বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ, অগস্ত্য, দ্রোণাচার্য, মার্কণ্ডেয় প্রমুখ মুনিঋষিরা ছিলেন প্রচণ্ড যুদ্ধবাজ। এঁদের কাছে প্রচুর মারণাস্ত্র মজুত থাকত। এঁরা নির্জনে বসে আর্যদেবতাদের অস্ত্রাগার (সামরিক ঘাঁটি) পাহারা দিতেন। রামচন্দ্র বনবাসজীবনে এইসব মুনিঋষিদের ঘাঁটিতে গেছেন, আর প্রচুর মারণাস্ত্র সংগ্রহ করেছেন। আশ্রম তো নয়, যেন এক-একটা কেল্লা। কোনো গল্পকথা নয়, এসব বিবরণ পুরাণেই স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে। এইসব অস্ত্রাগার লুঠ করার জন্যই নিশাচররা অতর্কিতে হামলা করতেন। নিজেরা নিরুপদ্রব রাখতেই অযোধ্যা থেকে বিশ্বামিত্র বয়ে এনেছিলেন রামচন্দ্রকে, নিশাচরদের হত্যা করার জন্য। হত্যা করার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র বিশ্বামিত্রই দিয়েছিলেন। মুনি-ঋষিদের আমি ‘ঘাঁটি’ বলেছি। ঘাঁটি কেন বললাম? আশ্রম বলা হয় লোকমুখে, এইসব আশ্রম মানে কোনো পর্ণকুটীর নয়। আশ্রম মানে শুধু ধ্যান করার নির্জন স্থান বোঝায় না। এখানে রীতিমত শ্রম দিতে হয়। আশ্রমগুলি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বলা যেতে পারে। এখানে এক বা একাধিক শিক্ষাগুরু থাকতেন। এখানকার শিক্ষার্থীদের শাস্ত্র, সাহিত্য, ব্যাকরণ, রাজনীতি, যুদ্ধবিদ্যা ইত্যাদি শিক্ষাদানের ব্যবস্থা হত। ছিল অস্ত্রাগার। মারাত্মক সব অস্ত্রের ভাণ্ডার ছিল আশ্রম। এই আশ্রমগুলোর ব্যয়ভার সংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজা বহন করতেন। কিংবা রাজপ্রদত্ত ভূসম্পত্তি ও গোসম্পত্তি থেকে আহূত সম্পদের মাধ্যমে মেটানো হত।
বিশ্বামিত্র : ঋগ্বেদ রচয়িতা হিসাবে এক ঋষি বিশ্বামিত্রের নাম পাওয়া যায়, যাকে মোট ১৮ সূক্তের একক ও ৬ সূক্তের রচয়িতা হিসাবে পেয়েছি। পরবর্তীকালে ভারতীয় সংস্কৃত পুরাণ ও সাহিত্যের কাহিনিতে এ নামে প্রচুর কল্পগাথা বর্ণিত হয়েছে। ইনি যেমন আছে ত্রেতাযুগের বাল্মীকির রামায়ণের বালকাণ্ড অধ্যায়ে, তেমনই আছে দ্বাপরযুগের কৃষ্ণদ্বৈপায়ণের মহাভারতের আদি পর্বেও। ব্ৰহ্মর্ষি বলেই তিনি খ্যাত। কারণ ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করেও কঠোর তপস্যাবলে ইনি ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেন। ইনি সপ্তর্ষিদের তৃতীয় মণ্ডলের সমস্ত সূক্তের মন্ত্রগুলির অভিবক্তা। বিশ্বামিত্র কখনোই ব্রাহ্মণ্যধর্মকে অস্বীকার করেননি। বরং যজ্ঞ ও দক্ষিণার ব্যাপারে ক্ষত্রিয়দের ভাগীদার করতে চেয়েছিলেন। এই ইস্যুতে সমস্ত ক্ষত্রিয়দের নিয়ে জোট বেঁধেছিলেন তিনি। ব্রাহ্মণদের একা খেতে দিতে নারাজ ছিলেন তিনি। বারবার তিনি ব্রাহ্মণদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছেন। হরিবংশ প্রভৃতি পুরাণে বিশ্বামিত্র পৌরব, কৌশিক, গাধিজ ও গাধিনন্দন প্রভৃতি নামে অভিহিত হয়েছেন। রাজা হরিশ্চন্দ্রের চণ্ডাসত্বপ্রাপ্তি ও রাজ্যনাশ, স্ত্রী-পুত্র বিক্রয় ইত্যাদি ঘটনার পিছনে বিশ্বামিত্রই দায়ী ছিলেন।
জানা যায় মহর্ষি বিশ্বামিত্র ছিলেন প্রাচীন ভারতে একজন রাজা ছিলেন। এছাড়া তিনি ‘কৌশিক’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি অসমসাহসী যোদ্ধা। ইনি ব্রহ্মার মানসপুত্র প্রজাপতি কুশ নামক এক রাজার প্রপৌত্র ও ধার্মিক কুশনাভ রাজার পুত্র গাধির সন্তান ছিলেন মহর্ষি বিশ্বামিত্র। বাল্মিকীর রামায়ণের বালকাণ্ডের ৫১ চরণে এ বিষয়ে লেখা আছে। গাধিরাজের মৃত্যুর পর বিশ্বামিত্র রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন এবং বীরবিক্রমে রাজ্যশাসন করতে থাকেন। তিনি অতুল ঐশ্বর্য ও বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারী ছিলেন। এছাড়াও তাঁর শতাধিক পুত্র ও অসংখ্য সৈন্য ছিল জানা যায়। বিশ্বামিত্রের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠের সঙ্গে বিরোধ। বিশ্বামিত্র-বশিষ্ঠের এই বিরোধের জল যে কতদূর গড়াতে পারে, তা বাল্মীকির রামায়ণেই প্রমাণ পেয়েছি। শুধু বাল্মীকির রাময়ণেই নয়, এই বিরোধের কথা ঋগ্বেদে অনেকবার উল্লিখিত হয়েছে। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের মধ্যে যে আধিপত্য ও শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব চলেছিল, তা রক্তপাত ও বিচ্ছেদেই শেষ হয়েছে।
বিশ্বামিত্র কোনো একদিন এক অক্ষৌহিণী সেনা (১০৯৩৫০ পদাতিক, ৬৫৬১০ ঘোড়া, ২১৮৭০ হাতি এবং ২১৮৭০ রথ) ও পুত্রদেরকে সঙ্গে নিয়ে মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে উপস্থিত হলে বশিষ্ঠ মুনি কামধেনু নন্দিনীর। (আর-এক নাম সবলা) সাহায্যে উপস্থিত সকলকে পূর্ণ তৃপ্তিসহকারে ভোজন করান। একটি সাধারণ আশ্রমে এত বিপুলসংখ্যক লোকের খাদ্য সরবরাহের বিষয়ে বিশ্বামিত্র আগ্রহী হয়ে কামধেনুর অবিশ্বাস্য গুণাবলি জেনে বশিষ্ঠের কাছে তা প্রার্থনা করেন। বশিষ্ঠ জানান যে, নন্দিনী হচ্ছে ইন্দ্রের কামধেনুর কন্যা, এর সাহায্যে যখন যা চাওয়া হয় তাই-ই পাওয়া যায়। বিশ্বামিত্র সবলাকে নিতে চাইলে বশিষ্ঠ কামধেনুকে দান করতে অস্বীকার করেন এবং উভয়ের মধ্যে তুমূল বাদানুবাদ ও তীব্র বিবাদের সৃষ্টি হয়। বিশ্বামিত্র তাঁর সুদক্ষ সৈনিকদের সহায়তায় বলপূর্বক কামধেনুকে কেড়ে নিতে উদ্যত হলে ঋষিবর সবলার সাহায্যে অসংখ্য সৈন্য সৃষ্টি করে রাজার সমস্ত সৈন্যদল ধ্বংস করে ফেলেন। এছাড়াও অন্যান্য রাজপুত্র বশিষ্ঠকে আক্রমণ করতে এগিয়ে এলে। মহর্ষি ব্রহ্মতেজে বিশ্বামিত্রের শতপুত্রকে দগ্ধ করে মেরে ফেলেন। বিশ্বামিত্র এরূপে সৈন্যবিহীন অবস্থায় ও শতপুত্রশোকে কাতর হয়ে নিজ রাজধানীতে ফিরে এসে অবশিষ্ট এক পুত্রের কাঁধে রাজ্যের শাসনভার প্রদান করে বনে চলে যান এবং শিবের কঠোর তপস্যায় মনোনিবেশ করেন। শিব বিশ্বামিত্রের তপস্যায় অতি সন্তুষ্ট হয়ে বর প্রদানে উপস্থিত হলে বিশ্বামিত্র তার কাছে মন্ত্রসহ সাঙ্গোপাঙ্গ ধনুর্বেদ সম্পূর্ণ আয়ত্ত করে নেন। পয়ে তিনি মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে পুনরায় গিয়ে পোবন নষ্ট করে ফেলেন এবং পরে ঋষিবরের উপর পুনরায় অস্ত্রবর্ষণ করেন। কিন্তু বশিষ্ঠ ব্ৰহ্মদণ্ড হাতে নিয়ে বিশ্বামিত্রের সমস্ত অস্ত্রের মোকাবিলা করেন। এরূপে হতমান ও হতদর্প হয়ে বিশ্বামিত্র অস্ত্রবলের চেয়ে ব্রহ্মবলের শ্রেষ্ঠত্ব উপলদ্ধি করেন এবং নিজে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করার জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। সেজন্য তিনি পত্নীসহ দক্ষিণে গমন করে কঠোর তপস্যা করতে লাগলেন। এ সময়ে তাঁর আরও তিন পুত্রের জন্ম হয়। অনেক অনেক বছর পরে ব্রহ্মা স্বয়ং উপস্থিত হয়ে বিশ্বামিত্রকে রাজর্ষিত্ব প্রদান করেন। দীর্ঘকাল পরে ব্রহ্মা বিশ্বামিত্রের কাছে উপস্থিত হয়ে তাকে মহর্ষিত্ব প্রদান করেন। কিন্তু ব্রহ্মা তাকে বললেন, “তোমার সিদ্ধিলাভের বহু বিলম্ব আছে, কারণ তুমি এখনও ইন্দ্রিয় জয় করতে পারনি।” এ কথা শুনে মহর্ষি পুনরায় চূড়ান্ত তপস্যায় প্রবৃত্ত হলেন। এ সময়ে বিশ্বামিত্রের তপোভঙ্গ করার লক্ষ্যে দেবরাজের আদেশে স্বৰ্গবেশ্যা রম্ভা সমাগতা হলে মহর্ষি তাকে শাপ প্রদানে দীর্ঘকালের নিমিত্ত পাষাণে পরিণত করেন। উপরন্তু ক্রোধের কারণে তপস্যার ফল নষ্ট হয়েছিল।
