লক্ষ্মণের কাছে রাম ছিলেন একাধারে যেমন পিতার মতো, তেমনই প্রভু-ভাই-বন্ধুও। রামের অনুপস্থিতিতে লক্ষ্মণ সুগ্রীবকে রাম সম্পর্কে বলেছিলেন–“আমি এই কৃতজ্ঞ বহুদর্শী গুণগ্রামে বশীভূত হইয়া, দাসত্ব স্বীকার করিয়া আছি।” আর বলবেন নাই-বা কেন–বনবাসজীবনের একেবারে গোড়ার দিকে এই লক্ষ্মণই যে রামকে নিজের মনের কথা বলে দিয়েছেন–“জল হইতে মৎস্য উদ্ধৃত হইলে যেমন জীবিত থাকিতে পারে না, সেইরূপ আপনার বিয়োগে আমরা ক্ষণকালও প্রাণধারণ করিতে পারিব না। আপনাকে পরিত্যাগ করিয়া পিতা, মাতা, ভ্রাতা ও স্বর্গই-বা কী, কিছুই অভিলাষ করি না।” সেই লক্ষ্মণ অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সময় বদলে যেতে একদণ্ডও সময় নেন না। রামের তীব্র ভাষা শুনে যখন সীতা যখন অপমানিত হচ্ছেন এবং সীতা যখন অগ্নিতে আত্মাহুতি দেবেন বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেন, লক্ষ্মণ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। লক্ষ্মণ রামের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। রোষপূর্ণ চোখে রামের দিকে দৃষ্টিক্ষেপণ করেছেন। লক্ষ্মণ রীতিমতো রামের সিদ্ধান্ত ও আচরণে রামের উপর রুষ্ট হয়েছিলেন। এই কারণে লক্ষ্মণকে চরম শাস্তিও পেতে হয়েছিল। চির অনুগত লক্ষ্মণের সঙ্গে রামের সম্পর্কে গভীর ফাটল দেখাল। এখানেই শেষ হয় না। ছল করে রাজা রাম অযোধ্যা থেকে লক্ষ্মণকে বহিষ্কার করে দেন। এই লক্ষ্মণ বর্জন এবং পরিণতির ঘটনা পূর্বে বিস্তারিত উল্লেখ করেছি। অনিচ্ছাসত্ত্বেও লক্ষ্মণকে দুটি অপ্রীতিকর কাজ করতে হয়েছিল–(১) সীতার অগ্নিপরীক্ষার জন্য চিতা সাজানো এবং (২) সীতাকে একাকী জঙ্গলে রেখে আসা। লক্ষ্মণ জানতেন না কী কারণে সীতাকে জঙ্গলে রেখে আসতে হল, লক্ষ্মণ জানতেন না সীতা আসন্নপ্রসবা। যখন জেনেছেন তখন তিনি হাউহাউ করে কেঁদেছেন। গহীন অরণ্যে সীতাকে রেখে ফিরে আসার সময় বারবার পিছন ফিরে দেখছিলেন–“মুহুর্মুহু পরাবৃত্য দৃষ্টা সীতামনাথবৎ”। শুধু দেখলেনই না, দেখলেন বাল্মীকির আশ্রম পর্যন্ত সীতা নিরাপদে পৌঁছোলেন কি না–“দৃষ্টা, তু মৈথিলীং সীতামাশ্রমে সম্প্রবেশিতা”।
যাই হোক, বনবাসের শেষে রাম অযোধ্যার রাজা হলে লক্ষ্মণ তাঁর মন্ত্রী নিযুক্ত হন। অরণ্যে যত হত্যাকাণ্ড সব লক্ষ্মণের দ্বারাই সাধন হয়েছিল, যা একজন দেহরক্ষীরা কাজ। রামের সামনে লক্ষ্মণই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছেন, এভাবে রামকে সুরক্ষা দিয়েছেন যতদিন পেরেছেন। প্রতিজ্ঞাভঙ্গের অপরাধে রাম তাঁকে পরিত্যাগ করলে, তিনি সরযূ (বালিয়ার কাছে ছেটি-সরযূ নদী গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই সরযূকেই তমসা বলা হত।) নদীর জলে মৃত্যুবরণ করেন। কথিত আছে, লখনউ শহরটি (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের রাজধানী)। লক্ষ্মণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
লক্ষণের দুই ছেলে অঙ্গদ ও চন্দ্রকেতু। প্রথম জন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কারুপদ রাজ্য এবং চন্দ্রকেতু প্রতিষ্ঠা করেন মালব প্রদেশের চন্দ্ৰকান্তি নগর।
ভরত : সুচতুর, সাবধানী, দক্ষ রাজনীতিক
রামচন্দ্রের দ্বিতীয় ভাই ভরত, কৈকেয়ীর সন্তান। দশরথের বৃদ্ধ বয়সের বউ কৈকেয়ী। কবি বলেছেন–
“স বৃদ্ধস্তরুণীং ভার্যাং প্রাণেভ্যোহপি গরীয়সীম”।
ভরত রাজা জনকের ভাই কুশধ্বজের কন্যা মাণ্ডবীকে বিবাহ করেন।
কৃত্তিবাস, তুলসীদাস, রঙ্গনাথন প্রমুখ কবিদের রামায়ণে ভরত যেন সাক্ষাৎ ভ্রাতৃভক্তির পরাকাষ্ঠা। তিনি দাদার খড়ম মাথায় করে এনে ভগ্নহৃদয়ে অযোধ্যায় ফিরেছেন! ফিরে তিনি রাজসিংহাসনে উপবিষ্ট হননি, রাজসিংহাসনে দাদার খড়মজোড়া রেখে রাজ্যশাসন করেছেন। নিজে কখনোই সেই রাজসিংহাসনে উপবিষ্ট হননি। ব্যস, এইটুকুতেই বাজিমাত। এইটুকুতেই ভরতের ভাতৃভক্তির চরম নিদর্শন হয়ে গেছে মানবসমাজে। গোটা রামায়ণে আর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেই ভরতের। একেই বলে সেন্টিমেন্ট, এই সেন্টিমেন্ট বাঙালিকুল সবটাই আত্মস্থ করে নিয়েছে।
বাল্মীকি রামায়ণে কিন্তু ভরতকে এক ভিন্নরূপে পাওয়া যায়। বাল্মীকির রামায়ণে ভরতের কতটুকু ভ্ৰাতৃভক্তি আছে সেটা পাঠকই বিচার করুন। রামচন্দ্রের বিয়ে করার কয়েকদিন পর দশরথ ভরতকে মাতুলালয় কেকয় দেশে পাঠিয়ে দিলেন বায়ো বছরের জন্য। এই দীর্ঘ বারো বছরের একবারের জন্যেও ভরতের মুখদর্শন করেননি দশরথ। এই বারো বছরে অযোধ্যায় তোলপাড় হয়ে গেল, বয়ে গিয়েছে অনেক জল–ভরত কিছুই জানতে পারেনি। মাতা কৈকেয়ী দশরথের কাছ থেকে রামের চোদ্দো বছর বনবাস এবং ভরতের রাজ্যলাভের বর চেয়ে নিলেন। কোনো বরই দশরথ কৈকেয়ীকে না-দিলেও রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা স্বেচ্ছায় চলে গেলেন। দণ্ডকারণ্যে। যেভাবেই হোক, রামের বনবাসের ষষ্ঠদিনে দশরথের মৃত্যু হয়। দশরথ তাঁর জীবদ্দশায় ভরতকে রাজা করার ব্যাপারে কোনোরূপ উদ্যোগ নেননি। কারণ দশরথ কখনোই চাননি ভরত রাজা হোক। তাই কেকয় রাজ্য মাতুলালয় থেকে ভরতকে ফিরিয়ে আনারও কোনো বন্দোবস্ত তিনি করেননি।
দশরথের মৃত্যুর পর তাঁর মৃতদেহ তেলভরতি বড়ো পাত্রে সংরক্ষণের জন্য রাখা হল। কারণ এখনই মৃতদেহ সৎকার সম্ভব নয়। পিতার মৃতদেহ সৎকারের দায়িত্ব যেহেতু পুত্রদের উপর বর্তায়, পুত্ররা যখন কেউই অযোধ্যায় নেই, তখন সংরক্ষণ ছাড়া অন্য উপায় কী! এমতাবস্থায় ঋষি মার্কণ্ডেয়, বামদেব, গৌতম, মৌদগল্য, কাশ্যপ, প্রমুখ ব্রাহ্মণেরা বৈশিষ্ঠকে পৌরহিত্য করে এক জরুরি বৈঠকে বসলেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন ভরতকে রাজপদে নিযুক্ত করা হবে। দশরথের অবর্তমানে ভরতকে রাজা করতে দৃঢ়সংকল্প বশিষ্ঠই। বশিষ্ঠের নির্দেশে ভরতকে অযোধ্যায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা হল। ভরত অযোধ্যায় ফিরে এসে অনুভব করে পরিস্থিতি সুবিধার নয়, চারদিক থমথমে ভাব। কেউ তাঁকে সম্ভাষণ জানাচ্ছেন না। কিন্তু কেন এমন মরা-বাড়ি হয়ে আছে। অযোধ্যাপুরী! ভরত কিছুই জানে না, কিছুই জানানো হয়নি তাঁকে। অযোধ্যায় আসার অনেক পর ভরতকে পিতার মৃত্যুসংবাদ দেওয়া হয়। তাঁকে রাজা করার বন্দোবস্ত হচ্ছে বুঝতে পেরে বললেন–“আমি রাজ্য কামনা করি না এবং গ্রহণার্থ জননীকেও প্রেরণ করি নাই।”
