“কো স্বস্মিন্ সাম্প্রতং লোকে গুণবান কশ্চ বীৰ্য্যবান।।
ধর্মজ্ঞশ্চ কৃতজ্ঞশ্চ সত্যাবাক্যো দৃঢ়তঃ” ইত্যাদি।
‘সাম্প্রতম’–বর্তমান সময়ে, ইহলোকে এই ভূখণ্ডে কে এমন ব্যক্তি আছেন যিনি গুণবান বীর্যবান প্রভৃতি গুণসম্পন্ন? নারদ তপঃ স্বাধ্যায়রত’, বাল্মীকিও তপস্বী–উভয়ই জ্ঞানী। যেমন প্রশ্ন–এর উত্তর কি একটি ‘প্রচলিত কাহিনি’ হবে? এটা কি বর্তমান ব্যক্তি, না কল্পিত ব্যক্তি? দশরথ-তনয় রাম যে বাল্মীকির সমসাময়িক, সেটি পূর্বাপর ঘটনাবলির দ্বারাই প্রমাণিত।
কে এই বাল্মীকি? ইনি কি ভার্গব বংশজাত স্বয়ং বাল্মীকি চ্যবণ? ইনি কি অনার্য বংশজাত মহাকবি বাল্মীকি? বস্তুত তাঁর সম্বন্ধে ভরসা করার মতো ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। কৃত্তিবাসের রত্নাকর দস্যু থেকে বাল্মীকিতে পরিণত হওয়ার গল্প তো আগেই আলোচনা করেছি। মূলত হাতের কাছে নিজাম দস্যু বা ডাকাতের নিজামউদ্দিন আউলিয়া হওয়ার ঘটনাকে ঝেড়ে রত্নাকর দস্যু থেকে বাল্মীকির হয়ে যাওয়ার গল্প ফেঁদেছেন কৃত্তিবাস–পাপে পরিপূর্ণ (কতটা পাপ করলে পরিপূর্ণ হয় এবং ‘রাম’ শব্দটি উচ্চারণ করা যায় না, সে ব্যাপারে কোনো নির্দেশিকা কোনো শাস্ত্রে পাই না। রত্নাকর তো কেবলই ডাকাতি করতেন। এবং হত্যা করতেন। অবশ্য মহাপাতক’ বলে একটি শব্দ পাওয়া যায়, বলা হয়েছে তাঁরাই মহাপাতক যাঁরা ব্রহ্মহত্যা, সুরাপান, ব্রাহ্মণের ধন অপহরণ, গুরুপত্নী গমন ইত্যাদি করে।) দস্যু ‘রাম’ উচ্চারণ করতে পারে না। তাই মরা মরা বলতে বলতে উলটো উচ্চারণে ‘রাম রাম’ বলতে শিখেছেন। আসলে বোধহয় কৃত্তিবাস বলতে চেয়েছেন জীবনভর ‘রাম রাম’ জপ করলে শত মহাপাতকও মুক্তি পায়। বাল্মীকি যেকথা লঙ্কাকাণ্ডের শেষ অধ্যায়ে বলেছেন, সেটাই কৃত্তিবাস শুরুতেই বলে নিয়েছেন, যাতে ভক্তপাঠকগণ শুরু থেকেই রামকে ‘ভগবান’ হিসাবে সমীহ করেন। অথচ বাংলা ভাষা ছাড়া আর অন্য কোনো ভাষাতেই, বিশেষ করে সংস্কৃত ভাষাতে মরা’ শব্দ উচ্চারণ করতে করতে মরে গেলেও ‘রাম’ বলার সুযোগ নেই।
বেশিরভাগ বাঙালির কাছে রামায়ণজ্ঞান হল কৃত্তিবাসের শ্রীরাম পাঁচালী’ বা ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’। বাল্মীকির রামায়ণের সঙ্গে পরিচয় খুব বাঙালিরই আছে। কৃত্তিবাসী রামায়ণকে যেভাবে পাই কৃত্তিবাস নামক কোনো একজন বিশিষ্ট কবি যে তাঁর কাব্যপুথি গুণগ্রাহীদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন, গবেষণায় এমন কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া পল্লবগ্রাহিতা এবং প্রক্ষিপ্ত রচনার বাহুল্যের জন্য কৃত্তিবাসী রামায়ণ’ অপ্রামাণিকতা দোষে দুষ্ট।
বাল্মীকি যেহেতু রামচন্দ্রের সমসাময়িক, সেই কারণে তাঁর জীবনের বহু ঘটনার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত। তা ছাড়া সীতার শেষ জীবনও কেটেছিল বাল্মীকির আশ্রমে। সুতরাং ধ্যান করার প্রয়োজন নাই, সীতার মুখে বাল্মীকি অবশ্যই রামচন্দ্রের বনবাস জীবনের সকল ঘটনা জেনেছেন। গর্ভবতী অবস্থায় সীতার নির্বাসন ও বাল্মীকির আশ্রমে আশ্রয়লাভ হয়েছিল। সেখানে লবকুশের জন্ম ও কৈশোরকাল অতিবাহিত হয়। যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত শত্রুয় লবণবধের উদ্দেশ্যে মধুপুরী যাওয়ার কালে শ্রাবণ মাসে লবকুশের জন্ম। মথুরায় (মধুপুর) শাসন প্রতিষ্ঠিত করে দশ বছর পরে শত্রুঘ্ন যখন রামচন্দ্রকে দর্শনের উদ্দেশ্যে অযোধ্যা যান তখন একরাত্রি বাল্মীকির আশ্রমে বাস করার কালে রামায়ণ গান শুনেছিলেন। বাল্মীকি স্বয়ং ঐতিহাসিক রামচন্দ্রের সকল ঘটনার সঙ্গে সম্যকভাবে পরিচিত ছিলেন। এরপর আর প্রয়োজন হবে কেন নারদের কাছ থেকে রামকথা শুনে যাচাই করে নেওয়ার?
বাল্মীকি সংস্কৃত সাহিত্যের আদিকবি নামে কথিত। বাল্মীকিকে আদিকবি বা কবিগুরু বলার কারণ, প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, তিনিই প্রথম সংস্কৃত কাব্যে শ্লোকের রচয়িতা। তাঁকে ‘রামায়ণ’ ছাড়াও যোগবাশিষ্ঠ’ নামক অপর এক হিন্দু ধর্মগ্রন্থের রচয়িতাও মনে করা হয়। বাল্মীকিধর্ম ‘রামায়ণ’ ও ‘যোগবাশিষ্ঠ গ্রন্থদ্বয়ে বর্ণিত বাল্মীকির শিক্ষা অবলম্বনে সংগঠিত একটি ধর্মীয় আন্দোলন। মুনিবর শিষ্যগণকে নিয়ে আশ্রমে উপবিষ্ট আছেন, এমন সময়ে ব্রহ্মা উপস্থিত হলেন। তিনি ব্রহ্মাকে ব্যাধ-বৃত্তান্ত বলে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। ব্রহ্মা বললেন–“শোকের সময় এটি তোমার মুখ হতে নিঃসৃত হয়েছে। অতএব, এটি শ্লোক নামে অভিহিত হোক”। তুমি এরূপ শ্লোকে রামচরিত আখ্যায়ক রামায়ণ গ্রন্থ রচনা করো। সেই অনুসারে মুনিবর বাল্মীকি রামায়ণ রচনা করেন। শোক থেকে উৎপন্ন এই সংস্কৃত সাহিত্যের প্রথম শ্লোক। পরবর্তীকালে এই শ্লোকের ছন্দেই বাল্মীকি সমগ্র রামায়ণ রচনা করেন। এই কারণে এই শ্লোকটিকে সংস্কৃত সাহিত্যের প্রথম শ্লোক, রামায়ণকে প্রথম কাব্য ও বাল্মীকিকে ‘আদিকবি’ নামে অভিহিত করা হয়।
এই রামায়ণ ছয়টি (মতান্তরে সাতটি) কাণ্ড বা খণ্ডে বিভক্ত ছিল। রামায়ণের উপজীব্য অযোধ্যার রাজকুমার রামের জীবনকথা। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ থেকে ১০০ অব্দের মধ্যে কোনো এক সময়ে এই মহাকাব্য রচিত হয়। এই মহাকাব্য মহাভারতের পূর্বসূরি। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দী থেকেই বাল্মীকিকে ধ্রুপদি সংস্কৃত সাহিত্যের জনক মনে করা হতে থাকে। অশ্বঘোষের ‘বুদ্ধচরিত’ কাব্যে আছে–“বাল্মীকির কণ্ঠস্বর এমন এক কাব্য উচ্চারণ করেছিল যা মহাদার্শনিক চ্যবনও রচনা করতে পারেননি।’ এই উক্তি ও তার পূর্বাপর শ্লোকগুলির বক্তব্য থেকে বাল্মীকি ও চ্যবনের মধ্যে একটি পারিবারিক সম্পর্কের কথা অনুমিত হয়ে থাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাল্মীকি কর্তৃক রামায়ণ রচনার নেপথ্য-আখ্যান অবলম্বনে ‘বাল্মীকি-প্রতিভা গীতিনাট্যটি রচনা করেছিলেন। তবে বাল্মীকির রামায়ণের শেষভাগে জানা যাচ্ছে যে রামচন্দ্র যশোলাভেই বাল্মীকিকে রামকাহিনি লিখতে বলেছিলেন–“ভগবান! এই সমস্ত ব্ৰহ্মলোকাই ঋষি আমার ভবিষ্যচরিত শুনিতে উৎসুক হইয়াছেন, অতএব আগামীকল্য হইতে তাহা আরম্ভ করুন।”
