জাস্টিফাই। ব্যস, সাতখুন মাফ! সাতখুন মাফ করতে গিয়ে রাম হয়েছেন নিমিত্তমাত্র, যা হয়েছে যা করেছে। সবই বিষ্ণু তথা আর্যদেবতারা করেছেন। তাই নানা উদ্ভট ও অতিকল্পনার কাহিনি সংবলিত করে বানরাও দেবতা, হনুমানও দেবতা, এমনকি সমগ্র রাক্ষসদেরও দেবতা বলে ঘোষণা করতে হয়েছে। যা হয়েছে তা সমাজকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য হয়েছে, রামকাণ্ড সবই ভগবান-দেবতাদের গটআপ গেম। অরণ্যকাণ্ড, সুন্দরকাণ্ড, লঙ্কাকাণ্ডে রামকে প্রায় কিছুই করতে হয়নি, সবই নেপথ্য থেকে রামকে সামনে রেখে আর্যদেবতারাই করেছেন। অগস্ত্য তাঁর বক্তব্যে এটা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে তাঁরা জগতকে শিক্ষা দিতে লীলা করেছেন এবং স্বর্গে রওনা দিয়েছেন। যুদ্ধের আগ পর্যন্ত রাম নিপাট নিরীহ অতি সাধারণ মানুষই ছিলেন, রাজা হওয়ার পর রাম ভগবান হলেন। রামের সব অপরাধ স্থালিত হল, আমরা সবাই রামভক্ত হলাম! উত্তরকাণ্ডে অগস্ত্যের আবির্ভাব না-ঘটলে রামেরও ভগবান হওয়া হত না, রামায়ণ ধর্মগ্রন্থও হতে পারত না।
আসলে রামকে ‘ভগবান’ বলে ঘোষণা করে নতুন কিছুই করেননি অগস্ত্য। রামকে যখন অগস্ত্য বলছেন, রাম তখন রাজা–অযোধ্যার রাজা। রাজা তো ভগবানই। রাম একা নন, যে যুগে সব রাজাই ভগবান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যাঁরা ছাত্র তাঁরা জানেন রাষ্ট্রর উৎপত্তির বিষয়ে ঐশ্বরিক মতবাদ।
মনুর বলছেন রাজা কে? রাজশূন্য এই জগতকে রক্ষার জন্য ইন্দ্র, বায়ু, যম, সূর্য, অগ্নি, বরুণ, চন্দ্র এবং কুবের–এই দেবতার সারভূত অংশ নিয়ে পরমেশ্বর রাজাকে সৃষ্টি করেছেন। যেহেতু এই শ্রেষ্ঠ দেবগণের অংশ থেকে রাজার সৃষ্টি হয়েছিল সেইজন্য তিনি সকল জীবকে তেজে অভিভূত করেন।(অরাজকে হি লোকেহস্মিন্ সর্বতো বিদ্রুতে ভয়াৎ।/রক্ষার্থমস্য সর্বস্য রাজানমসৃজৎ প্রভুঃ।/ইন্দ্রানিলমার্কাণামগ্নেশ্চ বরুণস্য চা/চন্দ্রবিত্তেশয়োশ্চৈব মাত্রা নিৰ্দ্ধত্য শাশ্বতীঃ।/যস্মদেষাং সুরেন্দ্রাণাং মাত্রাভ্যো নির্মিততা নৃপঃ।/তস্মাদভিভবত্যেষ সর্বভূতানি তেজসা”।(মনুসংহিতা, সপ্তম অধ্যায়, শ্লোক ৩-৪-৫) রাজা কী? মনু বলছেন–(১) তিনি সূর্যের মতো চোখ ও মন সন্তপ্ত করেন। পৃথিবীতে কেউ তাঁকে মুখোমুখি অবলোকন করতে পারে না। (২) বালক হলেও রাজাকে মানুষ মনে করে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। ইনি মানুষের রূপে মহান দেবতা। (৩) অতি নিকটে গেলে আগুন একমাত্র সেটাই দগ্ধ করে, কিন্তু রাজারূপ আগুন বংশ-পশু সম্পত্তি সহ দগ্ধ করে। (৪) রাজার অনুগ্রহে বিশাল সম্পত্তি লাভ হয়, যাঁর বীরত্বে জয়লাভ হয়, যাঁর ক্রোধে মৃত্যু বাস করে, তিনি প্রকৃতই সর্বতেজোময়। ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজার নিষ্কণ্টক সিংহাসনও পাক্কা।
যবদ্বীপে (বর্তমানে জাভা। জাভা ভারত মহাসাগরের একটি দ্বীপ। এটি ইন্দোনেশিয়ার একটি অংশ। প্রাচীনকালে জাভা নিকটবর্তী অঞ্চলগুলির মতো হিন্দু রাজাদের অধীনে ছিল) ঋষি অগস্ত্যের খুব নাম-ডাক। দক্ষিণ ভারতে তামিল দেশেও অগস্ত্যের পুজো হয়। অগস্ত্য ঋষিকে কোথাও কোথাও শিবের অভিন্ন রূপে কল্পনা করা হয়। বস্তুত দক্ষিণ ভারত থেকেই যবদ্বীপে অগস্ত্যপুজো প্রচারিত হয়েছিল বলে মনে করেন ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। প্রাচীন যবদ্বীপে অষ্টম-নবম শতকে কয়েকটি তারিখ দেওয়া শিলালেখ পাওয়া যায়। সেইসব শিলালেখে অগস্ত্যের উল্লেখ আছে।
রামায়ণের পার্শ্বচরিত্র : ইন্দ্রজিৎ, কুম্ভকর্ণ, বিভীষণ, মন্দোদরী, শত্রুঘ্ন, শান্তা, মন্থরা, লবকুশ, মারীচ, শূর্পণখা, অহল্যা, মহিরাবণ
রামায়ণে রাম-লক্ষ্মণ-সীতা-রাবণ ছাড়াও অসংখ্য ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি আছে, জনমানসে তাঁরা প্রায় অনুচ্চারিতই থেকে গেছেন। কিন্তু তাঁদেরকে বাদ দিলে, তাঁদেরকে স্মরণ না-করলে রামায়ণ অসমাপ্ত থেকে যাবে। বাল্মীকি রাময়ণে যেমন ইন্দ্রজিৎ, মন্দোদরী, শত্রুঘ্ন, শান্তা, মন্থরা, লবকুশ, মারীচ, শূর্পণখাদের পাই, তেমনই অন্য রামায়ণে অহল্যা, মহিরাবণের মতো ব্যক্তিদেরও পাই। আসুন পাঠকবন্ধু, রামায়ণে বিস্মৃতপ্রায় হয়ে আছেন, এমন কয়েকজন প্রায় অপ্রধান অথচ শক্তিশালী কিছু চরিত্রের উপস্থিতি বুঝে নিই। কুম্ভকর্ণ, বিভীষণ,
ইন্দ্রজিৎ : গোটা রামায়ণে ‘প্রকৃত বীর’ বলে যদি কেউ থেকে থাকেন, তিনি ইন্দ্রজিত। ইন্দ্রজিৎ, ওরফে মেঘনাথ। যুদ্ধে তাঁর মৃত্যু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁকে বীর শিরোপা দিতে কার্পণ্য করা উচিত হয় না। ইন্দ্রজিৎ বা মেঘনাদ বা মেঘনাথ রামায়ণে বর্ণিত এক যোদ্ধা। তিনি সমগ্র মানব, দানব, অন্যান্য সৃষ্টি ও দেবদেবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বীরযোদ্ধা ও একমাত্র অতি মহারথী দানবদের গুরু শুক্রের শিষ্য ত্রিমূর্তিধারী ইন্দ্রজিৎ রাবণের পুত্র। মেঘনাদ রাম ও রাবণের মধ্যে সংঘটিত লঙ্কার যুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি দুইবার রাম ও লক্ষ্মণকে পরাভূত করেন। কিন্তু তৃতীয় বারে বিভীষণের সহায়তায় লক্ষ্মণ নিকুম্ভিলায় উপস্থিত হয়ে মেঘনাদকে অসহায় ও নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যা করেন।
মেঘনাদের জননী ছিলেন মায়াসুরের কন্যা তথা রাবণের রাজমহিষী মন্দোদরী। জন্মের সময় মেঘনাদ বজ্ৰনাদের ন্যায় চিৎকার করেছিলেন। সেই কারণে তাঁর নাম মেঘনাদ। অন্যমতে, মেঘের আড়াল থেকে ঘোর যুদ্ধ করতেন বলে তাঁর নাম হয় মেঘনাদ। আবার দেবরাজ ইন্দ্রকে পরাভূত করেছিলেন বলে তিনি ইন্দ্রজিৎ নামেও অভিহিত হন।
