিভীষণকে। চরম তিরস্কার করলেন খুল্লতাতকে। ইন্দ্রজিৎ রাবণের মতোই ক্ষমাশীল, তাই জ্ঞাতিদ্রোহী খুল্লতাত বিভীষণকে হত্যা করতে পারলেন না। এটাও ছিল ইন্দ্রজিতের ভয়ানক ভুল। অথচ উলটোদিকে নিজের সশস্ত্র দলবল নিয়ে নিজের ভাইপোকে হত্যা করতে এসেছেন আপন কাকা বিভীষণ।
লক্ষমণ এবং ইন্দ্রজিৎ উভয়ই আকাশপথেই যুদ্ধ করতে লাগলেন–এমন তথ্যই দিয়েছেন স্বয়ং বাল্মীকি। তবে লক্ষ্মণ একা নন–এই যুদ্ধে সঙ্গ দিচ্ছেন ঋষিগণ, পিতৃগণ, ইন্দ্রাদি দেবগণ, গন্ধর্ব প্রমুখ। লক্ষ্মণকে ঘিরে রক্ষা করছেন দেবসেনাগণ। ইন্দ্রজিৎ শত্ৰুবেষ্টিত হয়ে অসহায়ের মতো যুদ্ধ করছেন। অবশেষে ইন্দ্রজিতের মস্তক দেহচ্যুত হল লক্ষ্মণের ঐন্দ্রবাণে।
“ভাই লক্ষ্মণ! আজ বড়ো পরিতুষ্ট হইলাম। … যখন ইন্দ্রজিৎ বিনষ্ট হইল, তখন জানিও আমরাই জয়ী হইলাম। … আজ আমি বিজয়ী … লক্ষ্মণ তুমি আমার প্রভু, তোমার সাহায্যে অতঃপর সীতা ও পৃথিবী আমার অসুলভ থাকিবে না।”–ইন্দ্রজিতের মৃত্যুর পর রাম এই প্রথম লক্ষ্মণকে ‘প্রভু’ বলে সম্বোধন করলেন। এ থেকে বোঝা যায় ইন্দ্রজিৎ কতটা প্রতিরোধ্য ছিলেন। এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায় ইন্দ্রজিতের কাছে রামচন্দ্র কত অসহায় ছিলেন, চাপে ছিলেন। রাবণ নয়, ইন্দ্রজিৎই ছিলেন দাক্ষিণাত্যে আর্য-উপনিবেশের প্রধান ও প্রথম অন্তরায়। তাই ইন্দ্রজিতের পতনের সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ভেরী বাজতে থাকল।
অন্য রামায়ণে এরকমভাবে ঘটনাকে বিকৃত করা হয়েছে–লক্ষ্মণ পুনরুজ্জীবিত হয়েছেন জানতে পেরে মেঘনাদ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে যজ্ঞ সম্পাদনা করতে যান। বিভীষণ তাঁর গুপ্তচর মারফত সেই সংবাদ পেয়ে রামকে সতর্ক করেন। কারণ এই যজ্ঞ সম্পূর্ণ হলে মেঘনাদ অজেয় হয়ে যাবেন। বিভীষণ লক্ষ্মণকে যজ্ঞাগারে নিয়ে যান। যজ্ঞাগারে মেঘনাদ অস্ত্র স্পর্শ করতেন না। তিনি প্রথমে যজ্ঞের বাসন ছুঁড়ে লক্ষ্মণকে অচেতন করে দেন। কিন্তু অস্ত্রাগারে যাওয়ার সময় পান না। তার পূর্বেই লক্ষ্মণের জ্ঞান ফেরে এবং তিনি নিরস্ত্র মেঘনাদকে হত্যা করেন। এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। যজ্ঞাগারে নিরস্ত্র অবস্থায় ইন্দ্রজিতের মৃত্যু হয়নি। এ গল্প মাইকেল মধুসূদনের মস্তিষ্কপ্রসূত।
১৮৬১ সালে রামায়ণের কাহিনি নিয়ে একই ছন্দে তিনি রচনা করেন তার সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘মেঘনাদবধকাব্য’। এটি বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক মহাকাব্য। আর কোনো রচনা না-থাকলেও মধুসূদন এই একটি কাব্য লিখে অমর হয়ে থাকতে পারতেন। এই কাব্যের মাধ্যমে তিনি মহাকবির মর্যাদা লাভ করেন এবং তাঁর নব আবিষ্কৃত অমিত্রাক্ষর ছন্দেও বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। এই কাব্য ভাব ও ভাবনায় আধুনিকতায় প্রকাশভঙ্গির অভিনবত্বে এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের উপকরণের সংমিশ্রণে মধুসূদন বাংলা কাহিনি কাব্যের গতানুগতিক ধারায় এক আমূল পরিবর্তন আনেন। তিনি সংস্কৃতি থেকে আখ্যানভাগ গ্রহণ করলেও সংস্কৃতি ও অলংকারশাস্ত্রের বিধান পালন করেননি, বরং ভাবগাম্ভীর্য, ভাষা ও ছন্দের ওজস্বিতা এবং জীবন-ভাবনার ব্যাপকতা ও প্রগাঢ়তায় ‘মেঘনাদবধকাব্য’ গ্রিক মহাকাব্যের মহিমা লাভ করেছে। বস্তুত এটি গ্রিক আদর্শে রচিত প্রথম সার্থক বাংলা মহাকাব্য।
রামায়ণের নায়ক ‘দেবতা’ রামচন্দ্র। এখানে পররাজ্য আক্রমণকারী এবং দৈববলে বলিয়ান লক্ষণ। অন্যায় যুদ্ধে হন্তারকরূপে চিহ্নিত। রামায়ণের পরস্ত্রী অপহরণকারী রাক্ষস রাবণকে এখানে পাওয়া যায় মহাবীর ও প্রজাপালক রাজা, স্নেহময় পিতা ও ভ্রাতা হিসাবে। ভগ্নির অপমানে প্রতিশোধ নিতে তিনি সীতাকে অপহরণ করেন। কিন্তু কোনো অবমাননা করেননি৷ রাবণ পুত্র মেঘনাদ অসীম সাহসীরূপে বীরযোদ্ধা ও সত্যাশ্রয়ী নিরস্ত্র ও যজ্ঞরত অবস্থায় তাকে তার পিতৃব্য বিভীষণের সহায়তায় লক্ষ্মণ হত্যা করেন। মেঘনাদের স্ত্রী প্রমিলা নারীর ব্যক্তিত্ব, স্বতন্ত্র ও বীরের উজ্জ্বল। বিতাড়িত রাবণের অসহায় পরাভবের কাহিনি মূলত ঔপনিবেশ শক্তির পদানত পরাধীন ভারতবাসীর বেদনায় শিল্পরূপ। গ্রিক ও শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজেডি শিল্পাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মধুসূদন সর্বমোট নয়টি স্বর্গ, মর্ত, পাতালরূপী কাহিনি পরিকল্পনা, ঘটনা সংস্থাপন, উপমা বিশ্লেষণের অভিনবত্ব, অমিত্রাক্ষর ছন্দের কুশলী প্রয়োগ এবং বর্ণনায় দ্রুতময়তায় এই মহাকাব্য রচনা করেন। রামায়ণে বর্ণিত অধর্মাচারী, অত্যাচারী ও পাপী রাবণকে একজন দেশপ্রেমিক বীরযোদ্ধা ও বিশাল শক্তির আধাররূপে চিহ্নিহ্নত করে মধুসূদন দত্ত ঊনবিংশ শতকের বাঙালি নবজাগরণের শ্রেষ্ঠ কবির মর্যাদা লাভ করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ভারতবাসীর চিরাচরিত বিশ্বাসের মূলে আঘাত হেনে প্রকৃত সত্য সন্ধান ও দেশপ্রেমের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন বাংলা সাহিত্যে তা তুলনাহীন।
