বাল্মীকি সীতার গর্ভজাত যমজ সন্তান কুশ ও লবকে রামায়ণ গানে পারদর্শী করে তুলেছিলেন। একদিন সেই প্রশস্তিমূলক রামায়ণ গান শোনাতে লবকুশকে সঙ্গে নিয়ে রামের যজ্ঞসভায় পৌঁছে যান বাল্মীকি। সীতার ‘আত্মশুদ্ধি’-র পরীক্ষার সময়েও বাল্মীকি রামচন্দ্রের রাজসভায় স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। বাল্মীকির কাছে দশ বছর যাবৎ আশ্রিতা সীতা দশমবর্ষীয় দুই বালকের মাকে আবার সন্দেহ। যজ্ঞসভায় উপস্থিত সকলের সামনে রামচন্দ্র বললেন–সীতাকে যদি পাপস্পর্শ না-করে থাকে, তাহলে তিনি যেন এখানে উপস্থিত হয়ে আত্মশুদ্ধি করেন। আসলে সীতা বিসর্জনের দশ বছর পরও সীতা এখনও বেঁচে আছেন, এটাই তো রামের কাছে অবিশ্বাস্য। বিগত দশ বছরে রাম একবারের জন্যেও খবর নেননি স্ত্রী বেঁচে আছেন না মরে গেছেন। মনে মনে সীতাহীন জীবন মেনে নিয়েই রাম উদবেগহীন দশ-দশটা বছর কাটিয়ে দিল! তাই সীতাদেবী চোখের আড়াল যেমন হয়েছেন, মনের আড়ালও হয়ে গেছেন।
সীতাকে নিয়ে সভায় আসতে বাল্মীকি সম্মত হয়েছেন। বাল্মীকি সভাস্থলে প্রবেশ করলেন, সঙ্গে সীতাও। সীতাকে শপথ নিয়ে আজ আত্মশুদ্ধি করে সতী কি না প্রমাণ দিতে হবে। বাল্মীকি রামচন্দ্রের অমূলক সন্দেহ নিরসনের চেষ্টা করতে লাগলেন। রাম-রাবণ-বান্দর-ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-শূদ্র সকলেই যখন সীতাকে ‘অপবিত্র’ সাব্যস্ত করেই চললেন, তখন বাল্মীকিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি বললেন–“এই দুই যমজ কুশীলব জানকীর গর্ভজাত। আমি সত্যই কহিতেছি, ইহারা তোমারই ঔরসজাত পুত্র। দেখো, আমি পুত্ৰপরম্পরায় প্রচেতা হইতে দশম। আমি যে কখনও মিথ্যা কহিয়াছি, ইহা আমার স্মরণ হয় না। এক্ষণে আমার বাক্যে বিশ্বাস করো, ইহারা তোমারই ঔরসজাত পুত্র। আমি বহুকাল তপস্যা করিয়াছি, এক্ষণে যদি জানকীর চরিত্রগত অনুমাত্রও ব্যতিক্রম ঘটিয়া থাকে, তবে আমায় যেন সেই সঞ্চিত তপস্যার ফলভোগ করিতে না-হয়। আমি এ যাবৎকাল কায়মনোবাক্যে কখনও পাপাঁচরণ করি নাই; এক্ষণে যদি জানকী নিষ্পাপ হন, তবে সেই পাপ না-করিবার ফল আমায় যেন ভোগ করিতে হয়।…জানকীকে শুদ্ধাচারিণী বুঝিয়া বন হইতে লইয়া আসি। এক্ষণে এই পতিপরায়ণা তোমার মনে আত্মশুদ্ধির প্রত্যয় উৎপাদন করিবেন।” মহামুনি বাল্মীকির শপথবাক্যকে রামচন্দ্র এভাবে হেলায় দূরে ঠেলে দেবে সে কথা স্বয়ং ভাবতে পারেননি। রামচন্দ্র অবিচল, সিদ্ধান্তে অটল। সীতাকে আর কোনো প্রয়োজন নেই। সীতার থাকা আর সীতার যাওয়ার মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই। অতএব চিতা সাজাও এবং পোড়াও। সীতার শেষতম আশ্রয়দাতা বাল্মীকিও সীতাকে রক্ষা করতে পারলেন না। তবে বাল্মীকির উপস্থিতিতেই সীতা রামের আদেশকে অগ্রাহ্য করলেন। তিনি পরীক্ষা দিলেন না। স্পর্শাস্পর্শের বিষয়ে কোনো কৈফিয়ত পর্যন্ত দিলেন না। পৃথিবী বিদীর্ণ হলে তার মধ্যে সীতা প্রবেশ করলেন। এই পাতাল প্রবেশের ঘটনা হরপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতে, “বাস্তব অবস্থার পটভূমিকায় একথা মনে করা বোধহয় অসংগত হবে না যে, যজ্ঞস্থলের কোনো খনিত কূপে অথবা কোনো যজ্ঞকুণ্ডে আত্মবিসর্জন দিয়েছিলেন সীতা।” বাল্মীকির আশ্রমে বাস করেও সীতা রেহাই পেলেন না৷ আসলে লঙ্কা জয়ের পর (ভুল বললাম। লঙ্কা জয়ের পর নয়, আরও অনেক আগে রাবণ কোলে চাপিয়ে সীতাকে হরণের কাহিনি জটায়ুর কাছ থেকে শোনার পর থেকেই। “অঙ্ক, আরোপ্য তু পুরা রাবণেন বলা ধৃতা”–ওহে সীতা, তোমাকে তো রাবণ কোলে তুলে নিয়ে গিয়ে তাঁর রথে চাপিয়ে ছিল। সুতরাং তোমার সতীত্ব তো প্রশ্নাতীত নয়া) থেকে রাম সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন যে তিনি আর স্ত্রীকে গ্রহণ করবেন না। তাই তিনি তিন-তিনবার নিজের স্ত্রীকে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন। একবার শ্বাপদসংকুল গভীর জঙ্গলে, দু-বার লেলিহান আগুনে। সিদ্ধান্ত যখন পূর্বেই স্থির হয়ে আছে, তখন বাল্মীকি কেন স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু এলেও তা নড়চড় হওয়ার উপায় নেই। এ কোন্ রাম, যিনি বাল্মীকিকে অপমান করেন, নিজপুত্রদের স্বীকার করেন না! নিশ্চয় এ রাম সেই প্রেমিক রাম নয়, রাজা রাম বটে! অবাক হই না, কারণ পূর্বে তিনি সর্বসমক্ষে বলেই দিয়েছেন “কুকুরে চাটা ঘি ভোগ করা যায় না”। অতএব ‘আপ রুচি খানা, পর রুচি পরনা। তবে অনেকে মনে করেন উত্তরকাণ্ডের বাল্মীকি আদি কবি নন, ইনি তৎকালীন জনৈক প্রচেতা বংশীয় দশম পুরুষ। অতএব উত্তরকাণ্ডের ঘটনাগুলি ইতিহাস বলে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া যায় কি? কেন নয়? প্রক্ষিপ্ত হতেই পারে। তাই বলে ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই একথা বলা যায়। ব্রাহ্মণ্যবাদের উত্থান এই পর্বতেই, যা ঐতিহাসিকভাবে সত্য।
মুনিবর বাল্মীকির শেষ পরিণতি বা মৃত্যু সম্বন্ধে কিছুই জানা যায় না।
রামায়ণে মুনি-ঋষি-ব্রাহ্মণের আধিপত্য
বাল্মীকির রামায়ণে বেশকিছু মুনিঋষিদের উপস্থিতি লক্ষ করি আমরা। এই মুনিঋষিরা শুধু রামায়ণেই আছেন, তা নয়। এঁরা মহাভারতে যেমন আছেন, তেমনই বিভিন্ন পুরাণেও আছেন। কী করে থাকেন যুগ থেকে যুগান্তরে? তাহলে তো তাঁদের বয়স হাজার হাজার হওয়ার কথা। বার্ধক্য নিয়ে অমরত্ব বলেও কিছু হয় না। সেটা ভাবলে কি বাস্তবোচিত হয়? লক্ষ করবেন পাঠক, এইসব মুনিঋষিরা সকলেই একই সঙ্গে বয়োবৃদ্ধ, জ্ঞানবৃদ্ধ। অতএব বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ, অগস্ত্য প্রমুখ ব্যক্তি মনে হয় না কোনো একজন ব্যক্তি নন, একাধিক ব্যক্তির পদ (Designation)। এই ধরনের পদে একমাত্র বয়োবৃদ্ধ ও জ্ঞানবৃদ্ধ ব্যক্তিরাই উন্নীত হতে পারেন। যেমন আধুনিক সময়ে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, রাজ্যপালের মতো পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা বয়োবৃদ্ধ ও জ্ঞানবৃদ্ধই হয়ে থাকেন। তাই ব্যক্তি না-থাকলেও পদ থেকে যায় যুগে যুগে। সেই পদে অন্য যোগ্যতম ব্যক্তি আসীন হন। বশিষ্ঠ, অগস্ত্য ইত্যাদি পদগুলি প্রাচীন যুগে ব্রাহ্মণদের সর্বোচ্চ পদ। অসীম ক্ষমতা ভোগ করতেন তাঁরা। শুধু মুনিঋষিরাই নয়–ব্রহ্মা, ইন্দ্র, শিব, মনু, বেদব্যাস, এমনকি পোপ, শঙ্করাচার্য, দলাইলামাও পদের নাম। কোনো একজন ব্যক্তি নয়।
