অতঃপর বিশ্বামিত্র পূর্বদিকে গিয়ে পুনরায় তপস্যা করতে লাগলেন। এর অনেক বছর পরে ব্রহ্মা তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হন এবং তাঁকে ব্রাহ্মণত্ব প্রদান করেন। বিশ্বামিত্র ক্ষত্রিয় থেকে ব্রাহ্মণে কনভার্ট হলেন। বিশ্বামিত্র ব্ৰহ্মর্ষিত্ব প্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘ পরমায়ু, চতুর্বেধ এবং ওঙ্কার লাভ করে মনোরথসিদ্ধি হওয়ায় আনন্দসাগরে ডুবে রইলেন। এইসময় ইক্ষ্বাকুবংশীয় রাজা ত্রিশঙ্কু সশরীরে স্বর্গে গমন করার অভিলাষে বশিষ্ঠের শরণাপন্ন হন। কিন্তু বশিষ্ঠ ও তাঁর পুত্ররা তাঁকে সাহায্য করতে অসম্মত হন। এর ফলে রাজা ত্রিশঙ্কু বিশ্বামিত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিস্তারিত জানান। বিশ্বামিত্র নিজ পুণবলে ত্রিশঙ্কুকে সশরীরে স্বর্গে প্রেরণ করেন বটে, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। কারণ ইন্দ্রাদি দেবগণ ক্রুব্দ হয়ে ত্রিশঙ্কুকে নতমস্তকে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে ফেরত পাঠিয়ে দেন। ত্রিশঙ্কুর এহেন পতনে বিশ্বামিত্র ক্রুব্ধ হয়ে স্বীয় তপোবলে তাঁকে শূন্যে স্থাপন করে দ্বিতীয় স্বর্গ সৃষ্টি করতে আরম্ভ করে দিলেন। বিশ্বামিত্রের এই কাজে দেবতারা আধিপত্য খোয়ানোর ভয়ে বিপন্ন হয়ে পড়ার ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে। পড়েন এবং যথারীতি তারা থরহরিকম্পে বিশ্বামিত্রের শরণাপন্ন হন। অবশেষে এক ড্রিল হয়–আকাশে জ্যোতিশ্চক্রের বহির্দেশে অধঃশিরা ত্রিশঙ্কু দেবতুল্যরূপে অবস্থান করবেন এবং নক্ষত্রগণ তাঁর অনুসরণ করবে।
ব্ৰহ্মার ঋষিত্ব প্রদানে সন্তুষ্ট না-হয়ে বিশ্বামিত্র আরও উগ্রতর তপস্যায় প্রবৃত্ত হলেন। দেবতারা ভয় পেয়ে মহাসুন্দরী স্বৰ্গবেশ্যা মেনকাকে লেলিয়ে দিলেন বিশ্বামিত্রের তপস্যা ভাঙতে। মুনি-ঋষি হলেও তাঁরা যে সর্বদাই কাম দ্বারা বশীভূত, সে-কথা তথাকথিত দেবতারাও জানতেন। যাই হোক, বিশ্বামিত্র যখন তপস্যায় প্রবৃত্ত হলেন, তখন মেনকা সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে পুষ্করতীর্থে স্নান করতে থাকলেন। বিশ্বামিত্র তাঁর রূপে কামজ্বরে বিচলিত হয়ে পড়েন এবং টানা ১০ বছর সহবাস করেন। এই সহবাসের ফলে মেনকা গর্ভবতী হয়ে পড়েন। মেনকার গর্ভের সেই সন্তানই শকুন্তলা। এই কন্যাসন্তান শকুন্তলাকে জঙ্গলে পরিত্যক্ত করে মেনকা স্বর্গে ফিরে যান, আর বিশ্বামিত্র ওই স্থান ত্যাগ করে উত্তরদিকে হিমালয়ের কৌশকী নদীর তীরে আবার তপস্যায় বসেন এবং অবশেষে ব্রহ্মার বরে মহর্ষিত্ব প্রাপ্ত হন।
মার্কণ্ডেয় ও অন্যান্য পুরাণে আছে–হরিশ্চন্দ্রকে কেন্দ্র করেও একবার বশিষ্ঠ বিশ্বামিত্রের উপর ক্ষুব্ধ হন। ফলে পরস্পর পরস্পরকে অভিশাপ দেন এবং সেই অভিশাপের ফলে দুজনেই পক্ষীতে পরিণত হয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হন। অতঃপর ব্রার মধ্যস্থতায় এঁদের বিরোধের অবসান ঘটে। ব্রাহ্মণকুলের প্রাণভোমরা “ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ তৎ সবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহিধিয়ো যো নঃ প্রচোদ্দয়াৎ।” (বাংলা তর্জমা : আমরা সেই পরম সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা করছি–যিনি যুদ্ধের শক্তিদায়ক, যিনি সমস্ত জ্ঞানের উৎসস্থল, যিনি উজ্জ্বল আলোকবর্তিকাস্বরূপ। তিনি যেন আমাদেরকে প্রভূত বিচার বুদ্ধি শক্তি প্রয়োগ করার ক্ষমতা দেন।)–এই প্রসিদ্ধ গায়ত্রী মন্ত্রটির রচয়িতা ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্র।
বিশ্বামিত্রের যজ্ঞনাশের জন্য রাক্ষসজাতিরা সর্বদা সচেষ্ট ছিল। রাক্ষসদের অত্যাচারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে অযোধ্যায় এসে রাজা দশরথের সঙ্গে দেখা করেন বিশ্বামিত্র এবং দশরথের অনুমতিগ্রহণপূর্বক তিনি রাম ও লক্ষ্মণকে দশ রাত্রির মেয়াদে নিজের আশ্রমে নিয়ে গিয়ে তাঁদের অবলা ও অতিবল মন্ত্র শিক্ষা দেন এবং দিব্যাস্ত্র সকল দান করেন। এর ফলে রাম ও লক্ষ্মণ তাড়কা রাক্ষুসী সহ অসংখ্য রাক্ষস হত্যা করেন। এরপর দুই ভাইকে নিয়ে বিশ্বামিত্র চললেন জনকপুরীতে। পথে অবশ্য গৌতম মুনির আশ্রমে রামকে দিয়ে অহল্যার পাষাণমুক্তির কাজটাও করিয়ে নেন বিশ্বামিত্র।
দশরথের কুলগুরু ছিলেন বশিষ্ঠ। তা সত্ত্বেও বিশ্বামিত্রের কাছেই রামকে দীক্ষিত করেছিলেন দশরথ। এই কাহিনির মধ্যে বিশ্বামিত্রের এইভাবেই আকস্মিক প্রবেশ ঘটেছে। বশিষ্ঠকে অগ্রাহ্য করে দশরথ বিশ্বামিত্রকে কতটা পাওয়ার দিয়েছিলেন, তা বোঝা যায়, দশরথের অজ্ঞাতসারে বিশ্বামিত্রের রামের বিবাহ সম্পর্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্য দিয়ে। রামের বিবাহের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কে পিতা দশরথ নয়, গুরু বিশ্বামিত্র। বশিষ্ঠ কুলগুরু হওয়া সত্ত্বেও রাজা দশরথ ছিলেন বিশ্বামিত্রের সমর্থক। অবশ্য একথা বশিষ্ঠ যে বোঝেননি, তা নয়। তাই বিশ্বামিত্রের সঙ্গে রামকে পাঠানোর জন্য দশরথকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বশিষ্ঠ। কেন এত উদার হলেন বশিষ্ঠ? বিশ্বামিত্র তো তাঁর মিত্র নন, বরং চরম শত্রু। তাঁর শতপুত্র হত্যাকারী বিশ্বামিত্রের সঙ্গে পাঠাতে দ্বিমত পোষণ করলেন না কেন? হরপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এ বিষয়টা স্পষ্ট করে দিলেন–“রাম যেহেতু বিশ্বামিত্রের সমর্থক, রাক্ষসদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে রামকে প্রেরণের ব্যাপারে বশিষ্ঠ তাই বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলেন না। বালক রামের মরা-বাঁচা, মঙ্গল-অমঙ্গলের চিন্তা তাঁর মনে স্থান পেল না। সম্ভবত রামের প্রতিপক্ষ সিংহাসনের ন্য দাবিদার ভরতের ভবিষ্যৎ নিষ্কণ্টক করার জন্যই বশিষ্ঠ বিশ্বামিত্রের প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেন।” কারণ বশিষ্ঠ ছিলেন ভরতের সমর্থক এবং রামের বিরোধী।
