চিরকৃতদার থাকবেন বলে অগস্ত্য প্রতিজ্ঞা করে বসলেও পিতৃপুরুষদের কষ্ট সহ্য করতে না-পেরে লোপামুদ্রাকে বিবাহ করলেন। বিবাহের ফলে তিনি দৃড়স নামে এক শক্তিশালী পুত্রের পিতা হলেন। পুত্রের জন্মের পর অগস্ত্য কিছুদিন আশ্রমে বাস করে দেহত্যাগ করেন। জনশ্রুতি আছে, অগস্ত্য দক্ষিণাকাশে নক্ষত্ররূপে চির উজ্জ্বল হয়ে আছেন। মানুষ বিশ্বাস করেন, তিনি শরৎকালের প্রথমে দক্ষিণাপথে গিয়েছিলেন বলে ভাদ্রের ১৭ বা ১৮ তারিখে আকাশে নক্ষত্ররূপে তাঁর আবির্ভাব ঘটে থাকে। কারণ অগস্ত্য আর্যদেবতাদের প্রতিনিধি হয়ে বিন্ধ্যপর্বত অতিক্রম করে দক্ষিণ ভারতে পাড়ি দিয়েছিলেন সাম্রাজ্য বিস্তার করতে। কেউ কেউ বলেন, দক্ষিণ ভারত থেকে তিনি আর ফিরে আসেননি। অনেকে মনে করেন, পণ্ডিত ও প্রাজ্ঞ মানুষ পেয়ে দক্ষিণ ভারতের অনার্য মানুষরা তাঁকে বন্দি করে রাখেন এবং শাস্ত্রজ্ঞান অর্জন করেন। দক্ষিণ ভারতে আর্ব উপনিবেশ স্থাপনে অগস্ত্যই ছিলেন মুখ্য রূপকার। আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন–“অগস্ত্য কোনো এক ব্যক্তিবিশেষের নাম ছিল না। সেকালে ‘অগস্তি’ নামে একটি বিশেষ সম্প্রদায় ছিল। সেইসম্প্রদায় থেকে যে একাধিক কীর্তিমান পুরুষের আবির্ভাব ঘটে এবং তাঁরাই ‘অগস্ত্য হিসাবে সম্মানিত হন।” প্রথম অগস্ত্যকে আমরা পাই খ্রিস্টপূর্ব দশম শতকের সময়কালে। ঋগবেদেও আর-এক অগস্ত্যের কথা জানতে পারি, আগেই বলছি তিনি এখানে মিত্রা ও বরুণের পুত্র, উর্বশী তাঁর মা। স্কন্দপুরাণে যে অগস্ত্যের কথা জানতে পাই, তিনি কাবের কন্যা কাবেরীকে বিয়ে করে ‘কুতমুনি’ নাম নিয়ে সেখানেই থেকে যান। কুতক থেকেই কুতমুনি, কুতক কুৰ্গদেশের প্রাচীন নাম। অন্য এক অগস্ত্য সর্বপ্রথম বিন্ধ্যপর্বত অতিক্রম করে বিদর্ভ রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন যাদব রাজা বিদর্ভের সাহায্যে। অগস্ত্যের কাছে তামিলরা খুবই কৃতজ্ঞ। তামিলে অগস্ত্যের গুণপনার স্বীকৃতি আছে। অসংখ্য অগস্ত্যের মধ্যে কেউ গ্রন্থকার অগস্ত্য, কেউ-বা তামিল ব্যাকরণ-প্রণেতা, কেউ পূর্তবিদ্যাবিদ, যন্ত্রবিদ, কেউ-বা সমরদক্ষ। এক অগস্ত্য বৌদ্ধধর্মে আকৃষ্ট তো, অন্যজন শৈবধর্মে। গ্রন্থপ্রণেতা অগস্ত্য প্রণীত গ্রন্থগুলি হল–অগস্ত্যসংহিতা, অগস্ত্যগীতা, সকলাধিকারিকা প্রভৃতি।
বনবাসকালে লক্ষ্মণ যখন অগস্ত্যের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন, তখন বুঝলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করা অত সহজ ব্যাপার নয়। অগস্ত্যের আস্তানা কঠোর ও কড়া সামরিক প্রহরায় মোড়া ছিল। দ্বাররক্ষীর অনুমতি ছাড়া অগস্ত্যের দর্শন পাওয়া সম্ভব নয়। দশরথপুত্র রাম এসেছেন এই সংবাদ প্রেরণ করলে অবশেষে অনুমতি মিলল এবং রক্ষীরা সসম্মানে অগস্ত্যের কাছে নিয়ে গেলেন। সারি সারি সজ্জিত প্রাসাদ দর্শন করতে করতে ব্রহ্মাস্থান, রুদ্রস্থান, ইন্দ্রস্থান, সূর্যস্থান ইত্যাদি সর্বশেষে ধর্মস্থান পেরিয়ে রামচন্দ্র পৌঁছে গেলেন গন্তব্যস্থলে। রামায়ণে অগস্ত্যের আবাসস্থলটি ছিল গোদাবরী নদীতীরে নাসিক থেকে ২৪ মাইল দূরে।
নিখুঁত এক সামরিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা অগস্ত্যের এই ডেরা। দণ্ডকারণ্যের বিশাল অঞ্চল জুড়ে তাঁর এই সুশৃঙ্খল সামরিক ঘাঁটি।তাই অগস্ত্যের এলাকাভুক্ত অরণ্য সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত। যতদূর পর্যন্ত অগস্ত্যের প্রভাব প্রসারিত ততদূর পর্যন্ত নিরাপদ। এখানে ব্রাহ্মণ ও আর্যদেবতারা নিশ্চিন্ত অবস্থান করেন।
রামচন্দ্রের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর অগস্ত্য বাছাই করা প্রচুর মারাত্মক সব মারণাস্ত্র প্রদান করলেন, ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। না, কোনো সাধনভজনে আধ্যাত্মিক উপদেশ-পরামর্শ তিনি রামকে দেননি। যুদ্ধবাজ ব্যক্তি যুদ্ধাস্ত্রই প্রদান করবেন এতে আর অস্বাভাবিকতা কী! সাধু-সন্ন্যাসীদের কাছে এত অস্ত্র কেন? কী করতেন ভয়ানক সব অস্ত্র দিয়ে? রাক্ষসদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে? মুনিঋষিদের রাক্ষসরা অত্যাচার করতেন একথা সর্বৈ সত্য নয়। সুতীক্ষ মুনি নিজেই স্বীকার করেছেন, তাঁর আশ্রমে রাক্ষসরা হামলা করেন না। শুধুমাত্র শত শত নির্ভয় হরিণের উপদ্রব ছাড়া আশ্রমে আর কোনো উপদ্রব নেই। তা সত্ত্বেও সুতীক্ষ মুনির আশ্রমে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র মজুত ছিল। তিনি রাম-লক্ষ্মণকে তূণ, ধনুক, খদি দিয়েছিলেন।অগস্ত্যের আশ্রমেও রাক্ষসরা উপদ্রব করতেন না। তা সত্ত্বেও অগস্ত্যেরও বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার।
এরপর তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রে দেখা যায় রামশিবিরে। যুদ্ধ করেছেন। তারপর পাওয়া যায় এক্কেবারে উত্তরকাণ্ডে এসে। এসময় রাম অযোধ্যার রাজা। রাজার কাছে প্রচুর ক্ষীর-মধু, সেই ক্ষীর-মধুর প্রাপ্তির আশায় ভারত উপমহাদেশের তাবড় তাবড় পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্রাহ্মণের দল অযোধ্যায় এসে ভীড় করেছেন। জল ছাড়া যেমন মাছ বাঁচে না, তেমনই রাজা ছাড়া ব্রাহ্মণরা বাঁচেন না, ব্রাহ্মণ ছাড়াও রাজার কীর্তি ছড়ায় না। যে যার মতো করে গুণকীর্তন করতে থাকেন। রাজাও গদগদ হয়ে লোভনীয় পদ থেকে মণি-কাঞ্চন সবই অকাতরে দান করতে থাকেন তাঁদের। এ পর্যায়ে সমস্ত ব্রাহ্মণকে টপকে গেছেন অগস্ত্য। অগস্ত্য রামমাহাত্ম্য শুনিয়েছেন। রাজা রাম প্রশ্ন করছেন, আর অগস্ত্য এক কাহিনি থেকে আর-এক কাহিনিতে অবাধে চলে গেছেন। রামকে স্বয়ং বিষ্ণু হিসাবে ঘোষণা করে দিলেন। শুধু তাই-ই নয়, বনবাস ও যুদ্ধকালীন রাম যে অন্যায়গুলি করেছেন সেগুলি থেকে কলঙ্কমুক্ত করতে বা মাহাত্ম্য দিতে রাবণকেও ভগবান বানিয়েছেন। রাবণ ও অন্যান্য লঙ্কা-নায়করা অভিশাপের ফলেই এই রাক্ষস-জন্ম। আর রাক্ষস-জন্মে রাবণ ভয়ংকর অপরাধী, কামুক, অহংকারী, ধর্ষক। এহেন মানুষকে হত্যা করে ‘ভগবান রাম উচিত কাজই করেছেন। শুধু উচিত কাজই করেননি, তিনি রাবণকে অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছেন এবং পৃথিবীর সাধারণ মানুষকে অনাচার থেকে রক্ষা করেছেন।
