দুর্বাসা : মহর্ষি অত্রির ঔরসে ও অনসূয়ার গর্ভে দুর্বাসার জন্ম হয়। তপঃপ্রভাবে ইনি তেজের আধার ছিলেন বটে, কোপনস্বভাব ছিলেন বলে অনেকেই তাঁর কোপানলে দগ্ধ হন। ঔর্বমুনির কন্যা কন্দলীকে দুর্বাসা বিবাহ করেন। দুর্বাসা এতটাই কোপনস্বভাবা ও অভিশাপপ্রিয় ছিলেন যে, দুর্বাসাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেওয়া হয়েছিল–স্ত্রীর শত অপরাধ পর্যন্ত তিনি মার্জনা করবেন। সেই অনুসারে শত অপরাধের পরের অপরাধে দুর্বাসা স্ত্রীকে অভিপাশ দিয়ে ভস্ম করে দেন। মনে পড়ে গেল মহাভারতের শিশুপালের কথা–শিশুপালকেও ১০০টি অপরাধের পর ১০১ নম্বর অপরাধে শ্রীকৃষ্ণ শিশুপালকে হত্যা করেন। কার্যক্রমে কী মিল!
মহাভারতে পাণ্ডবজননী কুন্তী যখন কুন্তীভোজের গৃহে ছিলেন, তখন তাঁর সেবায় তুষ্ট হয়ে দুর্বাসা তাঁকে ‘আহ্বান মন্ত্র’ দান করেন। যার ফলে সূর্য, ধর্ম, পবন, ইন্দ্র প্রভৃতি উর্বর রাজাকে আহ্বান করে কুন্তী বিয়ের আগের কর্ণ এবংবিয়ের পরে যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুনকে জন্ম দেন।
একবার দুর্বাসা ভ্রমণ করতে করতে এক অপ্সরার হাত থেকে ‘সন্তানক’ নামে পুষ্পমাল্য লাভ করেন। ওই মালা তিনি ইন্দ্রের ঐরাবতের মাথায় স্থাপন করলে ঐরাবত সেই মালা ছিন্নভিন্ন করে মাটিতে ফেলে দেয়। এই কারণে দুর্বাসা ইন্দ্রকেই অভিশাপ দিয়ে শ্রীভ্রষ্ট করেন। অতিথি আপ্যায়নে উদাসীন হওয়ায় ইনি শকুন্তলাকে অভিশাপ দিলে দুষ্মন্ত কর্তৃক পরিত্যক্ত হন। দুর্বাসার অভিশাপেই শাম্ব যদুবংশনাশক মুষল প্রসব করেন। এর ফলে যদুবংশ ধ্বংস হয়।
এহেন মুনি দুবার্সা মহাভারতের যুগে অভিশাপ-টভিশাপ দিয়ে দাপটের সঙ্গে সবাইকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রেখেছিলেন। কিন্তু গোটা রামায়ণে দুর্বাসার দেখা পাওয়া যায়নি। দেখা পাওয়া গেল উত্তরকাণ্ডে এসে, রামের শাসনামলে। দ্বাররক্ষীর মতো নিকৃষ্ট কাজে লক্ষ্মণকে নিয়োগ করলেন রাজা রামা দ্বাররক্ষী আগেই ছিল, তাকে অপসারণ করে লক্ষ্মণকে নিয়োগ করা হল। দ্বাররক্ষীর দায়িত্ব দিয়ে রাম লক্ষ্মণকে এটাও জানিয়ে দিলেন–“স্বয়ং দ্বারে দণ্ডায়মান থাকো। এই ঋষি ও আমার নির্জনে যাহা কথাবার্তা হইবে যদি কেহ তাহা দেখে বা শুনে সে আমার বধ্য হইবে।” লক্ষ্মণ যখন দ্বাররক্ষীর দায়িত্ব পালন করছিলেন, ঠিক তখনই হাজির সেই ভয়াল ভয়ংকর ক্রোধী এই ব্রাহ্মণ-পুরুষ, তিনি দুর্বাসা। রাজদ্বারে এসে লক্ষ্মণকে দুর্বাসা বললেন–“তুমি শীঘ্রই রামের সহিত আমার দেখা করাইয়া দাও।” লক্ষ্মণ জানালেন–রাম এখন রাজকার্যে ব্যস্ত আছেন। দেখা করা সম্ভব নয়।
একথা শুনে দুর্বাসা স্বভাবদোষে ক্ষিপ্ত হলেন এবং বললেন–“আমি সবংশে তোমাদের চার ভ্রাতার উপর এবং গ্রাম নগর সকলেরই অভিসম্পাত করিব।” দ্বাররক্ষী হিসাবে আত্মরক্ষার কোনো জায়গা নেই লক্ষ্মণের। ওটা অনৈতিক, অশাস্ত্রীয়! রামের অনুমোদনের জন্য লক্ষ্মণের প্রবেশ করা মানে মৃত্যুদণ্ডকে বরণ করে নেওয়া। যদি অনুমোদনের জন্য লক্ষ্মণ রামের কাছে নাও যান এবং দুর্বাশা যদি রামের সঙ্গে দেখা করতে এসে বিমুখ হয়ে ফিরে গেলেও সর্বনাশ। অতএব মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও এ যেন হিংস্র বাঘের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া! লক্ষ্মণ রামের আলোচনাকক্ষে ঢুকে দুর্বাসা আগমনবার্তা দিলেন রামকে। অতিবলের দূতকে বিদায় দুর্বাসাকে অভিবাদন জানালেন রাজা রাম।
রামের সত্যপালনের স্বার্থে লক্ষ্মণের হত্যা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ল। লক্ষ্মণ রামচন্দ্রের বধ্য। আদতে রাজা রাম সত্যনিষ্ঠ থাকতে পারেননি। লক্ষ্মণকে হত্যা করেননি, বর্জন করলেন। ব্রাহ্মণ-পুরুষ বশিষ্ঠ নিদান দিয়েছেন–“আপনার জনের পক্ষে ত্যাগ বা বধ উভয়ই সাধুগণের চক্ষে সমান।” অতএব আর দেরি কেন! এক্ষণকে লক্ষ্মণকে পরিত্যাগ করো। আজীবন অনুচর লক্ষ্মণকে রাজা রাম বর্জন করলেন। এতে লক্ষ্মণ আত্মহত্যা করেন তো অতি উত্তম। লক্ষ্মণ আত্মহত্যাই করবেন। দুর্বাসা সব জেনেশুনে লক্ষ্মণ বর্জন ও লক্ষ্মণের আত্মহননের প্ররোচনায় অংশীদারী হলেন। আআসলে দুর্বাসা সম্প্রদায় অতীব নিষ্ঠুর। এঁরা অত্যাচারী মুনিবেশী সেনা। এই সম্প্রদায়কে অমান্য করা মানে সমূলে নির্বংশ হওয়া। দুর্বাসা অতিবলের দূতের পিছনে পিছনে এসেছিল বদমাইসি করার জন্যে। উদ্দেশ্য, লক্ষ্মণকে মন্ত্রণা কক্ষে পাঠিয়ে রামের প্রতিজ্ঞা অনুসারে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করা। দুর্বাসা সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা বড়োই সাংঘাতিক। এঁরা চুলমাত্র অসম্মানিত বোধ করলেই বিনামেঘে বজ্রপাত ডেকে আনতেন!
অগস্ত্য : অগস্ত্য সম্বন্ধে বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে যা জানা যায়, আগে সেটুকু বলে নিতে পারি। সর্বজনভাবে জানা যায়, ইনি বেদের একজন মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি। ঋকবেদে বলা হয়েছে, ইনি মিত্র (সূর্য) ও বরুণের পুত্র। আদিত্য-যজ্ঞে মিত্র ও বরুণ স্বৰ্গবেশ্যা উর্বশীকে দেখে যজ্ঞকুম্ভের মধ্যেই বীর্যপাত করে ফেললেন। সেই কুম্ভেই সেই বীর্য থেকেই বশিষ্ঠ ও অগস্ত্যের জন্ম হয়। ভাগবতে অগস্ত্যকে পুলস্তের পুত্র বলা হয়। কুম্ভে জন্মেছেন বলে অগস্ত্যের অন্য নামগুলি হল–কলসীসূত, কুম্ভসম্ভব, ঘটোৎভব, কুম্ভযোনী। মিত্র ও বরুণের পুত্র বলে নাম হয় মৈত্রাবরুণি। সমুদ্র পান করেছিলেন বলে নাম হল পীতাব্ধি। বাতাপিকে ধ্বংস করেছিলেন বলে নাম হয় বাতাপিদ্বীট। বিন্ধ্যপর্বতকে শাসন করেছেন বলে বিন্ধ্যকূট।
