(২) রাবণ সারাজীবন প্রচুর যুদ্ধ করেছিলেন, শত্রুর বিরুদ্ধে সশস্ত্র হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছেন। লঙ্কার দিকে চোখ তুলে তাকাতে দেননি কোনো শত্রুকে। রক্তপাতও তাঁর কোমল অন্তরকে বারবার নাড়া দিয়েছিল, ভাবিত করে তুলেছিল। রক্তের লাল রংয়ে তাঁর ট্রমার সৃষ্টি হয়েছিল বলেই হয়তো তিনি রক্তের রং বর্ণহীন হয়ে যাক চেয়েছিলেন–যাতে তার রক্তলোলুপতাকে কেউ আঙুল তুলে দেখাতে পারবে না। সেই ইচ্ছাও পূরণ হয়নি। কারণ এটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ।
(৩) রাজারাজড়াদের নানারকমের ‘অবসেশন’ থাকে। রাবণেরও ছিল, সোনার প্রতি। তিনি চেয়েছিলেন সোনা গন্ধযুক্ত হয়ে যাক, যাতে খুব সহজেই সোনা খুঁজে পাওয়া যায়। পৃথিবীর সব সোনার মালিক তিনি হতে চেয়েছিলেন। এটাও প্রকৃতি-বিরুদ্ধ। তাই এই ইচ্ছাও পূরণ হয়নি।
(৪) রাবণ সরাসরি স্বর্গে পৌঁছনোর জন্য একটা সিঁড়ি নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। সিঁড়িটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। স্বর্গ কোথায়? বাস্তবিক স্বর্গের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই সিঁড়িও অধুরা।
(৫) রাবণ মদ্যপানে শৌখিন ছিলেন। সেই কারণে তিনি চেয়েছিলেন, মদ যেন দুর্গন্ধমুক্ত হোক। এই কামনাও পূরণ হয়নি। রাবণের যুগে দুর্গন্ধমুক্ত মদ তৈরি করা না-গেলেও, এখন কিন্তু গন্ধহীন মদ পাওয়া যায়।
(৬) রাবণের গায়ের রং ছিল কালো। তিনি চেয়েছিলেন পৃথিবীর সমস্ত পুরুষের গায়ের রং ফরসা হয়ে যাক। যাতে কোনো নারী আর পুরুষের গায়ের রং নিয়ে মজা করতে না পারে। এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় যেটা, তা হল তিনি কেবল নিজের গায়ের রং ফর্সা চাইতে পারতেন। স্বার্থপরের মতো তিনি তা চাইতেই পারতেন। কিন্তু তিনি সমগ্র পৃথিবীর পুরুষের ফর্সা রং চেয়েছেন। এখানে তাঁর উদারতা প্রকাশ পেলেও ইচ্ছাপূরণ হয়নি।
(৭) সমুদ্রের জল লবণাক্ত, বিস্বাদ, অপেয়। রাবণের চেয়েছিলেন সমুদ্রের জল যদি মিষ্টি হয়ে যায়, তাহলে পানীয় জলের সমস্যা মিটে যাবে। এটাও প্রকৃতিবিরুদ্ধ। তাঁর এই ইচ্ছাও পূরণ হয়নি।
(৮) রাবণ চেয়েছিলেন সীতা তাঁর প্রতি অনুরক্তা হয়ে উঠুন। চেয়েছিলেন সীতা তাঁর অঙ্কশায়িনী হোক। সীতা পূর্বেই রামচন্দ্রের স্ত্রী। অতএব এ ইচ্ছাও পূরণ হয়নি।
অনেকে বলেন, রাবণ আর রাম মূলত দুই সময়ের মানুষ। রাবণের কাহিনিগুলি আলাদাভাবে খুঁজলে রামের সময়কার কনটেক্সটের সঙ্গে মেলে না। হতে পারে বাল্মিকী একটা সমকাল থেকে রাবণকে নিয়ে রামের চরিত্র বড়ো করে তুলেছেন। রাবণের কাহিনি কিন্তু সমান্তরালভাবে শিবের কাহিনির সঙ্গেই যায়। তাকে বলা হয় শিবের সর্বশ্রেষ্ঠ ভক্ত। তার সত্তাই কুবের হল শিবের বান্ধব। ভারতীয় পুরাণে নারায়ণ/বিষ্ণুর কাহিনি থেকে কিন্তু শিবের কাহিনিগুলিই বেশি প্রাচীন। মহাভারত পুরোটাই শৈব, কৃষ্ণকে সেইখানে বিষ্ণু অবতার বলা হলেও সমস্ত পুজো কিন্তু হয়েছে শিবের। রামায়ণের রামকেও দেখতে পাই শিব পূজারী হিসাবে। কিন্তু এটা বেশ আরোপিত মনে হয়। রাম শিবের ধনুক ব্যবহার করতেন, যেটা আবার অন্য কাহিনিতে দেখা যায় শিব নিজে ব্যবহার করেছেন ত্রিপুরাসুরকে হত্যা করতে। এরপরে সেই ধনুক দান করেছেন পরশুরামকে। সমাজকে আর্য অনার্য হিসাবে ভাগ করা বোধ হয় বৈষ্ণবযুগের (বৈষ্ণব রাজাদের) কাজ। দ্বাদশ শতক পর্যন্ত শৈব আর বৈষ্ণব পুরো আলাদা ধর্মই ছিল। আর শৈব ঘরানায় কিন্তু আর্য-অনার্য ভেদ নেই। শিবের ভক্ত যেমন দেবগুরু বৃহস্পতি, তেমনই নন্দী ত্রিপুরাসুর কিংবা রাবণ। অথচ নারায়ণের ভক্তরা আবার বেশ সম্ভ্রান্ত মানুষ।
রাবণের আধিপত্য ছিল লঙ্কা ছাড়িয়ে সমগ্র দক্ষিণ ভারতে। শুধু দক্ষিণ ভারতই নয়, তিনি কায়েম করেছিলেন। দক্ষিণবঙ্গও। রাবণ সদলবলে সাগরদ্বীপে বেড়াতে এসেছিলেন। ভেবেছিলেন সাগরদ্বীপ সহ সমগ্র এই ভূখণ্ডটি করায়ত্ত করবেন। বিশ্বজয়ী রাবণ ভাবতে পারেননি এখানে সুবিধা করতে পারবেন না। এই ভূখণ্ডে থাকেন এক শক্তিমান ও দীর্ঘদেহী পুরুষ। তিনি কপিল, কপিল মুনি। মুনি দেখলেই রাবণের উৎকট উল্লাস হয়। মুনিঋষিদের পর্যস্ত করতে পারলেই রাবণের পৈশাচিক উল্লাস হয়। এই কপিলের সঙ্গে রাবণের তুমূল সংঘর্ষ হয়। বজ্রের সমান দুই হাতে কপিল মুনি জাপটে ধরলেন রাবণকে। রাবণের প্রায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার উপক্রম হল। এরপর কপিল মুনি রাবণকে দু-হাতে মাথার উপর তুলে সবেগে মাটিতে আছাড় মারলেন। এক আছাড়েই রাবণের মাথা ঘুরে গেছে। দর্প চূর্ণ হয়েছে। বিভিন্ন বীরদের কাছে বারবার পর্যদস্ত হয়েছেন। অবশেষে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর রাম ও বানরবাহিনির কাছে রাবণের মৃত্যু হয় এবং বৈদিক রীতিনীতি মেনে অগ্নি প্রজ্বলন করে তাঁর সত্ত্বার সম্পন্ন হয়। রাক্ষস বিরাধকে কবর দেওয়া হলেও রাক্ষসরাজ রাবণের মরদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে দাহ করা হয়েছিল (৬.১১৩.১২০)৷ স্বয়ং রাম এবং মিত্রপক্ষ অকুস্থলে দাঁড়িয়ে থেকে রাবণের দাহকর্ম সম্পন্ন করেন। শত্রুর সত্ত্বার করে রাম মহান’ হলেন, আর্তের সেবক হলেন। রামায়ণে কবর ও দাহ উভয় প্রথার নির্দেশ পাওয়া যায়। শবদাহ প্রথা–আর্যদেরই “ভস্মান্তং শরীরম্” (ঈশোপনিষৎ-যজুর্বেদ)। অনার্যদের কবর দেওয়াই প্রথা–রামায়ণে (অরণ্যকাণ্ড, চতুর্থ সর্গ ২২ শ্লোক) প্রমাণ পাওয়া যায়–
