শুধু তাই নয়। নিদ্রাদেবীর কাছে তিনি প্রার্থনা করেন, যাতে এই ১৪ বছর, লক্ষ্মণের সব ঘুম তাঁকে দিয়ে দেন দেবী। এবং বনবাসে গিয়ে অতন্দ্র প্রহরীর হয়ে থাকতে পারেন রামানুজ লক্ষ্মণ। সেই প্রার্থনা মঞ্জুর হয়। রাম লক্ষ্মণ-সীতার বনবাসের ১৪ বছর বা ৫১১০ দিন ঘুমিয়ে ছিলেন ঊর্মিলা। এবং লক্ষ্মণ ছিলেন রাম-সীতার সেবায় নিবেদিত। ৫১১০ দিন লক্ষ্মণের না-ঘুমোনোর ব্যাপারটা না-হয় মেনে নেওয়া গেল গল্পের খাতিরে, কিন্তু না-খেয়ে থাকার ব্যাপারটা! কৃত্তিবাস আর রঙ্গনাথের রামায়ণেই এসব আষাঢ়ে গপ্পো পাওয়া যায়। বাল্মীকির রামায়ণে এসব অবাস্তব গাঁজাখুরি গপ্পো নেই। আসলে বাল্মীকি-পরবর্তী কবিরা আষাঢ়ে গপ্পো ফাঁদতে গিয়ে সব গুলিয়ে ফেলেছেন, মেলাতে পারেননি। অসংলগ্নতার কথা মাথায় রাখেননি। এইসব অর্বাচীন বিদগ্ধ কবিদের কারণেই রামায়ণ আজ বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লক্ষ্মণ প্রসঙ্গে সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘রামায়ণের সমালোচনা’ নিবন্ধে লিখেছেন–
“হিন্দুস্বভাবের জঘন্যতার লক্ষ্মণ আর একটি উদাহরণ। তাহার চরিত্র এরূপে চিত্রিত হইয়াছে যে তদ্বারা লক্ষ্মণকে কর্মক্ষম বোধ হয়। অন্যজাতীয় হইলে সে একজন বড় লোক হইতে পারি, কিন্তু তাহার এক দিনের জন্যও সে দিকে মন যায় নাই। সে কেবল রামের পিছু পিছু বেড়াইল, আপনার উন্নতির কোন চেষ্টা করিল না। ইহা কেবল ভারতবর্ষীয়দিগের স্বভাবসিদ্ধ নিশ্চেষ্টতার ফল।”
লক্ষ্মণ স্পষ্টবক্তা। কাউকে তিনি উচিত কথা বলতে ছাড়েননি। অপ্রিয় হলেও সত্য কথা উচ্চকণ্ঠে বলতে পারতেন। সে রামই হোক কিংবা দশরথ–কেউই বাদ যাননি। হ্যাঁ, রামও বাদ যাননি। যুক্তিবাদী লক্ষ্মণ তাই প্রণম্য। বিমাতা কৈকেয়ীর বর চাওয়ার প্রসঙ্গটি অস্বীকার করে যুক্তিবাদী লক্ষ্মণ বলেছেন–
“যদি বর প্রসঙ্গ সত্য হইত, অভিষেক আরম্ভের পূর্বেই কেন তাহার সূচনা না হইল?”
লক্ষ্মণ বুঝেছিলেন রাম ষড়যন্ত্রের শিকার। এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্য কারিগর আর্যদেবতারাই। তাই তিনি রামকে বলেন–
“আপনি অনায়াসেই দৈবকে প্রত্যাখ্যান করিতে পারেন, তবে কি নিমিত্ত … দৈবের প্রশংসা করিতেছেন। … এই জঘন্য ব্যাপার আমার কিছুতেই সহ্য হইতেছে না। . আপনি যে ধর্মের মর্ম অনুধাবন করিয়া মুগ্ধ হইতেছেন, যাহার প্রভাবে আপনার মতদ্বৈধ উপস্থিত হইয়াছে, আমি সেই ধর্মকেই দ্বেষ করি।”
পিতা দশরথকে বলেছেন, মেনিমুখো’। বলেছেন–বুড়ো বয়সে খোকা হয়েছেন–“পুনর্বাল্যমুপেয়ুষঃ”। বুড়ো বয়সে ভীমরতি হয়েছে–“বিপরীতশ্চ বৃদ্ধশ্চ স্ত্রিয়ো বাক্যবশং গতঃ”। রামের বনবাসযাত্রাকাল চূড়ান্ত হলে দশরথের উদ্দেশেও লক্ষ্মণ বলেছেন–“মহারাজ বৃদ্ধ হইয়াছেন, তিনি বিষয়াসক্ত কামার্ত ও স্ত্রৈণ, সুতরাং স্ত্রীলোকমন্ত্রণায় তিনি কি না বলিবেন।” এখানেই শেষ নয়, ক্রোধী লক্ষ্মণ এ সময় রামের উদ্দেশে বলেছেন–“আর্য, আপনার এই নির্বাসন-সংবাদ না হইতেই আপনি আমার সাহায্যে সমস্ত রাজ্য হস্তগত করুন। … যে ব্যক্তি ভরতের পক্ষে, যে তাহার হিতাভিলাষ করিয়া থাকে, আমি আজ তাহাদের সকলকেই বিনষ্ট করিব। অধিক আর কী কহিব, পিতা কৈকেয়ীর প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহারই উৎসাহে যদি আমাদিগের বিপক্ষতা করেন, তবে তাহাকেও সংহার করিতে হইবে। আপনার ও আমার সহিত শত্রুতা করিয়া অদ্য কেহই ভরতকে রাজ্যদান করিতে পারিবে না।” লক্ষ্মণ পিতার উদ্দেশে বলেছেন–“হনিষ্যে পিতরং বৃদ্ধং কৈকয্যাসক্তমানসম্। কৃপণঞ্চ স্থিতং বাল্যে বৃদ্ধভাবেন গর্হিতম।” অতএব পিতাকে হত্যার করার ব্যাপারে লক্ষ্মণের কোনোরূপ দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না।
শুধু পিতা দশরথ ও দাদা রামকে নয়, বউদি সীতাকেও তুলোধুনো করতে ছাড়েননি লক্ষ্মণ। পঞ্চবটি বনে রামের চিন্তায় উদ্বিগ্ন সীতা যখন লক্ষ্মণকে বারবার অনুরোধ করছিলেন এবং তাঁর প্রতি লোভ এই অপবাদ দেন, তখন লক্ষ্মণ বলেছিলেন–“ধিক্ ত্বা অদ্য বিনশ্যন্তীং যন্মামেবং বিশঙ্কসে। স্ত্রীত্বাদ দুষ্টস্বভাবেন।” অর্থাৎ এইসব সন্দেহ করছ! তবে মরো তুমি। স্ত্রীলোক তো, আর কী হবে! ভরতও বাদ যাননি। চতুরঙ্গ সৈন্যবাহিনি নিয়ে ভরত চিত্রকুটে পৌঁছেলে লক্ষ্মণ গর্জে উঠে রামকে উদ্দেশ্য করে বললেন–“যাহার নিমিত্ত আপনি রাজ্যচ্যুত হইলেন, এক্ষণে সেই শত্ৰু উপস্থিত হইয়াছে। সে আমাদের বধ্য, তাহাকে বধ করিতে আমি কিছুমাত্র দোষ দেখি না। … এক্ষণে আপনি ওই দুষ্টকে বধ করিয়া সমগ্র পৃথিবী শাসন করুন। আর বসুমতী মহাপাপ হইতে বিমুক্ত হউন। … আমি নিশ্চয় কহিতেছি, ভরতকে সসৈন্যে নিহত করিয়া অদ্য শর-কামুকের ঋণ পরিশোধ করিব।”–“ভরতস্য বধে দোষং নাহং পশ্যামি রাঘব”।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে লক্ষ্মণ সবসময়ই মারমুখী। এরপর ঝাড়লেন সুগ্রীবকে। সুগ্রীবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন রাম। শর্ত একে অপরের বউ ফিরিয়ে দেওয়া হবে, উপরন্তু সুগ্রীব পাবে হৃতরাজ্য। সেই সূত্রেই বন্ধুত্ব। সেই শর্তেই রাম অন্যায়ভাবে বালীতে আড়াল থেকে হত্যা করেছিলেন। না-হলে আর্য হয়ে কোনোমতে অনার্যদের সঙ্গে পিতলা করতে যেতেন না। সেই সুগ্রীব কিনা ভাইকে হত্যা করিয়ে ভাইয়ের স্ত্রীকে ভোগদখল করে, নিজ স্ত্রীকে ফিরে পেয়ে, তদুপরি হৃতরাজ্য ফিরে পেয়ে মাসের মাস নিশ্চিন্তে আছেন! রাম ছেড়ে দিলেও লক্ষ্মণ ছাড়বেন কেন! তাঁর তো মাটি দিয়ে গড়া হৃদয় নয়! তিনি যে লৌহহৃদয়ের অধিকারী। বালীবধের পর চার মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, সীতার অনুসন্ধানে তদন্ত একচুলও নড়েনি। রাজ্য ও রমণীভোগে মাতোয়ারা হয়ে আছেন সুগ্রীব। সুগ্রীবের মহামন্ত্রী হনুমানের অনুরোধে সৈন্যসংগ্রহের আদেশ দিয়েই সুগ্রীব তাঁর কাজ শেষ করে অন্তঃপুরে ঢুকে পড়েন। আর কোনো উদ্যোগই তিনি নেননি। উল্কণ্ঠিত রামকে লক্ষ্মণ জানিয়ে দেন, প্রয়োজনে–“সুগ্রীবকে হত্যা করে বালীপুত্র অঙ্গদকে রাজা করে তাঁর সাহায্য নিয়ে জানকীর খোঁজ করব।” বলেছেন–“মিথ্যাবাদীকে বিনাশ করিব। এক্ষণে বালীর পুত্র অঙ্গদ বানরগণকে লইয়া জানকীর অন্বেষণ করুন।” অঙ্গদকে দিয়ে মধ্যস্থতা করার পর যখন সুগ্রীবের হুঁশ আসে না, তখন লক্ষ্মণ নিজেই পৌঁছে যান। সুগ্রীবের অন্তঃপুরে। রক্তচক্ষু লক্ষ্মণ ধনুকের টঙ্কার শুনিয়ে দিলেন সুগ্রীবকে, সেই টঙ্কার শুনে সুগ্রীবের গলা মুখ শুকিয়ে উঠল। লক্ষ্মণকে কামবশে বিবশ করার জন্য নৃত্যরত গণিকা ও পরমাসুন্দরী তারাকে লেলিয়ে দিলেন। কিন্ত লক্ষ্মণকে কামবাণে বিদ্ধ করা অত সহজ কাজ নয়। উলটে লক্ষ্মণ আরও ক্রুব্ধ হলেন। ঘাবড়ে গিয়ে সুগ্রীব জানালেন, আগামী দশদিনের মধ্যেই সৈন্য সংগ্রহের কাজ শেষ যাবে। সৈন্য সংগ্রহই নয়, সৈন্যবাহিনীদের হুশিয়ারিও দিলেন–“একমাস পূর্ণ হইলে আসিও, নচেৎ বধদণ্ড বহিতে হবে।” লক্ষ্মণ তেড়ে না-গেলে অকৃজ্ঞ সুগ্রীব কিছুতেই কর্তব্য পালন করতেন না। শেষপর্যন্ত কর্তব্যে নয়, লক্ষ্মণের নিশিত শরে বিদ্ধ হয়ে মৃত্যুভয়ে রামচন্দ্রকে সাহায্য করেছেন।
