বশিষ্ঠ : বশিষ্ঠ মুনিকে রামায়ণ, মহাভারত, বেদ, বিভিন্ন পুরাণে সর্বত্র বিচরণ করতে দেখা যায়। যুগ থেকে যুগান্তরে এইসব মুনিঋষিদের যেন বয়সের কোনো গাছপাথর নেই। ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য যে কতটা তীব্র ছিল, তা মুনিঋষিদের দৌরাত্ম্য দেখেই অনুধাবন করা যায়। এতটাই দৌরাত্ম্য যে, কখনো কখনো দোর্দণ্ডপ্রতাপ ক্ষত্রিয়রাও পুতুলে পরিণত হয়ে যায়। বাল্মীকি রামায়ণেও তিনি সক্রিয় অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছেন।
বশিষ্ঠ মিত্রাবরুণের পুত্র, তাই বশিষ্ঠের অন্য নাম মৈত্রাবরুণি। অথর্ববেদের আধার মহর্ষি বশিষ্ঠ ছিলেন সূর্যবংশীয় অযোধ্যা-রাজগণের কুলগুরু। হরিবংশ মতে ইনি ব্রহ্মার মানসপুত্র। পুরাণান্তরে ইনি আবার সপ্তর্ষিগণের মধ্যেও একজন। জানা যায়, বশিষ্ঠের সহযোগিতায় অভিশাপে রাক্ষসযোনিপ্রাপ্ত ইক্ষ্বাকুবংশীয় রাজা সৌদাস শাপমুক্ত হন। কোথাও উল্লেখ আছে, রামচন্দ্রের কাছে যে রামায়ণ কীর্তন করেন, তা ‘যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ’ বলে খ্যাত।
বিষ্ণুপুরাণ থেকে জানা যায়–রাজর্ষি নিমি একবার দীর্ঘ যজ্ঞানুষ্ঠানের জন্য বশিষ্ঠকে পুরোহিতরূপে বরণ করেন। কিন্তু তার আগেই বশিষ্ঠ ইন্দ্রের এক যজ্ঞে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন বলে নিমিকে অপেক্ষা করতে বলেন। বলেন–ইন্দ্রের যজ্ঞকার্য সম্পন্ন হলেই নিমির যজ্ঞে নিযুক্ত হবেন। বহু বছর বাদে ইন্দ্রের যজ্ঞ থেকে ফিরে এসে জানতে পান যে, নিমি ইতিমধ্যেই গৌতম মুনিকে দিয়ে যজ্ঞকর্ম সম্পন্ন করে নিয়েছেন। বশিষ্ঠ মুনি ক্রুদ্ধ হন। তারপর যা হয়–তেড়ে অভিশাপ–নিমির শরীর চেতনাবিহীন হবে। তবে নিমিই-বা ভড়কাবেন কেন! ক্ষত্রিয় বলে কথা, তিনিও একটা অভিশাপ ঠেলে দিলেন বশিষ্ঠের শরীরে, বললেন–বশিষ্ঠও চেতনাবিহীন হবেন। যেই বলা সেই কাজ! বশিষ্ঠ তখন অশরীরী হয়ে অন্য দেহ ধারণের জন্য ব্রহ্মার সাক্ষাতে যান। ব্রহ্মা যাতে একটি দেহ তাঁকে দান করেন, তাঁর জন্য প্রার্থনা করেন। ব্রহ্মা তখন তাঁকে মিত্রাবরুণের তেজে প্রবিষ্ট হয়ে পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে বলেন।
মার্কণ্ডেয় পুরাণেই বশিষ্ঠ ও বিশ্বামিত্রের বিরোধের কাহিনি জানা যায়। বশিষ্ঠ মুনি রাজা হরিশ্চন্দ্রেরও কুলপুরোহিত ছিলেন। মহাভারতে রাজা হরিশ্চন্দ্রের চণ্ডাসত্বপ্রাপ্তি ও রাজ্যনাশ, স্ত্রী-পুত্র বিক্রয় ইত্যাদি ঘটনার জন্য বিশ্বামিত্রই দায়ী ছিলেন। এই সংবাদ জানতে পেরে বশিষ্ঠ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বিশ্বামিত্রকে অভিশাপ দিয়ে বকপক্ষীতে পরিণত করেন। বিশ্বামিত্রও অভিশাপ দিয়ে বশিষ্ঠকেও অন্য এক পক্ষীতে পরিণত করে। তারপর শুরু হয়ে যায় তুমুল যুদ্ধ। অবশেষে ব্রহ্মার মধ্যস্থতায় দুজনেই পূর্বদেহ ফিরিয়ে দিয়ে দুজনের মধ্যে আপাত শান্তি স্থাপন হয়।
বাল্মীকির রামায়ণে দেখা যায়, বশিষ্ঠ সূর্যবংশ তথা ইক্ষ্বাকুবংশের কুলপুরোহিত ছিলেন। দশরথের পুত্রদের জাতকর্মাদিতে পৌরোহিত্য করেন। বশিষ্ঠ মূলত ভরত-সমর্থক ও রামচন্দ্র বিরোধী ছিলেন। কুলপুরোহিত হলেও বশিষ্ঠ মুনিকে দশরথ বিশেষ পছন্দ করতেন বলে কোনো নমুনা পাই না। নমুনা যা পাই তা এরকম–রামের যখন ১৬ বছর বয়স, তখন দশরথের রাজসভায় বিশ্বামিত্র উপস্থিত হলে দশরথ তাঁকে মহাসম্মান প্রদর্শন করেন। এ ঘটনাটি যখন ঘটে তখন মহর্ষি বশিষ্ঠ রাজসভায় উপবিষ্ট ছিলেন। শত্রুকে বড়ো আসন দেওয়াটা বশিষ্ঠের কাছে সন্মানের ছিল না। বিশ্বামিত্রের প্রতি দশরথের যদি নিছক সম্মান প্রদর্শনও হয়, তবুও বিষয়টি সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, দশরথ কিন্তু কুলগুরু বশিষ্ঠের কাছে রামচন্দ্রকে দীক্ষিত করেননি, রামচন্দ্র দীক্ষিত হয়েছিলেন বিশ্বামিত্রের কছে। রাম ও লক্ষ্মণের বিবাহের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ নয়। কিন্তু বশিষ্ঠ অনাহূত হয়ে অযোধ্যায় পৌঁছে ভরত ও শত্রুম্নকে বিবাহের ব্যবস্থা করেছিলেন বশিষ্ঠপন্থী কুশধ্বজের কন্যাদের সঙ্গে। কিন্তু ভরতপন্থী বশিষ্ঠ এখানেই থেমে থাকবেন কেন? থেমে থাকলে তো নিজের লবির ভরতকে অযোধ্যার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করা দুষ্কর হয়ে যাবে! প্রাসাদ বিপ্লবের পিছনে যে বশিষ্ঠেরও হাত আছে! অতএব বিবাহের শেষে অযোধ্যায় ফেরার আগেই পথের কাঁটা বিশ্বামিত্রকে সরিয়ে দিতে বশিষ্ঠ সক্রিয় হলেন।
এরপর বশিষ্ঠ অযোধায় ফিরে এসে বিন্দুমাত্র সময় অতিবাহিত করেননি। অযোধ্যার রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে অতি দ্রুত কিছু ঘটনা ঘটে গেল। দশরথের কাছ থেকে রামের বনবাস ও ভরতের রাজ্যলাভের বর চেয়ে নিলেন কৈকেয়ী, যদিও দশরথ ভরতকে রাজা করতে নারাজ। দশরথকে গৃহবন্দি করলেন কৈকেয়ী, রাম লক্ষ্মণ-সীতা দণ্ডকারণ্যের গভীর জঙ্গলে চলে গেলেন, দশরথের অকালমৃত্যু হল, ভরত অযোধ্যার রাজা হলেন। বশিষ্ঠ জানতেন দশরথ ভরতকে ত্যাজপুত্র করেছেন এবং ভরতকে অযোধ্যার রাজা হওয়ার কোনো অনুমতিই দেননি, ক্ষমতা হস্তান্তর করেননি। তা সত্ত্বেও বশিষ্ঠ সমস্ত বাধানিষেধ অগ্রাহ্য করে ভরতকে অযোধ্যার সিংহাসনে বসিয়েছেন। দীর্ঘ ১৪ বছরের বেশি বশিষ্ঠের পৃষ্ঠপোষকতায় ভরত অযোধ্যায় রাজত্ব করে গেলেন। লঙ্কাযুদ্ধের শেষে সসৈন্যে রামচন্দ্র অযোধ্যায় পৌঁছোলে ভরত ভীত হয়ে রামের জন্য সিংহাসন ছেড়ে দেন। বশিষ্ঠও ভোল বদলে রামচন্দ্রের প্রধান উপদেষ্টা হয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকলেন।
