জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর “রামায়ণের উৎস কৃষি” গ্রন্থে বলেছেন–“শোকবিহ্বল বাল্মীকির কণ্ঠ হতে শ্লোক উগ্নীত হওয়ার পরক্ষণেই ছন্দোবদ্ধ তন্ত্ৰীলয়সমন্বিত অভিশাপ বাণীর মধ্যে বাল্মীকি ‘বেদ অপৌরুষেয়’ এই নির্ণয় করে বিস্মিত হলেন ভেবে নিতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। কেননা অভিশাপকালে কি কেউ অভিশাপ বাণীটি ছন্দোবদ্ধ ও তন্ত্ৰীলয়সমন্বিত করে তোলার জন্য সচেতন থাকেন? এও যদি সম্ভব হয় তাহলে বাণীটি উদ্গীত হওয়ার পরক্ষণেই তাৎক্ষণিক পরিবেশ ও ঘটনা ভুলে বাণীটির ছন্দ ও সুর নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতে পারেন?”
রামায়ণ তথা পৌলস্ত্যবধ কাব্য রচয়িতা বাল্মীকি ছাড়াও আরেকজন বাল্মীকির কথা জানা যায়। তিনি ভৃগুপুত্র চ্যবণ। চ্যবণই হলেন আদি বাল্মীকি। অনেক পণ্ডিতগণ মনে করেন, রামায়ণের রচনা শুরু হয়েছিল আদিকবি চ্যবণেরই হাতে। অশ্বঘোষের মতে, রামায়ণের বাল্মীকি হলেন চ্যবণ অথবা চ্যবণপুত্র অথবা চ্যবণ বংশজাত ভার্গবাকেউ বলেন বাল্মীকি বরুণের পুত্র। বল্মীক মানে উইপোকার ঢিবি, উইপোকার ঢিবি বা বল্মীক আকৃতির মাটির ঘরে বাল্মীকি বাস করতেন এ কাহিনি অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। এমন ঘরে বাস করতেন বলেই চ্যবণ মুনি বাল্মীকি নামে পরিচিত ছিলেন। ভারতের একটি অনার্য জাতি বাস করেন, তাঁরা বাল্মীকি, তাঁদের পদবি বাল্মীকি–রামায়ণ রচয়িতা এঁদেরই পূর্বপুরুষ কি না, ভাবা যেতে পারে। অপরদিকে ‘ভিল রামায়ণ’-এর ভিলরা বাল্মীকির বংশধর বলে দাবি করেন। ভিল রামায়ণে বাল্মীকির নাম রত্নাকর ভিল। রামায়ণে উল্লিখিত দক্ষিণ কোশলের (বর্তমানে ছত্রিশগঢ়) যে অঞ্চলে বাল্মীকির আশ্রয় ছিল বলে দাবি করা হয়, সেই অঞ্চলটি মূলত ভিল জাতির আদি বাসস্থান, বিন্ধ্যপার্বত্য অঞ্চল। ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার সহ অনেক ঐতিহাসিকই মনে করেন, রামায়ণের রাম-রাবণের যুদ্ধের মূল কাহিনি এসেছে বিন্ধ্য পার্বত্য অঞ্চলের দুই গোষ্ঠীর লড়াই থেকে। তবে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী বাল্মীকিকে আদিবাসী বা বনবাসী মানুষ বলে স্বীকার করেন না, তাঁর মতে বাল্মীকি ভার্গব ব্রাহ্মণ। অপরদিকে মহাভারতের দ্রোণপর্বের চতুর্থ অধ্যায়ে উল্লেখ আছে–বাল্মীকি একটি জাতিবিশেষের নাম। বাল্মীকি মানে বল্মীকভব। বাল্মীকি কোনো ব্যক্তিবিশেষের নাম নয়। বাল্মীকি হল একটি পদবি এবং বাল্মীকি পদবির মানুষরা ভারতের মুক্তিসংগ্রামের কাহিনি লিখেছেন। বর্তমানে ওরা মেথরের কাজ করেন। বল ধাতু আর কীক প্রত্যয় জুড়ে বল্মীক শব্দটি নিষ্পন্ন হয় (বল + কীক = বল্মীক)। বল ধাতুর সঙ্গে কীক জুড়তে গেলে মাঝে একটি ম আসে, একে বলে বর্ণের আগম বা বর্ণাগম। বল্মীক মানে শুধু উইঢিবি নয়, এখানে বল্মীক মানে সংগৃহীত ঘটনাপরম্পরার স্তূপ।পাণিনি বলেছেন–‘বাল্মীকি বাৎস্যায়ন গোত্রের নাম। বাল্মীকি জাতিরা অধুনা দিল্লির কাছে বসবাস করে এবং এঁরা অস্পৃশ্য। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন–তিনি রাজা দশরথের সমসাময়িক ভৃগুবংশীয় আর্য ব্রাহ্মণ। তাঁর কবিখ্যাতিও সম্প্রসারিত ছিল। সেই খ্যাতি শুনে আর্যদেবতা ব্রহ্মা পদাধিকারী স্বয়ং আসেন তাঁকে রামায়ণ রচনার ভার অর্পণ করতে। কারও মতে বাল্মীকির আগে রামায়ণ রচনার চেষ্টা করেন শতপথ ব্রাহ্মণ ও মহাভারতের পৌরাণিক ঋষি চ্যবন। আচার্য সুনীতিকুমারের মতে, ভৃগুবংশীয় ঋষি চ্যবন বাল্মীকির পূর্বপুরুষ এবং তপস্যাকালে তাঁর বল্মীকস্তূপে পরিণত হওয়ার অলৌকিক কাহিনিটি বাল্মীকির কবিখ্যাতির সুন্দরভাবে মিশে গেছে। মহাভারতের চ্যবনকে ভৃগুপুত্র ভার্গব বলা হয়েছে। ডঃ ভবতোষ দত্ত এ বিষয়ে বলেছেন–ভৃগুবংশে বল্মীকাচ্ছাদিত হওয়ায় কিংবদন্তী থাকায় প্রত্যেকেই বাল্মীকি নামে পরিচিত হতেন। না-হলে বাল্মীকি যুদ্ধকাণ্ডের শেষে কেন লিখবেন–“আদিকাব্যমিদং চার্যং পুরা বাল্মীকি কৃত”, অর্থাৎ পুরাকালে ঋষি বাল্মীকি এই আদিকাব্য রচনা করেছিলেন। স্বয়ং গ্রন্থ রচনা করে বাল্মীকি একথা লিখলেন কেন? তাহলে কি এটি পরবর্তী সংযোজন? নাকি মহাকবি বাল্মীকি স্মরণ করেছেন আর-এক বাল্মীকিকে? তাহলে এই বাল্মীকি কি উত্তরকাণ্ড ও বালকাণ্ডের প্রথমাংশের রচয়িতা, যিনি অযোধ্যাকাণ্ড থেকে লঙ্কাকাণ্ডের বাল্মীকির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন বা ঋণ স্বীকার করছেন? উত্তরকাণ্ডে বাল্মীকির আশ্রমে সীতার অবস্থান, লবকুশের জন্ম এবং তাঁদের রামায়ণ শিক্ষা, লক্ষ্মণবর্জন, শম্বুক হত্যা, সদলবল মিলে সরযূ নদীতে প্রাণবিসর্জনই প্রধান ঘটনা। দুটো ঘটনাকে মেলানো যায় না। পরের বাল্মীকি হয়তো কেবলমাত্র উত্তরকাণ্ডেরই দর্শক। এই অংশে তাই বাল্মীকির উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, যিনি ব্রাহ্মণ্যবাদের পৃষ্ঠপোষক। যেমন অধ্যাত্ম রামায়ণের বাল্মীকি অরণ্যকাণ্ড থেকেই স্বয়ং দর্শক হয়ে উপস্থিত আছেন। সাম্প্রতিককালের পণ্ডিতরা বলছেন সমগ্র উত্তরকাণ্ড এবং বালকাণ্ডের চারটি সর্গ পরে সংযোজিত হয়েছে। এই দুই অংশের ভাষা ও রচনারীতিও স্বতন্ত্র। এ বাল্মীকি নিশ্চয় আদিকবি বাল্মীকি নন। আদিকবি বাল্মীকির রচনা কেবলমাত্র অযোধ্যাকাণ্ড থেকে লঙ্কাকাণ্ড।
গোটা রামায়ণে বাল্মীকি রচিত মহাকাব্য পেলেও, একেবারে শেষ অংশে (উত্তরকাণ্ডে) এসে আমরা বাল্মীকিকেই পেয়েছি। বাল্মীকি এ পর্যায়ে এসে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। গর্ভ লক্ষণাক্রান্ত সীতাকে নির্জন শ্বাপদসংকুল জঙ্গলে লক্ষ্মণ পরিত্যাগ করে এলে তখন বাল্মীকির সঙ্গে সীতার দেখা হয়। পরিত্যক্ত সীতাকে তাঁর আশ্রমে এনে কন্যাস্নেহে পালন করেছিলেন। সীতা এই আশ্রমে প্রায় দশ বছর ছিলেন। এই দশ বছরে সীতার খবর অযোধ্যার কেউ নেয়নি, রামও নয়। তবে কুশ ও লবের জন্মরাত্রে শত্রুয় এসেছিলেন বাল্মীকির আশ্রমে। না, বউদি সীতা এবং ভাইপো দেখতে তিনি আসেননি, এসেছিলেন নিজের কাজে। রাত্রিযাপনের জন্যই কেবল বাল্মীকির আশ্রমকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন।
