“পুরা ভ্রাতঃ পিতা নঃ স মাতরং তে সমুদবহন।
মাতামহে সমাশ্রৌষীদ রাজ্যশুল্কম্ অনুত্তমম্।”
এমনকি বনবাসযাপন পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর তিনি অযোধ্যায় ফিরবেন না একথাও তিনি জানিয়ে দেন। রামের প্রশংসাপূর্বক ভরত বারবার রামকে অযোধ্যায় ফেরার জন্য অনুরোধ করতে থাকেন।
ভরত বিলক্ষণ জানতেন রাম ফিরবেন না। ফিরলে বিনাবাক্যব্যয়ে বিনাদ্বন্দ্বে তিনি অযোধ্যা ত্যাগ করতেন না। তবুও ভরত কোনোরূপ ঝুঁকি নেননি। সত্যিই যদি ভরতের অনুরোধে রাম সত্যিই ফিরে আসেন, সেই অপ্রীতিকর সম্ভাবনা নিকেশ করার জন্য চতুরঙ্গ সৈন্যবাহিনীর আয়োজন। রামের সৌভাগ্য যে রামও অযোধ্যায় ফিরতে চাননি, না-হলে ভরত সেদিনই রামকে চিত্রকুটেই খবর করে দিতেন, অযোধ্যায় আর আসতে হত না। অনুরোধ আর অনুরোধ পর্ব শেষ হলে রামের আজ্ঞানুসারে অযোধ্যায় ফিরে যেতে ও রাজ্যশাসনে সম্মত হলেন এবং রামের পাদুকা প্রার্থনা করলেন। বললেন–
“আপনি পদতল হইতে এই কনকখচিত পাদুকাযুগল উন্মুক্ত করুন, অতঃপর ইহাই লোকের যোগক্ষেম বিধান করিবে।”
রামও ভরতের অনুরোধ রেখে পাদুকাযুগল ভরতকে দিলে ভরত রামকে প্রণাম করে পাদুকা গ্রহণ করলেন এবং বললেন–
“আপনার প্রতীক্ষায় চতুর্দশ বৎসর নগরের বহির্দেশে বাস করিব। পঞ্চদশ বৎসরের প্রথম দিবসে যদি আপনার দর্শন না পাই, তাহা হইলে নিশ্চয়ই আমায় হুতাশনে আত্মসমর্পণ করিতে হইবে।”
এরপর রামের পাদুকাদুটি নিয়ে অযোধ্যায় ফিরে আসেন এবং নির্বিবাদে, নিঃঝঞ্ঝাটে দাবিহীন, নিষ্কণ্টক সিংহাসনে দাদার পাদুকা রেখে দীর্ঘ চোদ্দো বছর রামের নামে রাজত্ব করে গেলেন। তবে দশরথ শাস্তি দিয়েছেন ভরতকে, ত্যাজ্যপুত্র করেছিলেন ভরতকে–“সন্ত্যজামি স্বজঞ্চৈব তব পুত্রং ত্বয়া সহ।” একটাও যুদ্ধটুদ্ধ করতে হয়েছে বলে শুনিনি। দাদার পাদুকা বহন করে রাজত্ব চালানো ছাড়া আর কোনো গুরুত্বই নেই। বিমাতা কৌশল্যাও ভরতকে বিশ্বাস করেননি, সেটা তিনি গোপন রাখেননি–
“জহ্যাদ রাজ্যঞ্চ কোষঞ্চ ভরতো নোপলক্ষ্যতে।… তথাহাত্তমিমং রাজ্যং হৃতসারাং সুরামিবা নাভিমন্তুমলং রামো নষ্টসোমমিধ্বর।”
অর্থাৎ, “রাম যদি বনবাসের পর ফিরে আসেও ভরত তাঁকে রাজ্য, রাজকোশ কিছুই ফেরত দেবে বলে মনে হয় না।… যে মদের সারবস্তু খাওয়া হয়ে গেছে, যে যজ্ঞে সুরা বা মদ (সোমরস) বিনষ্ট হয়ে গেছে, সেইরকম রাজ্য নিয়ে রাম কী করবে? ভরত প্রসঙ্গে সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর রামায়ণের সমালোচনা’ নিবন্ধে লিখেছেন–“অসভ্য মূর্খ ভরত। আপন হাতে রাজ্য পাইয়া ভাইকে ফিরাইয়া দিল। ফলতঃ রামায়ণ অকৰ্ম্মা লোকের ইতিহাসেই পূর্ণ। ইহা গ্রন্থকারের একটি উদ্দেশ্য।”
ভরত এখন কেবল রামের ভাই নয়, তিনি এখন রাজা। ভরত ভাই হলেও রাম তাঁকে বিশ্বাস করতে পারেননি। লক্ষ্মণও বিশ্বাস করেন না। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও চিত্রকুট ছেড়ে দণ্ডকারণ্যের গভীর অরণ্যে চলে গেলেন। কারণ রাম ভেবেছিলেন বাকি দিনগুলিতে চিত্রকুটেই থেকে যাবেন। তাই চিত্রকুট পর্বতেই বাসগৃহ নির্মাণ ও বাস্তুশান্তি করেছিলেন। কিন্তু চোদ্দো বছরের মধ্যে একটিবারের জন্যেও রাম, লক্ষ্মণ, সীতার খোঁজ করেননি ভরত। চোদ্দো বছর পর আরও মাস আটেক অতিক্রান্ত হয়েছিল, তখনও কোনো উৎকণ্ঠা দেখা যায়নি ভরতের মধ্যে। শ্বাপদসংকুল রাক্ষস অধ্যুষিত দণ্ডকারণ্যে থেকে কারোর পক্ষেই ফিরে আসা সম্ভব নয়। ভরতও সেটাই মনে করে নিশ্চিন্তেই ছিলেন। তাই খোঁজখবর নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তা ছাড়া গভীর অরণ্যে প্রবেশের পর নানাবিধ বিপদের মধ্যে পড়লেও রাম বা লক্ষ্মণের একবারের জন্যেও ভরতকে মনে পড়েনি, তাঁর সশস্ত্র সাহায্যও তাঁরা কামনা করিনি৷
ভরত স্বপ্নেও কখনো ভাবতে পারেননি যে, রাম কোনোদিন দণ্ডকারণ্য থেকে ফিরবেন বা ফিরতে পারবেন। ভেবেছিলেন রাক্ষসখোস কিংবা হিংস্র জন্তুর পেটে চলে যাবে। তার উপর রাম নিজের মুখেই বলেছেন, তিনি আর কখনোই অযোধ্যায় ফিরবেন না–“ভরত! পিতা স্বর্গারোহণ করিয়াছেন, এক্ষণে আমি অযোধ্যায় গিয়া কী করিব? …এক্ষণে বনবাস অতিক্রান্ত হইলেও আমি আর সেই নিরাশয় বহুনায়ক অযোধ্যায় যাইব না”। রামের এহেন জবাবে ভরত খুশি হলেন। বলপ্রয়োগ নয়, বলপ্রদর্শনেই কাজ হল। এবার সাপ মরবে, লাঠিও ভাঙবে না। পাদুকা সিংহাসনে রেখে রাজ্যশাসন করলে প্রজারাও ভরতকে ভুল বুঝবেন না, আবার নিজের রাজা হওয়ার স্বপ্নটাও পূরণ হবে। ভরত বিলক্ষণ জানেন, পাদুকা বা খড়ম কখনো রাজ্যশাসন করে না। খড়ম কেবল ভেকমাত্র। আই ওয়াশ! বিচক্ষণ ভরত জানতেন রাজা হয়ে বসে পড়া আর প্রজাদের মনোরঞ্জন করা এক জিনিস নয়। যে রাজ্যের জন্য রামের বনবাস, সেই রাজ্যের দখলি-সত্ত্ব তাঁর নিজের হাতে থাকলে রামভক্ত প্রজাদের মুখের উপর সেই রাজ্য প্রেমানন্দে ভোগ করা মোটেই সম্ভব নয়। তাই এত ফন্দিফিকির!
চোদ্দো বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর নানা ঘাতপ্রতিঘাতে উত্তীর্ণ হয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুর মতো রামও বদলে গেলেন। লঙ্কাকাণ্ড তথা রাবণ বধেরই শেষে রাম যখন বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে অযোধ্যায় ভরতের মুখোমুখি হন ভুত দেখার মতো ভরত অজ্ঞান হয়ে যান। ভরত ভেবেছিলেন রাম হয়তো এবার তাঁকে হত্যা করে অযোধ্যায় সিংহাসনে বসবেন। ভাবাটাও অমূলক নয়। বেগড়বাই করলে রাম অবশ্যই ভারতকে হত্যা করতেন, এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। লঙ্কাযুদ্ধে সবে ব্যাপক হত্যালীলা সাঙ্গ করে এসেছেন। তাঁর হাত দুটো রক্তে লাল হয়েছে। চোখে এখন তাঁর রক্তের নেশা। সিংহাসন ছেড়ে না-দাঁড়ালে ভরত অবশ্যই রামের হাতে হত্যা হয়ে যেতেন। ভরত বিচক্ষণ, দূরদর্শী, পোড়খাওয়া–অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে রামকে রাজ্যভার সব বুঝিয়ে দিলেন। লক্ষ্মণের ছেড়ে দেওয়া যুবরাজের পদটা ভরত পেলেন বটে, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই অযোধ্যা ছেড়ে চলে যেতে হল রাজা রামের আদেশে। রাম বুঝিয়ে দিয়েছেন আরামের দিন শেষ। এবার খুঁটে খাও। রাজ্য মুফতে পাওয়া যায় না, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাজা হওয়া যায় না। রাজা যদি হতে চাও রক্ত ঝরাও, ঘাম ঝরাও। মরো, না-হয় রাজ্যভোগ করো। গন্ধর্বদেশে গিয়ে গন্ধবদের সঙ্গে তুমূল যুদ্ধ করে ভরত নিজের রাজ্য কায়েম করতে হয়েছিল। একবারের জন্যেও তিনি আর অযোধ্যায় ফিরে আসেননি। তবে উত্তরকাণ্ডের শেষ দিকে ভরতকে দেখা গিয়েছিল রামের সঙ্গে সহমরণে যাত্রার সময়। ভরতের দুই পুত্র–তক্ষ ও পুষ্কল। তক্ষ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রাচীন ভারতের শিক্ষার পীঠস্থান তক্ষশিলা, যা ছিল সিন্ধু নদের পূর্বপ্রান্তে। এই তক্ষশিলা দিয়েই ভারতে প্রবেশ করেছিলেন আলেকজান্ডার। পুষ্কল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পুষ্কলাবতী নগর, যা সিন্ধু নদের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। অর্থাৎ ভরতের দুই ছেলে সমগ্র সিন্ধ নগরের সিন্ধু নদের দুই তীরেই নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল। শোনা যায় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক পর্যন্ত এই সাম্রাজ্য টিকে ছিল।
বাল্মীকি : মহাকবি, মহাঋষি এবং আর্যায়নের প্রতিনিধি
মহর্ষি বাল্মীকি চলেছেন আশ্রম ছেড়ে আচমনের পথে, সঙ্গে আছেন যোগ্য শিষ্য ভরদ্বাজ। প্রকৃতি রূপে বিমুগ্ধ হতে হতে বাল্মীকি উচ্চারণ করছিলেন বেদমন্ত্র। হঠাৎ তাঁর পায়ের সামনে লুটিয়ে পড়ে তীরবিদ্ধ রক্তাক্ত এক বিষণ্ণ ক্রৌঞ্চ। আবেশ আর মন্ত্রপাঠে ছন্দপতন ঘটে গেল মহর্ষির। এ দৃশ্যে মহর্ষি বেদনাহত হলেন, বেদমন্ত্রের পরিবর্তে উচ্চারিত মহর্ষির মৌলিক শ্লোক–
