“মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কমমোহিতম্।”
মহর্ষি বাল্মীকি নিষাদ বা ব্যাধকে অকারণে অভিসম্পাত করলেন।
প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক বীরেন্দ্র মিত্র তাঁর ভাষ্যে বলেছেন–“আসলে এই কাহিনিটি বাল্মীকি-প্রবর্তিত নবীন। শ্লোকচ্ছন্দ ও অপূর্ব কাব্যরচনার জন্মবৃত্তান্ত। এ কাহিনির সঙ্গে বাল্মীকির অনন্যসুলভ কবিত্ব উন্মেষের কথা সংশ্লিষ্ট আছে, নেই রামকাহিনির কোনো সম্পর্ক। কিন্তু রামায়ণ কথাকাব্যের মধ্যে কৌশলে এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাটি সংযুক্ত করে দিয়েছেন কোনো বুদ্ধিমান পুরাণকার, যাঁর উদ্দেশ্য ছিল মহাকবি বাল্মীকির উপরে আর্য দেবায়নের মহামন্ত্রী ব্রহ্মার ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা।”
স্বরাজ্যর প্রজাপতি হলেন ব্রহ্মা। তাই দেবস্তাবক পুরাণকার চাননি ব্রহ্মাকে অতিক্রম করে মহাকবির প্রতিষ্ঠা হোক। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি রামকাহিনির সঙ্গে নবছন্দের উৎপত্তি-কথাকে জুড়ে দিয়ে ব্রহ্মাকেই পরমস্রষ্টা নির্মাণ করলেন। আর্য দেবায়তনপ্রধান ব্রহ্মা যখন বলছেন, আমার ইচ্ছাতেই তোমার দ্বারা এমত শ্লোকসৃষ্টি সম্ভব হয়েছে, তখন বাল্মীকি নতমস্তকে ব্রহ্মার সেই আত্মস্তুতি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন, আপন মেধা ও কৃতিত্বের অস্বীকৃতি হজম করে। হজম না-করেই-বা উপায় কী! কার ঘাড়ে কটা মাথা আছে যে, ব্রহ্মাসহ ব্রহ্মাবাদীদের তুচ্ছতাছিল্য করবে? তাঁদের মান্য না-করার ফল যে ভয়ংকর। তার এমন শোচনীয় অবস্থা হবে যে, গাছের লতাপাতা-পাখিপক্ষীরাও কাঁদতে থাকবে। ব্রাহ্মণ্যশক্তির সামান্যতম প্রতিবাদ যাঁরাই করেছেন, তাঁদেরই ঝাড়েবংশে সাফ করে দিয়েছে ব্রাহ্মণ্য-সন্ত্রাস। সেই ব্রাহ্মণ্য-সন্ত্রাসের মর্মন্তুদ কাহিনি রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণগুলির ছত্রে ছত্রে বর্ণিত আছে। যদুবংশের ধ্বংস, মহাপ্রস্থানের পথে পাণ্ডবদের রহস্যমৃত্যু, ধৃতরাষ্ট্র-গান্ধারী-কুন্তীর জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু, কৃষ্ণের নির্জন-মৃত্যু, লক্ষ্মণের আত্মহনন, শাম্বের নির্বাসন সবই ব্রাহ্মণ্য-সন্ত্রাসের নমুনা। ব্রাহ্মণ্যবাদের শর্ত একটাই–কেবলমাত্র বিশ্বাস করো, কৈফিয়ত চেয়ো না, তর্ক করার দুঃসাহস দেখিয়ো না, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করো। অন্যথায় সমূলে বিনাশ।
যাঁরা মনে করেন রামায়ণ একটি কল্পগল্প, বাল্মীকি বলে কেউ কোথাও কোনোদিন ছিলেন না, তাঁদের সঙ্গে আমি একমত নই। বাল্মীকি নিছক কোনো কল্পিত পুরষ নন, তিনি সম্পূর্ণ রক্তমাংসের সাধক মানুষ। বাল্মীকির রামায়ণও কবির মনোজগতের কল্পিত কাহিনি নয়, ব্রহ্মার সুপারিশ ও পৃষ্ঠপোষকতায় রাজা ও ব্রাহ্মণ্যবাদের বাল্মীকির স্তুতি। এমনই হুকুম ছিল।
তাহলে এত তর্ক কেন রামায়ণ আর রামকে নিয়ে? তর্কে অবকাশ তখনই এসে যায়, যখন বিকৃতি আসে। বিকৃতি? হ্যাঁ, বিকৃতি। বাল্মীকিকে সামনে রেখে পরবর্তী কবিরা যথেচ্ছভাবে বিকৃতি করেছেন অনুবাদের ছলনায়। কেউ অনুবাদ করেননি, সকল কবিই নিজের নিজের মনগড়া কাহিনি ফেঁদে বাল্মীকির কাহিনি বলে প্রচার করেছেন। কৃত্তিবাস, তুলসীদাস, রঙ্গনাথন প্রমুখ কবিরা বাল্মীকির রামায়ণে আমূল বিকৃতি করে ফেলেছেন। রামের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর করতে বাল্মীকির রামায়ণের বিকৃতি ঘটিয়েছেন তা নয়, তাঁরা নির্দ্বিধায় বাল্মীকির পরিচিতিকেই কালিমা লেপন করে দিয়েছেন। মহর্ষি মহাকবিকে ঠাঙাড়ে দস্যু, খুনি বানাতে একবারের জন্য কৃত্তিবাসের হাত কাঁপেনি। এ সময় হলে এদের বিরুদ্ধে অনুবাদের নামে তথ্য বিকৃতির অভিযোগ আনা যেত। যাঁরা মূল রামায়ণের বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছেন তাঁরা মহান হলেন কী করে! মিথ্যার আবরণে প্রকত সত্য চিরকালের জন্য চাপা পড়ে গেল, তথাকথিত ধর্মবেত্তা ও বুদ্ধিজীবীরাও মুখ বুজে মেনে নিলেন। কেউ একটা প্রতিবাদ, একটা অভিযোগ করেননি। তাঁরাও গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে দিলেন। আর তার ফলেই যত বিপত্তি, যত বিড়ম্বনা।
এ প্রসঙ্গে বীরেন্দ্র মিত্র লিখেছেন- “ইতিহাস কোনোকালেই অবশ্য অবিকৃত থাকে না। কোনো যুগেই সে যুগের অবিকৃত ইতিহাস রচিত ও প্রাপ্তব্য নয়। তা আগেও হয়নি, আজও হচ্ছে না। কারণ, যখনই যিনি অথবা যে বংশ ক্ষমতায় থাকেন, পুরাণ বা ইতিহাস তখন তাঁর অথবা সেই ক্ষমতাধীশ বংশের গুণকীর্তনকারী মিথ্যাভাষণের বিকৃত স্কুপে পরিণত হয়। যশ-পুরস্কারলোভী বুদ্ধিজীবীরা সেই বিকৃতি ঘটিয়ে নিজেদের আখের গোছান। ক্ষমতাধীশের শত্রুপক্ষ এবং সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রকৃত কীর্তি গায়েব হয়ে যায়, ফলে জাতীয় ইতিহাস সর্বযুগেই গদীনসীনের কীর্তিঘোষক পুরাণে পর্যবসিত হয়।”
মূল সংস্কৃত ভাষায় রচিত রামায়ণটিই বাল্মীকির। যদিও বোর মনে করেন, বাল্মীকির রামায়ণের আগে দশরথজাতক’ নামে বৌদ্ধগ্রন্থটি রচিত হয়েছে। বর্তমানে সংস্কৃত ভাষার যে রামায়ণটির সর্বশেষ সংস্করণ আমরা পাই তা যে আদিরূপে নয়, তা প্রায় সব গবেষকই মেনে নিয়েছেন। রামায়ণ একক কোনো বাল্মীকির রচিত নয়। অসংখ্য কবিদের বিভিন্ন সময়ে সংযোজন-বর্জনের মধ্য দিয়েই আজকের রামায়ণ। তবে ভাবতে অবাক লাগে, প্রায় সমমানের কবি আমাদের দেশে এত ছিল। অনেকে মনে করেন, বাল্মীকি বা নারদ কেউ নয়, রামকথার স্রষ্টা রাম নিজেই। পর্যটক নারদ সেটাই প্রত্যক্ষভাবে জানিয়াছেন, বাল্মীকি তাঁর মুখে শুনতে চাইলেন। মনে হয় বাল্মীকি লোকমুখে যা শুনেছিলেন তা সত্য কি না জানার জন্য (verify) সর্বজ্ঞ যোগী নারদকে জিজ্ঞাসা করলেন। অনেকে বলেন, বাল্মীকি নারদের মুখে রাম কাহিনি প্রথম শুনেছিলেন, সুতরাং বাল্মীকি রাম কাহিনির স্রষ্টা নন। প্রচলিত একটি কাহিনি ইত্যাদি। একথা বোধহয় বলা যায় না। কারণ বাল্মীকি জিজ্ঞাসা করলেন
