(৩) ভ্রান্ত রণনীতি : রামশিবিরে যখন দুর্ধর্ষ দেবসেনাপতি ইন্দ্র সহ সমগ্র দেবসেনা, দক্ষ বীর লক্ষ্মণ, ধুরন্ধর বীর সুগ্রীব, মহাশক্তিশালী হনুমান, দুর্ধর্ষ অঙ্গদ, বীর চিকিৎসক জাম্ববান, যুদ্ধ বিশারদ অগস্ত্য, পরম সহযোগী ‘ঘরশত্রু বিভীষণ, বীর নীল ও অসংখ্য বীর এবং আত্মনিয়জিত বানরসেনা চারদিক ঘিরে একযোগে যুদ্ধ করছেন–সেখানে রাবণ যুদ্ধক্ষেত্রে একজন করে বীর সেনাপতিদের পাঠাচ্ছেন মিত্রপক্ষের মোকাবিলা করতে! কখনো ইন্দ্রজিতের মতো মহাবীর একা যুদ্ধ করতে আসছেন, কখনো কুম্ভকর্ণের মতো মহাবীর একা যুদ্ধ করতে আসছেন, কখনো অকম্পনের মতো মহাবীর একা যুদ্ধক্ষেত্রে আসছেন–এটা ক্রিকেট খেলা নাকি? একজন করে ব্যাটসম্যান আসছেন, রান করছেন আর বোল্ড আউট হচ্ছেন। অথচ মিত্রপক্ষ রামশিবির ফুটবল টিম নিয়ে মাঠে নেমেছেন আর চারদিক ঘিরে খেলছেন। যদি ইন্দ্রজিৎ, অকম্পন, প্রহস্ত, বজ্রদংষ্ট, কুম্ভকর্ণ, নান্তক, ত্রিশিরা, মহাপার্শ্ব, অতিকায়, বিরূপাক্ষ, মহোদরের দুর্ধর্ষ মহাবীরেরা একযোগে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতেন, তাহলে রামশিবিরের বীরসেনারা পালানোর পথ খুঁজে পেতেন না। এমনিতেই অক্ষশক্তির এক বীরের দাপটেই রামশিবিরের অবস্থা বহুবার ল্যাজেগোবরে হয়েছেন–ইন্দ্রজিতের বাণ ও নাগপাশে রাম-লক্ষ্মণের দুই দুইবার মৃতপ্রায় অবস্থা হয়েছিল। রামশিবিরের যুদ্ধক্ষেত্র প্রায় শ্মশান করে দিয়েছিলেন ইন্দ্রজিৎ। কুম্ভকর্ণের অস্ত্রাঘাতে বিশ্রীভাবে আহত হয়েছিলে হনুমান, এমনকি রাবণের অস্ত্রাঘাতেও হনুমান জ্ঞান হারিয়েছিলেন। কুম্ভকর্ণের আঘাতে অঙ্গদ জ্ঞান হারান ও সুগ্রীব বন্দি হন। যুদ্ধনীতিতে ভুল থাকলে পরিকল্পনাহীন সেই যুদ্ধে জয় অসম্ভব।
(৪) বিদ্রোহ দমনে অক্ষমতা : রাবণের সাধের রাজপরিবারের অন্দরমহলে রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্রোহ, সেই বিদ্রোহের নাটের গুরু জ্ঞাতিদ্রোহী বিভীষণ। এত কাণ্ড, তবুও রাবণ টের পাননি। সেই বিদ্রোহ দমন করতে সচেষ্ট হননি তিনি। নিজের বোন শূর্পণখা তাঁকে ও তাঁর রাজ্য ধ্বংস করতে রামশিবিরের আর্যদেবতাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন, সে ব্যাপারেও লঙ্কেশ্বর উদাসীন। রাজার এই উদাসীনতা পরাজয়ের জন্য যথেষ্ট।
(৫) বিশ্বাসঘাতকদের শাস্তি না-দেওয়া; জ্ঞাতিদ্রোহী বিশ্বাসঘাতক বিভীষণের মতো কালসাপকে দুধকলা দিয়ে পুষেছিলেন তিনি। যাঁর বুকে বসেছিলেন তিনি তাঁরই বুকে বসে তাঁরই শিলনোড়া দিয়ে তাঁরই দাঁতের গোড়া ভেঙেছেন। লঙ্কায় বসে লঙ্কার রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রচনা করছেন। রাজার অপশাসনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নয়, সিংহাসন আর মন্দোদরীকে ভোগ করার লোভেই রামের পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন বিভীষণ। একথা রামশিবিরে যোগ দিয়ে রামকে খোলাখুলিই বলেছেন বিভীষণ। কোনো ঢাককাক গুড়গুড় ছিল না। সেই শর্তেই তিনি রামকে বলেছিলেন–
“আমি রাক্ষস বধ ও লঙ্কাপরাভব বিষয়ে যথাশক্তি তোমায় সাহায্য করিব এবং রাবণের প্রতিদ্বন্দ্বী হইব।”
বিভীষণও রামভক্ত নন, ক্ষমতাভক্ত। ইন্দ্রজিতের সঙ্গে দ্বিতীয় দিনের যুদ্ধে রাম-লক্ষণ মৃতপ্রায় হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে ইন্দ্রজিতের মতো বিভীষণ ভেবেছিলেন রাম-লক্ষ্মণ মারা গেছেন। এই ভেবে বিভীষণ মরাকান্না জুড়ে দিলেন–
“হায়, আমি যাঁহাদের বাহুবলে রাজ্যপদ কামনা করিয়াছিলাম, এক্ষণে তাঁহারাই মৃত্যুর জন্য শয়ান। বলিতে কি আজ আমার জীবনমৃত্যু, রাজ্যকামনা দূর হইল এবং পরমশত্রু রাবণেরও জানকীর অপরিহার সংকল্প পূর্ণ হইল।”
শুধু বিভীষণই নয়, রাবণের জন্মশত্রু ছিল নিজের ভাই কুবের। এই কুবেরই ছিলেন একদা লঙ্কার শাসনকর্তা। রাবণের সঙ্গে হেরে গিয়ে আর্যদেবতাদের দলে যোগ দিয়ে ‘লোকপাল’ পদে নিযুক্ত হন। আর্যদেবতারা এই কুবেরের মাধ্যমেই লঙ্কার অলিগলি জেনেছেন। কুবেরের থেকে রাবণের যথেষ্ট সাবধান থাকা উচিত ছিল। কথায় বলে আহত সাপ বাঁচিয়ে রাখা উচিত নয়।
রাবণের সভায় বসে বিভীষণ শত্রুপক্ষের হয়ে ঢাক পেটাতে থাকলে রাবণ ভর্ৎসনা করেন–“রে কুলকলঙ্ক! তোরে ধিক্! যদি অন্য কেহ এইরূপ কহিত, তবে তদ্দণ্ডেই তাহার মস্তক দ্বিখণ্ড করিতাম।” ‘অন্য কেহ’ নয়, নিজের ভাই। ক্ষমাশীল দাদা রাবণ, হত্যা না-করে সামান্য তিরস্কার করে ছেড়ে দিলেন। ঘাড় ধাক্কা খেয়ে কালসাপ বিভীষণ সোজা শত্রুশিবিরে যোগ দিলেন। ভাইয়ের প্রতি স্নেহবশত বিশ্বাসঘাতককে মৃত্যুদণ্ড দিলেন না। তাঁকে দেশত্যাগ করার সুযোগ দিয়ে দিলেন। রাবণ একবারের জন্যেও খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না যে, বিভীষণ দীর্ঘদিন ধরে লঙ্কার কোথায় কোথায় ছিদ্র করে রেখে গেছেন। লঙ্কেশ্বর রাবণ যদি এহেন রাজদ্রোহীর মৃত্যুদণ্ড দিতেন, তাহলে মাশুল অনেক কম গুনতে হত রাবণকে। বালীর মতো ভুল রাবণও করলেন। তাঁকে হত্যা করার জন্য গোকুলে যিনি বাড়ছেন, তাঁকে চিহ্নিত করে নিকেশ করতে পারলেন না রাবণ। চরম মূল্য দিতে হল।
(৬) গুপ্তচরের অপদার্থতা : বিশ্বস্ত গুপ্তচর কি রাবণের ছিল না? থাকলে কী করছিলেন তাঁরা? বিভীষণ কি সব গুপ্তচরকেই নিজের পক্ষে টেনে নিয়েছিলেন? নাকি শূর্পণখার মতো রাবণের গুপ্তচরগুলিও রামবাহিনী কবজা করে নিয়েছেন?
