(১) রামচন্দ্র দলবল নিয়ে লঙ্কায় রাবণকে হত্যা করতে আসছেন, সে খবর রাবণের গুপ্তচরেরা জানাতে পারেননি।
(২) টানা পাঁচদিন ধরে সমুদ্রের উপর শত্রুপক্ষ বিনাবাধায় একটা আস্ত সেতু গড়ে ফেলল, সে খবর রাবণের গুপ্তচরেরা জানতে পারলেন না?
(৩) তীব্র শাব্দিক বিমান নিয়ে সমুদ্র পেরিয়ে মহাবীর হনুমান লঙ্কায় ঢুকে পড়ল, অশোকবনে ঘুরল, সীতার সঙ্গে দেখা করল–এত কাণ্ড হয়ে গেল, অথচ রাবণের গুপ্তচর কিছুই জানাতে পারল না। (৪) রামের নির্দেশে বানরসেনারা দলে দলে লঙ্কায় ঢুকে ঘরে ঘরে আগুনে দিয়ে আবালবৃদ্ধ পুড়িয়ে দিল, সেই খবরও রাবণের গুপ্তচরের কাছে ছিল না? গুপ্তচরেরা কি সব বিভীষণের পক্ষে চলে গিয়েছিল? তাই যদি হয়, তাহলে রাবণের পরাজয় কে ঠেকাবে?
লক্ষ্মণ : কর্তব্যনিষ্ঠ, ক্রোধী, বলশালী, অকুতোভয় এবং স্পষ্টবক্তা
লক্ষ্মণ রামের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। অযোধ্যার রাজা দশরথের কনিষ্ঠা মহিষী সুমিত্রার দুই যমজ পুত্র হলেন লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন। মূল রামায়ণে লক্ষ্মণের মাতা সুমিত্রার কোনো পিতৃপরিচয় উল্লেখ করেননি কবি। কিন্তু মহাকবি কালিদাস বলেছেন সুমিত্রা মগধের মেয়ে। আবার কৃত্তিবাস বলেছেন সিংহলে সুমিত্রার বাপের বাড়ি।
লক্ষ্মণ রামের অত্যন্ত অনুগত ছিলেন। বিশ্বামিত্র রাক্ষসবধের জন্য রামকে আমন্ত্রণ জানালে লক্ষ্মণ তাঁর সঙ্গী হন। পরবর্তীকালে তিনি রামকে পিতার আদেশের বিরুদ্ধে বনগমনে না-যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু রাম বনবাসে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকলে, লক্ষ্মণও তাঁর সঙ্গে বনে যান। বনবাসকালে তিনি একাধারে রামের ভাই, বন্ধু ও সহায়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন। লঙ্কার যুদ্ধে তিনি রাবণের পুত্র মেঘনাদ সহ আর অনেক বীরপুরুষদের হত্যা করেছিলেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র ষষ্ঠ সর্গে বলেছেন, লক্ষ্মণের হাতে অন্যায় যুদ্ধে মৃত্যু ঘটে অসমসাহসী বীর মেঘনাদের। মায়াদেবীর আনুকূল্যে এবং রাবণের অনুজ বিভীষণের সহায়তায়, লক্ষ্মণ শত শত প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশে সমর্থ হয়। কপট লক্ষ্মণ নিরস্ত্র মেঘনাদের কাছে যুদ্ধ প্রার্থনা করলে মেঘনাদ বিস্ময় প্রকাশ করে। শত শত প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণের অনুপ্রবেশ যে মায়াবলে সম্পন্ন হয়েছে, বুঝতে বিলম্ব ঘটে না তার। ইতোমধ্যে লক্ষ্মণ তলোয়ার কোশমুক্ত করলে মেঘনাদ যুদ্ধসাজ গ্রহণের জন্য সময় প্রার্থনা করে লক্ষ্মণের কাছে। কিন্তু লক্ষ্মণ তাকে সময় এবং সুযোগ না দিয়ে আক্রমণ করে। লক্ষ্মণের মেঘনাদবধ প্রসঙ্গে অন্য কবিরা ‘তস্কর’ কাপুরুষ’ শিরোপা দিলেও, বাল্মীকির রামায়ণে এর কোনো সমর্থন পাওয়া যায় না। বাল্মীকির রামায়ণে লক্ষ্মণ রীতিমতো বীরত্ব প্রদর্শন করে মেঘনাদ সহ অসংখ্য বীরপুরুষদের হত্যা করেছেন বাহুবলেই এবং রণক্ষেত্রেই। অর্থাৎ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণ নিরস্ত্র অসহায় মেঘনাদকে চোরের মতো হত্যা করেছেন, একথা সত্য নয়–এটা কাহিনি কষ্টকল্পনা। লক্ষ্মণ মেঘনাদকে হত্যা করেছেন বানরসৈন্য ও রাক্ষসসৈন্যের সঙ্গে সংগ্রামে এক দ্বৈত শরযুদ্ধে।
মেঘনাদের এমন বর ছিল যে, যে ব্যক্তি ১৪ বছর না খেয়ে, না ঘুমিয়ে ব্রহ্মচর্য পালন করবেন তিনি শুধু মেঘনাদকে বধ করতে পারবেন। বনবাসের সময় ১৪ বছর শ্রীরামের ভ্রাতা লক্ষণ এই মহা কঠিন কার্য ও শক্তি অর্জন করেন। লক্ষ্মণ ১৪ বছর না খেয়ে না ঘুমিয়ে ছিলেন কোন্ দুঃখে! অরণ্যে প্রবেশের পর লক্ষ্মণ জানতেন বউদি সীতাকে রাবণ অপহরণ করবেন? যদি জানতেন তবে কেন সীতাকে একা অরক্ষিত রেখে রামের আর্ত চীৎকার শুনে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করলেন? ‘লক্ষ্মণের গণ্ডি’ একটি পরিকল্পিত প্রক্ষিপ্ত, মনগড়া। বাল্মীকির রামায়ণে এমন ঘটনার উল্লেখ নেই। নারীর স্বাধীনতা এবং সীমাবদ্ধতাকে নির্দিষ্ট করে দিতেই পুরুষতান্ত্রিক সংযোজন।
সীতাকে অপহরণের ফলে তাঁকে লঙ্কায় যেতে হবে এবং মেঘনাদকে হত্যা করতে হবে জানতেন? রামের ১৪ বনবাস হলে তাঁর সঙ্গে লক্ষ্মণের বেরিয়ে আসাটা কি সেই কারণে? কোথায়, এমন আভাস তো বাল্মীকি সহ অন্য কবিরা রামায়ণে দেননি! মেঘনাদকে হত্যা করতেই যদি ১৪ বছর না-খেয়ে না-ঘুমিয়ে থাকতে হয়, তাহলে এত ছলনা আর চালাকির কী ছিল? মেঘনাদের মৃত্যু যখন ১৪ বছর না-খেয়ে না-ঘুমিয়ে থাকা ব্যক্তির। হাতেই নিশ্চিত, তবে কেন কাপুরুষের মতো নিরস্ত্র মেঘনাদকে না-মেরে সশস্ত্র মেঘনাদকে বীরের মতো লক্ষ্মণ হত্যা করেননি। এর আগে তিন তিনবার মেঘনাদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করে লক্ষ্মণ পরাজিতও হয়েছিল, লক্ষ্মণ জয়ী হল তখনই যখন মেঘনাদ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়, সমরসজ্জায় সজ্জিত নয়। তাছাড়া ১৪ বছর না-খেয়ে না-ঘুমিয়ে লক্ষ্মণ কী করতেন? দাদা-বউদিকে পাহারা দিতেন? ভাই না-খেয়ে না-ঘুমিয়ে থাকতেন, আর দাদা বউদি স্বার্থপরের মতো নিশ্চিন্তে ঘুমোতেন কীভাবে? অভুক্ত ভাইয়ের সামনে মুখে কীভাবে খাবার তুলতেন তাঁরা? উত্তর নেই।
লক্ষ্মণের স্ত্রী ঊর্মিলা ছিলেন মিথিলারাজ জনক এবং রানি সুনয়নার মেয়ে, অর্থাৎ সীতার বোন। লক্ষ্মণ জানান, রামের ১৪ বছর বনবাসের কথা। এবং এও জানান তিনিও রাম সীতার সঙ্গে বনবাসে যাবেন। ঊর্মিলা যখন লক্ষ্মণের কাছ থেকে রামের ১৪ বছর বনবাসের কথা জানতে পারেন এবং এও জানতে পরেন যে তিনিও রাম ও সীতার সঙ্গে বনবাসে যাবেন। তখন এই কথা শুনে নিজের মনকে যতটা সম্ভব শান্ত রাখেন ঊর্মিলা। অবিচলিত থাকেন স্বামীর সামনে। জানিয়ে দেন, তাঁরও উচিত স্বামী লক্ষ্মণের পথ অনুসরণ করা। কিন্তু তিনি তা করবেন না। কারণ তিনি গেলে লক্ষ্মণ সেভাবে মন দিয়ে রাম-সীতার সেবা করতে পারবেন না। লক্ষ্মণ যাতে দাদা-বৌদির সেবা করতে পারেন, সেজন্য স্ত্রী ঊর্মিলা অযোধ্যাতেই থেকে যান।
