দ্বিতীয় ঘটনা আফগানিস্তান। ওসামা বিন লাদেনকে খোঁজার বাহানায় আফগানিস্তান আক্রমণ করল আমেরিকা। আক্রমণ করার আগে আমেরিকা ঘোষণা করে বসল–“সন্ত্রাসবাদ দমনে কারা আমেরিকার সঙ্গে আছেন বলুন। যারা আমেরিকার সঙ্গে থাকবেন তাঁরা সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের পক্ষে, যাঁরা আমেরিকার সঙ্গে থাকবেন না, তাঁরা সন্ত্রাসবাদীর সমর্থক। সার্বিক সমর্থন নিয়ে আমেরিকা ঝাঁপিয়ে পড়ল আফগানিস্তানের উপর। তছনছ করে দিল আফগানিস্তান ভূখণ্ড। লাদেন কোথায়! আমেরিকার উদ্দেশ্য সফল হল, আফগানিস্তানের তালিবান সরকারকে ফেলে দিয়ে আমেরিকার তাবেদার সরকার বসিয়ে দিল। দীর্ঘ ১৩ বছর যাবৎ আফগানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে গেল ন্যাটো বাহিনী। আফগান যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হলেও দেশটিতে ১৩,৫০০ ন্যাটো সেনা অবস্থান করবে বলে আমেরিকার তরফ থেকে জানানো হল, যার মধ্যে থাকবে ১১,০০০ মার্কিন সেনা। তাঁরা কেবল প্রশিক্ষণের কাজ করবে বলে জানানো হয়েছে। মার্কিন সেনারা ২০০১ সালে আফগানিস্তান থেকে তালিবান ও আল-কায়দা গোষ্ঠীসহ সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের দোহাই দিয়ে দেশটি দখল করে নেয়। আসলে ওয়াশিংটন সন্ত্রাস দমনের জন্য আফগানিস্তানে সেনা পাঠায়নি, বরং সন্ত্রাস দমনের অজুহাতে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই দেশটিকে নিজের সামরিক ও গোয়েন্দা ঘাঁটিতে পরিণত করতে চেয়েছে। ২০১১ সালের মে ২ তারিখে দিবাগত রাতে পাকিস্তানের আবোটাবাদ শহরে মার্কিন কমান্ডোদের হামলায় (অপারেশন জেরোনিমো) ওসামা বিন লাদেন নিহত হন। তার জন্য পাকিস্তান ভূখণ্ডকে তছনছ করতে হয়নি। আমেরিকা নিজেদেরকে ‘বিশ্বের ত্রাতা’ ভাবতে এবং ভাবাতে শুরু করে দিলেন।
রাবণের পূনর্মূল্যায়নের সুযোগ হয়নি। তাই রাবণের ভাবমূর্তিকে যেভাবে ভাবানো হল, সেভাবেই রয়ে গেল। রামও নিছক সীতাকে পাওয়ার জন্য রাবণের সঙ্গে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ করেননি। সীতার খোঁজ যে বাহানামাত্র, তা রাম নিজের মুখেই স্বীকার করেছেন। সীতাকে ফিরিয়ে দিলেও যুদ্ধটা হতই। আর অহংকার? দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রায় অপরাজেয় রাজা, যাঁর সঙ্গে স্বয়ং ব্রহ্মা আর শিবের মদত রয়েছে, তাঁর অহংকার থাকবে না তো কার থাকবে! এখন প্রশ্ন হল রাম কেন রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন? উদ্দেশ্য স্পষ্ট : উত্তরভারত থেকে সুদূর। দক্ষিণ ভারতের শেষ সীমা পর্যন্ত আর্যসভ্যতার আধিপত্য বিস্তার।
এখন প্রশ্ন করা যেতেই পারে–লঙ্কাযুদ্ধে রাবণের পতনের কারণ কী? রাবণে বিরুদ্ধে আর্যদেবতা ও ব্রাহ্মণদের অভিযোগ–তিনি ধর্ষক, তিনি নারী লোভী, তিনি অন্যের রাজ্য আক্রমণ করেন এবং রাজাদের হত্যা অথবা বন্দি করেন, তিনি স্বর্গের দখল নিতে চান, তিনি নারীকে রক্ষিতা (হারেম) করেন ইত্যাদি। এগুলি অভিযোগ, না অজুহাত? এগুলি যদি রাবণের অপরাধ হয়, তাহলে বলব প্রাচীন যুগ থেকে মধ্যযুগের শেষদিক পর্যন্ত প্রায় সব রাজা তো এরকমই ছিল। শত্রুরাজ্যের নারী হরণ করা, নারী ধর্ষণ করা, শত্রুরাজাকে হত্যা বা বন্দি করা এ তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। প্রাচীন যুগে এক গোষ্ঠীর সঙ্গে অন্য গোষ্ঠীর সংঘর্ষে যে গোষ্ঠী। পরাজিত হত, তাঁদের সম্পত্তি দখল করা হত এবং তাঁদের দাস হিসাবে ব্যবহার করা হত, এমনকি নারীও বিজয়ীর অধিকারে চলে যেত। রাবণ ব্যতিক্রম কী করল? আসলে তোকে আমি মারবই, তুই জল ঘোলা করিসনি তো তোর বাপে করেছে, নাহলে তাঁর তাঁর বাপে জল ঘোলা করেছে। উদ্দেশ্য যখন দাক্ষিণাত্যে আর্য উপনিবেশন, তখন প্রতিপক্ষের দোষ মাপা না-মাপায় কী যায় আসে। রাবণের কিছু ত্রুটি ছিল তো অবশ্যই, তাই তাঁর পরাজয় হল। প্রাচীনকালে রাজায় রাজায় সম্মুখ সমর হত। একপক্ষের হয় মৃত্যু হত, অথবা বন্দি হয়ে দাসত্ব মেনে নিতে হত। তা ছাড়া রাবণের অপরাধ তো বিরল থেকে বিরলতম অপরাধ’ নয় যে, তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে! রাজার পরাজয় তখনই হয়, যখন রাজা একের এক ভুল করে যায়। আর সেই ভুলের মাশুল গুনতে হয় রাজাকেই। রাবণের পরাজয় রাম ও রামশিবিরের দৈবশক্তি নয়, রাবণের পরাজয়ের জন্য দায়ী রাবণের অবিমৃষ্যকারিতা। পতনের কারণগুলি এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক–
(১) চারিত্রিক ত্রুটি : রাবণ অহংকারী, চরম আত্মবিশ্বাসী এবং ঔদ্ধত্য। অহংকার থেকে জন্ম নেয় চরম আত্মবিশ্বাস এবং চরম আত্মবিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় ঔদ্ধত্য। ঔদ্ধত্যই চেতনা লুপ্ত করে, বুদ্ধিনাশ করে। গঠনমূলক পরিকল্পনা করতে ব্যর্থ হন।
(২) মিত্রহীন : লঙ্কেশ্বর রাবণ একা। যুদ্ধের জন্য তিনি অক্ষশক্তি তৈরি করেননি বা করতে পারেননি। মিত্রশক্তি রামচন্দ্র যখন আর্যদেবতা ও তাঁর দেবসেনাবাহিনী, অগস্ত্যের মতো যুদ্ধবিশারদ, কিষ্কিন্ধ্যার রাজা সুগ্রীব ও তাঁর পরাক্রমী সেনাবাহিনী, বিভীষণের মতো বিশ্বাসাতক, শূর্পণখার মতো ঘরশত্রু গুপ্তচর–তখন রাবণ একক শক্তি। আর কোনো রাজা বা শক্তিকে একত্রিত করতে পারেননি তিনি। নিজেকে সর্বশক্তিমান ভেবে ফেলার এটাই ফল। রাম কিন্তু নিজেকে কখনোই সর্বশক্তিমান ভাবেননি, আর ভাবেননি বলেই যেখানে যত শক্তি আছে যথাসম্ভব সংগ্রহ করে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছেন। তাই এ যুদ্ধ অসম হয়েছে। হারও অনিবার্য।
