রাম বিশ্বামিত্রের একান্ত অনুগত। রাম এখন বিশ্বামিত্রের ছায়াসঙ্গী। হ্রস্বরোমনের পুত্র জনকরাজা সীরধ্বজ ঘোষণা দিয়েছেন–“যে ব্যক্তি এই হরকামুকে জ্যা আরোপণ করিতে পারিবেন আমি তাহাকেই এই কন্যা দিব।” এ ঘোষণা বিশ্বামিত্রের কানেও পৌঁছোয়। বিশ্বামিত্রের অগাধ বিশ্বাস, এ কাজ অপরিসীম বলশালী রামের পক্ষেই সম্ভব। অতএব রাম-লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্বামিত্র মিথিলায় চললেন। রামচন্দ্র হরধনু ভঙ্গ করতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং সীরধ্বজের কন্যা সীতার পাণিগ্রহণ করেছিলেন। এখানে ভাবার বিষয়, বিশ্বামিত্র দশদিনের জন্য রাম-লক্ষ্মণকে অরণ্যে এনেছিলেন যজ্ঞ রক্ষার জন্য রাক্ষসদের শায়েস্তা করতে। তারপর কাজ মিটে গেল যথারীতি দশরথের কাছে রামকে প্রত্যপর্ণ করার কথা। অযোধ্যার রাজসভায় এমনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিশ্বামিত্র। কিন্তু তাই বলে বিয়ে? এটা কি পুরোনো সেই ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের বিরোধটাকে খুঁচিয়ে তোলা? রামের বিবাহের ব্যাপারে দশরথ কোনো দায়িত্ব বিশ্বামিত্রে দেননি। এ দায়িত্ব নিয়ম অনুযায়ী পিতা হিসাবে দশরথের। কুল-পুরোহিত বামদেব বা কুলগুরু বশিষ্ঠের উপর সে দায়িত্ব অর্পণ হতে পারে। তবে কি সুযোগ বুঝে বশিষ্ঠকে এক হাত নিয়ে নেওয়া? বুদ্ধিমানরা সুযোগই হাতছাড়া করেন না, তবে শেষরক্ষা না-হলে সব মাঠে মারা যায়। ঘোড়া যেন আগেই ফুঁ না দিয়ে দেয়! বিশ্বামিত্রেরও শেষরক্ষা হয়নি।
দশরথ কিংবা বামদেব কিংবা বশিষ্ঠের অনুমতির অপেক্ষা না-করেই জনকরাজা সীরধ্বজের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে দিলেন বিশ্বামিত্র। তাই বলে দশরথকে তিনি অন্ধকারেও রাখেননি। অতএব দূত প্রেরণ করে দশরথকে সংবাদ পাঠান–“আপনি মিথিলা রাজ্যে আগমন করিলে পুত্রদ্বয়েরই বিবাহ মহোৎসব উপভোগ করিতে পারিবেন। সংবাদ শুনে অনুযোগ তো দূরের কথা, উলটে খুবই আনন্দিত হয়ে দশরথ পাত্রমিত্র সমভিব্যাহারে মিথিলার পথে রওনা দিলেন। পরে অবশ্য বিনা নিমন্ত্রণে অনাহূতের মতো অযোধ্যায় বিবাহের আসরে হাজির ভরত-মাতুল যুধাজিৎ, ভরত, শত্রুঘ্ন, বশিষ্ঠ প্রমুখেরা। তাই জনককন্যা সীতা ও ঊর্মিলার সঙ্গে যথাক্রমে রাম লক্ষ্মণের বিবাহ হলেও বশিষ্ঠপন্থী কুশধ্বজের কন্যাদ্বয় মাণ্ডবী ও শ্রুতকীর্তির সঙ্গে যথাক্রমে ভরত ও শত্রুঘ্নর বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যায়। এর ফলে বশিষ্ঠের সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে বিশ্বামিত্রের হটে যাওয়া। হটে যাওয়া এখানেই শেষ নয়, শুরু।
বশিষ্ঠকে পঙ্গা! ভরতপন্থী বশিষ্ঠের পরাজয় হলে তো এতদিনের প্রয়াস সব ব্যর্থ হয়ে যাবে! বিশ্বামিত্র যদি একটিবার রাম-লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে অযোধ্যায় পৌঁছে যেতে পারে তাহলে তো সব চক্রান্তে জল পড়ে যাবে। ভরতদের অযোধ্যায় এনে বিবাহ দিয়ে বশিষ্ঠ অনেকটাই সফল। এতটা এসে মাঝপথে নৌকা উল্টে যাবে! অযোধ্যা পথে রওনা দেওয়ার সময় বিশ্বামিত্র হঠাৎই অন্তর্ধান হলেন। যাত্রার প্রাক্কালে বশিষ্ঠকে ন্যূনতম সৌজন্য পর্যন্ত দেখাননি বিশ্বামিত্র। রামায়ণকার জানালেন–“পরদিন প্রভাতে মহর্ষি বিশ্বামিত্র রাজা দশরথ ও জনককে সম্ভাষণপূর্বক হিমাচলে প্রস্থান করিলেন।” যিনি এত উদ্যোগ করে এত কিছু করলেন তাঁর হঠাৎ বৈরাগ এলো কেন? রহস্য কী? বশিষ্ঠ-যুধাজিৎ-ভরতের থ্রেড? কী এমন ভয়ংকর পরিণতি ঘটে গিয়েছিল যে, বিশ্বামিত্রকে অন্তর্হিত হতে হল? গোটা রামায়ণে বিশ্বামিত্র আর ফিরে আসেননি। এমনকি রাম যখন রাজা হয়ে ব্রাহ্মণ পরিবৃত্য সারা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণরা যখন রামের রাজসভা অলংকৃত করে আছেন, তখনও বিশ্বামিত্র নেই। রামও বিশ্বামিত্রের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি। রাম-সীতার বিবাহের মুখ্য যোগাযোগকারী বিশ্বামিত্র পরিশেষে মহাকাব্যে উপেক্ষিত হলেন কেন? এ ঘটনা কি রামচন্দ্রের অকৃতজ্ঞতাই প্রকটিত হয়নি! রাজনীতিতে সব সম্ভব।
বশিষ্ঠ জানতেন, অতি সত্বর অযোধ্যায় ক্ষমতা হস্তান্তর হবে, এসময় বিশ্বামিত্রের উপস্থিতি মোটেই সুখকর হবে না। একথা নিশ্চিত, কোনোভাবে বিশ্বামিত্র অযোধায় পৌঁছোতে পারলে তাঁর প্রভাব খাঁটিয়ে দশরথের মৌনতাকে সরিয়ে দিয়ে রামের বনবাসে স্থগিত ঘটিয়ে রাজ্যভার রামের হাতে তুলে দিতেন। কারোর কিছু বলার থাকত। কারণ প্রথা অনুযায়ী রামই যোগ্যতম এবং প্রধান দাবিদার। এর ফলে দশরথের অকাল মৃত্যু হত না, সীতা অপহরণ ও সতীত্বহানি হত না, বালীর অনর্থক মৃত্যু ও সুগ্রীবের রাজ্যলাভ এবং বউদি-ভোগ হত না, রাম রাবণের বিধ্বংসী যুদ্ধও হত না, বিভীষণের রাজ্যলাভ ও বউদি-ভোগ হত না। সবচেয়ে বড়ো কথা ভরতের এ জন্মে আর রাজা হওয়া হত না। বশিষ্ঠও কোণঠাসা হয়ে পড়ত। বিশ্বামিত্র অযোধ্যা ফিরলে অযোধ্যার যা পরিস্থিতি ছিল, তাতে রামায়ণ না-হয়ে আর-একটা মহাভারত হয়ে যেত। আরও একটি ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের মহাকাব্য রচিত হত। কারণ বশিষ্ঠ-ভরত-কেকয়-যুধাজিৎ-কৈকেয়ী বিনাযুদ্ধে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তেন না। ফলে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ সংঘটিত হত এবং সেই যুদ্ধে রাম অবশ্যই জয়লাভ করতেন।
মিথিলায় বিশ্বামিত্রের অন্তর্ধানের ফলে সে ঘটনা ঘটতে পারেনি। ঠিক ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে বিশ্বামিত্রের অন্তর্ধান নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধানের ঘটনাটা মনে পড়িয়ে দেয়। নেতাজিও অন্তর্হিত হয়েছিলেন ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রায় প্রাক্কালেই। নেতাজির প্রতিপক্ষ তখন নেহরু, গান্ধি, জিন্নাহ। স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান কে হতেন, যদি নেতাজির অন্তর্ধান না-হতেন? দেশভাগ হয়ে পাকিস্তানের জন্মও হয়তো সম্ভব হত না।
