স্বৰ্গবেশ্যা রম্ভা নলকুবেরের কাছে অভিসারে যাওয়ার সময় রাবণ তাঁকে ধর্ষণ করেন। ফলে নলকুবের তাঁকে অভিশাপ দেন যে, কোনো নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করলে রাবণের তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হবে। এমনকি রাবণ সমুদ্রে প্রবেশ করে প্রথমে নাগদের পরাজিত করেন, পরে নিবাতকবচ নামক দৈত্যের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন। রাম এবং নিবাতকবচ উভয়ই ব্রহ্মার বরে অজেয় ছিলেন। সে কারণে ব্রহ্মার মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধ নিবারিত হয়। পরে রাবণ এঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। পরে ইনি নিবাতকবচের কাছ থেকে বহুবিধ মায়াবিদ্যা অর্জন করেন। এরপর তিনি জলদেবতা বরুণের পুত্রদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং তাঁদের পরাজিত করেন। এরপর ইনি অশ্মনগরে চারশত কালকেয় দানবের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাঁদেরকে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধে রাবণের বোন শূর্পণখার স্বামী বিদ্যুৎজিহ্বা নিহত হন। রাবণ তাঁর এই বিধবা বোনকে সান্ত্বনা দিয়ে দণ্ডকারণ্যে বাসবাস করার জন্য প্রেরণ করেন। এই সময় রাম পিতৃসত্য রক্ষার্থে সীতা ও লক্ষ্মণসহ পঞ্চবটী বনে কুটির নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন। শূর্পণখা রাম ও লক্ষণের কাছে তাঁর প্রণয়ের কথা ব্যক্ত করলে, লক্ষ্মণ শূর্পণখার নাক ও কান কেটে দেন। এরপর শূর্পণখার অধীনস্থ খর ও দূষণ নামক সেনাপতিদ্বয়কে রামের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলে তাঁরা সসৈন্যে নিহত হন। ক্ষুব্ধ শূর্পণখা লঙ্কায় গিয়ে সমস্ত বিষয়ে রাবণকে জানান এবং সীতার অপহরণের জন্য রাবণকে উত্তেজিত করে তুললেন।
রাবণ পঞ্চবটীতে পৌঁছে তাড়কার পুত্র মারীচের সাহায্যে সীতা অপহরণের পরিকল্পনা নেন। মারীচ সোনার হরিণের ছদ্মবেশে সীতার সামনে ঘোরাঘুরি করতে থাকলে সীতা রামের কাছে উক্ত হরিণ ধরে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। রাম ওই সোনার হরিণ ধরতে যান। এরপর মারীচ রামের কণ্ঠ নকল করে কাঁদতে থাকল। রামের বিপদ হয়েছে মনে করে সীতা লক্ষণকে পাঠান। এরপর লঙ্কেশ্বর রাবণ পরিব্রাজকের ছদ্মবেশে এসে সীতার কাছে আসেন এবং সীতার শরীরের প্রশংসা করতে থাকেন–
“বিশালং জঘনং পীনমূরূ করিকরপমৌ।
এতাবুপচিতৌ বৃত্তৌ সংহতৌ সংগলভিতৌ।
পীনোন্নতমুখে কান্তৌ স্নিগ্ধতালফলপমৌ।
মণিপ্রবেকাভরণৌ রুচিরৌ তৌ পয়ধরৌ।”
পরে ইনি সবলে সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কার পথে অগ্রসর হন। পথে জটায়ু পাখি তাঁকে বাধা দিলে রাবণ তাঁর পাখা কেটে পথে ফেলে রেখে অগ্রসর হন। সীতাকে নিয়ে যাওয়ার পথে তাঁর অলংকার ঋষমূকপর্বতে বানরদের উদ্দেশ্য নিক্ষেপ করেন। লঙ্কায় গিয়ে রাবণ সীতাকে বশ করার বহু চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে, ইনি সীতাকে অশোকবনে বন্দিনী করে রাখেন। রাবণ জানিয়ে দেন, দশ মাসের মধ্যে সীতা বশীভূত না-হলে তাঁকে খণ্ড খণ্ড কেটে খেয়ে ফেলা হবে।
রাম-লক্ষণ কুটিরে ফিরে এসে সীতাকে দেখতে না-পেয়ে, অন্বেষণে বেরিয়ে পড়েন। পথে আহত জটায়ু পাখির মুখে রাবণ কর্তৃক সীতাহরণের সব কাহিনি শুনে ঋষমূকপর্বতে বানরদের কাছ থেকে সীতার অলংকার দেখতে পান। সেখানে একে অপরের স্বার্থে কিষ্কিন্ধ্যার অধিপতি সুগ্রীবের সঙ্গে রামের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এখান থেকে রাম হনুমানকে লঙ্কায় পাঠান সীতার সংবাদ আনার জন্য। হনুমান লঙ্কায় পৌঁছে সীতার সংবাদ রামকে পৌঁছে দেন। তারপর রাম বানরসৈন্যদের সহায়তায় সমুদ্রের উপর সেতু নির্মাণ করে লঙ্কায় পৌঁছে যান। এই সময় রাবণের কনিষ্ঠ ভাই বিভীষণ সীতাকে ছেড়ে দিতে পরামর্শ দিলে, রাবণ তাঁর সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং বিভীষণকে অপমান করেন। রাবণ বললেন,–
“ন তু মিত্রপ্রবাদেন সংবসেৎ শত্রুসেবিনা”।
অর্থাৎ “শত্রু ও সাপের সঙ্গেও আমি ঘর করব, কিন্তু নামেমাত্র বন্ধু এই শত্রুসেবী বিভীষণের সঙ্গে থাকব না।”
‘রাজদ্রোহী’, ‘গৃহভেদী’ বিভীষণকে কেবল অপমান করেই রাবণ ছেড়ে দিলেন, হত্যা করলেন না–যেটা প্রয়োজন ছিল। বিভীষণ তাঁর চারজন বন্ধুর সঙ্গে রাবণের রাজসভা ছেড়ে শত্রুপক্ষ রামের সঙ্গে যোগ দেন। সেদিন যদি ‘রাজদ্রোহী’ বিভীষণ হত্যা করতেন, তাহলে রামের পক্ষে যোগদান করে রাবণের সর্বনাশকে তরান্বিত করতে পারতেন না। বিভীষণকে বুকে লাথি মেরে ফেলে দেওয়া এবং খড়গ তুলে হত্যা করতে যাওয়ার ঘটনা বাল্মীকি বলেননি, বলেছেন কৃত্তিবাস ওঝা। রাম-রাবণের চূড়ান্ত যুদ্ধ আরম্ভের পূর্বে বিভীষণ রামের পক্ষে যোগ দেন। যুদ্ধে রাবণের পুত্র মেঘনাদ অসাধারণ বিক্রম প্রদর্শন করেন।
সাম্রাজ্যবাদী রাবণ বিভিন্ন দেশে গিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করতেন। বলতেন–হয় পরাজয় স্বীকার করো, নয় মৃত্যবরণ করো। দুষ্কন্ত, সুরথ, গাধি, পুরুরবা পরাজয় স্বীকার করেন। কিন্তু পরাজয় স্বীকার করলেন না অযোধ্যার অধিপতি অনুরণ্য। অস্ত্রাঘাতের পর রাবণ অনুরণ্যকে সজোরে এক থাপ্পর মারেন। সেই থাপ্পরেই অনুরণ্যের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময় অনুরণ্য রাবণকে অভিশাপ দেন এই বলে যে, আমার বংশেই তোর ঘাতক জন্মাবে। রাম-রাবণের যুদ্ধ প্রায় ষোলোসতেরো দিন ব্যাপী হয়েছিল। প্রতিপদে যুদ্ধ শুরু হয়। এই রাতেই মেঘনাদ কর্তৃক নাগপাশে আবদ্ধ হন রাম-লক্ষণ, দুজনেই। পরে অবশ্য গরুড়ের সাহায্যে এই বন্ধন থেকে উভয়ই মুক্তি লাভ করেন। দ্বিতীয়ায় ধুম্রাক্ষ হত্যা, তৃতীয়ায় বজ্রদংষ্ট্রা হত্যা, চতুর্থীতে অকম্পন হত্যা, পঞ্চমীতে প্রহস্ত হত্যা, ষষ্ঠীতে রাবণের সঙ্গে যুদ্ধ এবং রাম-লক্ষ্মণের পরাজয়, সপ্তমীতে কুম্ভকর্ণ হত্যা, অষ্টমীতে নরান্তক ও অতিকায় প্রমুখদের হত্যা, নবমীতে মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিতের সঙ্গে যুদ্ধ, দশমীতে নিকুম্ভ হত্যা, একাদশীতে পুনরায় ইন্দ্রজিতের সঙ্গে যুদ্ধ, দ্বাদশীতেও পুনরায় ইন্দ্রজিতের সঙ্গে যুদ্ধ, ত্রয়োদশীতে ইন্দ্রজিৎ হত্যা, চতুর্দশীতে রাবণ শোকবিহ্বল ও পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তুতি। অবিরাম তিনদিন ব্যাপী যুদ্ধের পর রাবণের মৃত্যু হয়।
