“রাক্ষসাং গতসত্ত্বানুমেষ ধৰ্ম্ম সনাতনঃ।
অবটে যে নিধীয়ন্তে তেষাং লোকাঃ সনাতনাঃ।”
ভূগর্ভে যাঁদের দেহ প্রোথিত হয়, তাঁদের নিত্যলোক প্রাপ্তি হয়, গতপ্রাণ রাক্ষসদের (অনার্যদের) এটাই চিরন্তন ধর্ম।
স্বদেশ ও প্রজাদের রক্ষার স্বার্থে তাঁর শক্তি নিয়োজিত। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে রাবণ রামকে বলেছিলেন–একজন শাসকের কীভাবে চললে সফল ও প্রাণবন্ত অবস্থায় থাকা সম্ভব। রাবণকে মূল্যায়ণ করতে হলে মনে রাখতে হবে পৃথিবীর সব রাজা-মহারাজা-মুখ্যমন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী নিজের দাপট দেখাতে পছন্দ করেন। বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খাওয়াতে না-পারলে কীসের রাজা! শুধু রাবণই নয়–রাম, ভরত, কৌরবগণ, পাণ্ডবগণ, সগররাজা প্রত্যেকেই তাঁদের সর্বোচ্চ দাপট দেখাতে কার্পণ্য করেননি।
রাবণকে নিয়ে লেখা শেষ করার আগে তাঁর সম্বন্ধে আরও দু-চারটা কথা না-লিখলেই নয়। প্রক্ষিপ্ত কবিরা সহ অন্যান্য রামায়ণের কবিরাও তাঁকে একজন ভয়ংকরতম অত্যাচারী শাসক সাব্যস্ত করে দিলেন। সীতা তথা নারীহরণ নতুন কিছু তো নয়! তখনকার সময়ে রাবণ কেন, প্রায় সমস্ত রাজরাজারা ও দেবপ্রধানরা নারীহরণ ও পরনারী ভোগ করাটা বীরত্ব বলেই গণ্য করা হত। সেইসব রাজাদের স্ত্রীরাও এইসব ব্যাপার ধর্তব্যের মধ্যেই রাখতেন না। দেবরাজ ইন্দ্রের তো প্রচুর সুনাম নারীহরণ আর নারীভোগের ব্যাপারে। ইন্দ্র পদাধিকারী ব্যক্তিরা বারবার সুযোগ পেলেই পরনারী ভোগ করছেন। ব্রাহ্মণ-নেতারাও পরস্ত্রী ভোগে পিছপা হননি। রাজারা নারীর অধিকারের জন্য যুদ্ধ বাধিয়ে নিরপরাধ লক্ষ লক্ষ প্রজার মৃত্যু এবং সর্বনাশের কারণ সৃষ্টি করেছেন। এরকম দাপট নবাবী আমল পর্যন্ত চলেছিল। অতএব সীতাকে লঙ্কায় টেনে নিয়ে গিয়ে রাবণ বিরাট পাপকর্ম করেছেন এমন কথা বলা কতটা যুক্তিসংগত, তা ভেবে দেখার দরকার। তা ছাড়া রামায়ণের যুগে সারা পৃথিবীতে তো শুধু রাবণ বাস করতেন না। একমাত্র রাবণই কি ভয়ানক পাপী ছিলেন? সে সময়ে অন্য রাজারা কি সাধুপুরুষ ছিলেন? তাঁদেরও হত্যা না-করে শুধু রাবণে হত্যা করেই রাম ক্ষান্ত হলেন কেন? উদ্দেশ্য কি দুষ্টের দমন, নাকি যেনতেনপ্রকারেণ অনার্য ও প্রতিপক্ষদের নির্বংশ করে আর্যসম্প্রসারণের জন্য। উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত দখল নেওয়া?
তাই সব অপরাধ বিজেতারাই করেন, সব অন্যায় বিজেতাই করে থাকেন। তাই প্রাজ্ঞ রাবণ বিশ্বধর্ষক, বিশ্বখুনি, বিশ্ব-অত্যাচারী। অপরদিকে জয়ী নিষ্পাপ, আর্তের ত্রাতা। জয়ীর পক্ষে সব সমর্থন। না-হলে দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন দেখানো যাবে কী করে! এ নতুন কিছু নয়। যুগে যুগে এটাই হয়ে আসছে। কোথাও অন্যথা হয়নি। আসুন, ঠিক এরকমই দুটি সাম্প্রতিককালের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখি। প্রথমটি ইরাকের শাসক সাদ্দাম হোসেইন। “খুব খারাপ মানুষ সাদ্দাম’–এরকমই প্রচার হয়ে গেল বিশ্বজুড়ে। বিশ্বের জনসমর্থন আদায়ের জন্য বুঝিয়ে দেওয়া হল–ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম ১৯৯১ সালের চুক্তি অমান্য করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণ করছে এবং তাঁদের কাছে এ ধরনের অস্ত্রের মজুতও আছে। তখন সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছিল, ইরাক যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলির জন্য বড় ধরনের হুমকি। আগ্রাসনের পরে পরিদর্শকরা ইরাকে গিয়ে কোনো ধরনের গণবিধ্বংসী অস্ত্র খুঁজে পায়নি। তাঁরা জানায়, ইরাক ১৯৯১ সালেই গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণ ত্যাগ করেছে, ইরাকের উপর থেকে আন্তর্জাতিক অনুমোদন সরিয়ে নেওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁদের নতুন করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণের কোনো পরিকল্পনাও ছিল না। কোনো কোনো মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেন যে, সাদ্দাম হোসেন আল-কায়েদাকে সহযোগিতা করছেন, কিন্তু এর পক্ষেও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি৷ কুয়েত এবং ইরাকের তেল অবৈধভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে আমেরিকা সাদ্দাম হোসেইনের বিরুদ্ধে নোংরা ষড়যন্ত্র করে। মিথ্যা আরোপ করা হয় হোসেইন বায়ো-কেমিক্যাল অস্ত্র মজুত রেখেছে। কিন্তু ইরাক দেশ পুরো ছারখার হয়ে যাওয়ার পরও সেই রকম কোনো অস্ত্র পাওয়া যায়নি।
সাদ্দাম গ্রেফতার হলেন, গ্রেফতার করল আমেরিকা। আন্তর্জাতিক আদালতে সাদ্দামের ফাঁসির হুকুম শোনানো হয়। প্রকৃত সত্য হল সাদ্দাম মোটেই নিষ্ঠুর ছিলেন না। ফাঁসির রায় ঘোষণার পর জীবনের শেষ দিনগুলিতে তাঁকে পাহারা দিয়েছিলেন ১২ জন মার্কিন সেনা। এই ১২ জন সাদ্দামের শেষ সময়ের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। আক্ষরিক অর্থেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁরাই ছিলেন সাদ্দামের সঙ্গী। তাঁদেরই একজন উইল বার্ডেনওয়ার্পার। উইল বার্ডেনওয়ার্পার তাঁর “The Prisoner in is Palace, his American guards and what history left unsaid” গ্রন্থে লিখলেন–
“আমরা কখনও সাদ্দামকে মানসিক বিকারগ্রস্ত হত্যাকারী হিসাবে দেখিনি। নিজের জীবনের শেষ দিনগুলিতে সাদ্দাম তাঁদের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করতেন। ওই ব্যবহার দেখে বোঝাই যেত না যে সাদ্দাম হোসেন কোনো একসময়ে একজন অত্যন্ত নিষ্ঠুর শাসক ছিলেন।”
বার্ডেনওয়ার্পার স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে লিখেছেন–“একবার সাদ্দাম তাঁর ছেলে উদয় কতটা নিষ্ঠুর ছিল, সেটা বোঝাতে গিয়ে বীভৎস একটা ঘটনার কথা বলেছিলেন। ওই ব্যাপারটায় সাদ্দাম প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলেন। উদয় কোনো একটা পার্টিতে গিয়ে গুলি চালিয়ে দিয়েছিলেন। তাতে বেশ কয়েকজন মারা গিয়েছিলেন। গুলিতে আহত হয়েছিলেন আরও কয়েকজন। সাদ্দাম ব্যাপারটা জানতে পেরে উদয়ের সবকটি গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই ঘটনাটা বলতে গিয়ে সেনা-প্রহরীদের সাদ্দাম ভীষণ রেগে গিয়ে শুনিয়েছিলেন উদয়ের দামি রোলস রয়েস, ফেরারি, পোর্শে গাড়িগুলিতে তিনি আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সাদ্দাম হোসেনের নিরাপত্তার জন্য নিযুক্ত আমেরিকান সেনারাই তাঁকে একদিন জানিয়েছিলেন যে তাঁর ভাই মারা গিয়েছেন। যে সেনা-সদস্য খবরটা দিয়েছিলেন, সাদ্দাম তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, আজ থেকে তুমিই আমার ভাই।’ আরেকজন প্রহরীকে বলেছিলেন, ‘যদি আমার সম্পত্তি ব্যবহার করার অনুমতি পাই, তাহলে তোমার। ছেলের কলেজে পড়তে যা খরচ লাগবে, সব আমি দিতে রাজি।’ বার্ডেনওয়ার্পারের গ্রন্থটিতে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক যা উল্লেখ রয়েছে, তা হল সাদ্দামের মৃত্যুর পরে তাঁর প্রহরীরা রীতিমতো শোক পালন করেছিলেন, যদিও তিনি আমেরিকার কট্টর শত্রু ছিলেন। প্রহরীদেরই একজন অ্যাডাম রজারসন উইল বার্ডেনওয়ার্পারকে বলেছিলেন, “সাদ্দামের ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পরে আমার মনে হচ্ছে আমরা ওর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। নিজেদেরই এখন তাঁর হত্যাকারী বলে মনে হচ্ছে। এমন একজনকে মেরে ফেললাম আমরা, তিনি যেন আমাদের খুব আপনজন ছিলেন।” ওই ১২ জনের অন্যতম স্টিভ হাচিনসন সাদ্দামের ফাঁসির পরেই আমেরিকার সেনাবাহিনী থেকে ইস্তফা দেন। হাচিনসন এখন জর্জিয়ায় বন্দুক চালনা আর ট্যাকটিক্যাল ট্রেনিং দেওয়ার কাজ করেন। তাঁর মনে এখনও ক্ষোভ বর্তমান, কারণ সেদিন যেসব ইরাকি সাদ্দামের মৃতদেহকে অপমান করছিল, তাঁদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে না-পড়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল তাঁদের।
