রামায়ণের বানরেরা যেমন monky নয়, তেমনই রাক্ষসরাও man-eater নন। রাবণ রীতিমতো ব্রাহ্মণদের মতো যাগযজ্ঞ করতেন। বেদান্ত শাস্ত্রে তিনি সুপণ্ডিত ছিলেন। “এষ আহিতাগ্নিশ্চ মহাতপাশ্চ বেদান্তগঃ কর্মসু চাগ্রশূরঃ”–বৈদিক কর্মকাণ্ডেও তিনি অগ্রণী পুরুষ। রাক্ষস বলতে যেমন কল্পনা করা হয় কুলোর মতো কান, মুলোর মতো দাঁত, বড়ো বড়ো চুল, লম্বা লম্বা নখ, বিশালাকার দেহ, চরমভাবে হিংস্র, কিম্ভুতকিমাকার–তা কিন্তু নয়। আমি দেখেছি চলচ্চিত্র, ধারাবাহিকে এইরকম রূপে বোঝানো হয়, ওরা কী কুৎসিত! ওরা এক্কেবারে মানুষের মতো, অন্য কোনোরকম নয়। মানুষ যেমন কুৎসিত সুন্দর হয়, ওরাও তেমনই। লঙ্কায় প্রবেশের পর হনুমান যেমন কুৎসিত রাক্ষস দেখেছেন, তেমনই সুন্দর-সুন্দর রাক্ষসদের দেখেছেন। বাল্মীকি বলেছেন–“ননন্দ দৃষ্টা চ স তান্ সুরূপান, নানাগুণান্ আত্মগুণানুরূপান্।”। আর লঙ্কার নারীরা তো অতীব সুন্দরী। রাবণের অন্দরমহলের নারীরা যেন বিশ্বের সেরা সুন্দরীদের সমাবেশ। হনুমানের দেখা সেরা সুন্দরী বালীর স্ত্রী তারার সৌন্দর্যও ম্লান হয়ে যায়–
“তেষাং স্ত্রিয়স্তত্র মহানুভাবা, দদর্শ তারা ইব সুস্বভাবাঃ”।
চন্দ্রাবতীর রামায়ণেও উল্লেখ আছে–
“রূপেতে রূপসী যত গো রাক্ষস-কামিনী।
পারিজাত ফুলে তারা গো বিনাইয়া বান্ধে বেণী।
মণি-মাণিক্যেতে কেউ গো চাঁচর কেশ বান্ধে।
বায়ু সুরভিত হয় গো শ্রীঅঙ্গের গন্ধে।”
রাবণের স্ত্রীদের দেখে হনুমান বলেছেন–
“ন তত্র কাশ্চিৎ প্রমদা প্রসহ্য, বীর্যোপপন্নেন গুণেন লক্কা”।
অর্থাৎ, সব সুন্দরী মহিলারাই রাবণের গুণে কিংবা বীরত্বে আপন-ইচ্ছায় ধরা দিয়েছে।
জাতবর্ণনির্বিশেষে সেইসব সুন্দরীদের মধ্যে কী ছিল না–রাজার কন্যা, ব্রাহ্মণের কন্যা, দৈত্যের কন্যা, ঋষির কন্যা, গন্ধর্বের কন্যা প্রমুখ। যে মানুষটিকে ব্রাহ্মণ তো বটেই–রাজা, ঋষির কন্যারাও পতি বলে স্বেচ্ছায় বরণ। করে নিয়েছেন–সেই রাবণকে রাক্ষস’ বলা ধৃষ্টতা নয় কি! সীতা এমন কোনো আহামরি সুন্দরী ছিলেন না, রাবণের অন্দরমহলে যে বিশ্বসেরা সুন্দরী ছিল সেই নিরিখে তো নয়ই। আসলে সীতার ‘না’ বলাটা তথা প্রত্যাখ্যান করাটা রাবণের হজম হয়নি। যে রাবণের বাহুডোরে বিশ্বের তাবড় তাবড় সুন্দরী নারীরা স্বেচ্ছায় সমর্পণ করেন, সেখানে সামান্য এই বনবাসিনী নারী কিনা প্রত্যাখ্যান করবে, ঔদ্ধত্য দেখাবে! সীতাকে ভোগের ব্যাপারে রাবণের যতটা-না আগ্রহ ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল জেদ। সীতার প্রত্যাখ্যানের স্পর্ধাই রাবণকে ক্রোধী করে তুলেছিল। অহংকারী রাবণ সেই ক্রোধে বশবর্তী হয়ে নিজের মৃত্যুকেই দাওয়াত এবং দস্তক দিয়েছিলেন। রাবণের একটাই মহাদোষ, রাবণ বিশ্বধর্ষণবাজ। একদিকে যেমন গাদা গাদা সুন্দরীদের বিয়ে করে অন্দরমহলে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছেন, অপরদিকে যেসব সুন্দরীরা বেগড়বাই করেছেন রাবণ তাঁদের ধর্ষণ করেছেন। রাবণ শুধু ধর্ষণবিলাসীই ছিলেন, তিনি ব্রহ্মার প্রশ্রয়ে ও পৃষ্ঠপোষকতায় যাঁর-তাঁর ধড় থেকে মাথা নামিয়ে ফেলতে চাইতেন। রাবণকে সারাজীবন এইসব বদামোর জন্য প্রচুর মাশুল গুণতে হয়েছে।
লঙ্কেশ্বর রাবণ বেশকিছু কাজ করতে চেয়েছিলেন। যে কাজগুলি করতে চেয়েছিলেন, তা নানা কারণে করা হয়ে ওঠেনি–সে কাজগুলি একনজরে দেখে নিতে পারি। মহাকাব্য রামায়ণ’-এ রাবণকে এমন এক তুলিতে এঁকেছিলেন কবি বাল্মীকি, যাতে তাঁকে একেবারে খলনায়ক’ বলে কিছুতেই মনে হয় না। সত্যি বলতে, রাবণের উপরে আরোপিত হয়েছে এমন কিছু বিরল গুণাবলি, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা যায় না। তবে এটাও ঠিক, রাক্ষসরাজ রাবণ তো মানুষ ছিলেন না। তাঁর জন্ম এবং সাধনা তাঁকে এক প্রবল পরাক্রমশালী ‘অর্ধ-দেবতা হিসাবেই তাকে স্থিত করে। রামায়ণ’-এ রাবণকে এভাবেই দেখানো হয়েছে যে, তিনি পারেন না এমন কোনো কাজ নেই। চূড়ান্ত আত্মম্ভরিতার কারণে এমন কিছু সংকল্প রাবণ করে বসেন, যা প্রবল পরাক্রমশালী হওয়া সত্ত্বেও তিনি পূরণ করতে ব্যর্থ হন। কী সেসব কাজ, যা রাবণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু করতে পারেননি? ইচ্ছে হলেই সব কাজ করা সম্ভব হয় না। রাবণও সম্ভব করতে পারেনি।
কল্পনায় সব সম্ভব, বাস্তবে নয়। গল্পের গোরু গাছে চড়লেও, বাস্তবে সে মাটিতেই বিচরণ করে। একটু পর্যবেক্ষণ করা যাক, রামায়ণের পথে–
(১) দোর্দণ্ডপ্রতাপ এবং পরাক্রান্ত রাবণ চেয়েছিলেন একটা সম্পূর্ণ নতুন ওয়ার্ল্ড অর্ডার নির্মাণ করতে। যার বেশিরভাগই ছিল প্রকৃতিবিরুদ্ধ। রাবণ চেয়েছিলেন মানুষ ঈশ্বরের উপাসনা বন্ধ করুক। তবে কি রাবণ নাস্তিক ছিলেন? নিশ্চয়ই ‘ঈশ্বর’ বলতে রাবণ ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিবদের বলেননি। কারণ ব্ৰহ্মা-বিষ্ণু-শিব প্রমুখ ঈশ্বর নন, দেবতা। দেবতা আর ঈশ্বর এক নয়। দেবতা আকার, ঈশ্বর নিরাকার। রাবণ ঈশ্বরকে অগ্রাহ্য করে দেবতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ দেবতাদের দ্বারা তিনি নানাভাবে উপকৃত হয়েছেন নানা সময়ে। আত্মরক্ষার ভয়ানক ভয়ানক অস্ত্র পেয়েছেন। দেবতাদের সহায়তাতেই ভুবনজুড়ে দৌরাত্ম্য দেখাতে পেরেছেন। তাই রক্তমাংসের দেবতাদের প্রতিই তাঁর বিশেষ দুর্বলতা তৈরি হতে পারে। ভেবেছিলেন তিনিই দেবতা হবেন। কিন্তু তার এই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কারণ মহাকবির সর্বৈ চেষ্টায় তিনি খলনায়কই, দেবতা নন।
