রাবণ চরিত্রের তেমন কয়েকটি দিকের কথা তুলে ধরা হল, যা সাধারণত আলোচনার আওতায় আসে না। যেমন–
(১) শাসক হিসাবে রাবণকে কোথাও অপশাসক বা নিষ্ঠুর বলা হয়নি। তিনি স্বর্ণলঙ্কার অধিপতি। স্বর্ণ বা সোনার রূপকে সমৃদ্ধ লঙ্কা এমনি এমনি হয় না। ফলে বোঝাই যায়, তিনি সমৃদ্ধ এক সাম্রাজ্য শাসন করতেন। আর এ কথা কে না জানে, সুশাসন ছাড়া সমৃদ্ধি সম্ভব নয়! বাল্মীকির রামায়ণে হনুমান যখন সীতার খোঁজে লঙ্কায় পৌঁছোন, সে সময় লঙ্কাদর্শন করে হনুমান বিহ্বল হয়ে যান, মুগ্ধ হওয়ার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
(২) যুদ্ধক্ষেত্রে আহত অবস্থায় পড়ে থাকাকালীন রাবণকে দেখতে যান লক্ষ্মণ। রাবণ তাঁকে বিবিধ বিষয়ে জ্ঞান দান করেন। রাবণের সেই আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল ‘রাজধর্ম’ কী এবং কীভাবে তা পালন করতে হয়। ভাবুন তো, একেই তো বলে সুশাসক। শুধু তাই নয়–
(৩) রাবণ ছিলেন এক অসামান্য বীণাবাদক। তিনি নিজেই তাঁর বীণার নকশা করেছিলেন। তিনি ‘শিব তাণ্ডব’ স্তোত্রেরও রচয়িতা।
(৪) রাবণ একনিষ্ঠ শিবভক্ত ছিলেন। রাবণকে শিব এক আশ্চর্য বর দান করেন। সেই বরে তিনি প্রায় অমরত্ব। প্রাপ্ত হন।
(৫) রাবণ ছিলেন দক্ষ চিকিৎসক। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে তাঁর বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল। নাড়ি পরীক্ষা’, ‘অর্ক শাস্ত্র’, ‘অর্ক পরীক্ষা’ প্রভৃতি বিখ্যাত আয়ুর্বেদ শাস্ত্রগ্রন্থ রাবণ কর্তৃক লিখিত বলে প্রচলিত। ক্ষত চিকিৎসায় তাঁর অবদানের কথা আজও আয়ুর্বেদ স্বীকার করে।
(৬) রাবণের পাণ্ডিত্যের খ্যাতি ছিল ভুবনবিদিত। চার বেদ এবং ছয় উপনিষদ তাঁর নখদর্পণে ছিল।
(৭) জ্যোতির্বিদ্যায় রাবণের বিশেষ দখল ছিল। একথা রামায়ণে বার বার উল্লিখিত হয়েছে যে, তিনি নাকি গ্রহতারকাদের নির্দেশ দিতেও পারতেন। আসলে তিনি গ্রহতারকার ভবিষ্যৎ অবস্থান অনর্গল বলে যেতে পারতেন। তাঁর রচিত ‘রাবণসংহিতা’ নামে একটি গ্রন্থ আছে।
(৮) রাবণ এবং তাঁর ভাই কুম্ভকর্ণ ছিলেন বিষ্ণুর দ্বাররক্ষক। তাঁরা ব্ৰহ্মকুমারদের দ্বারা অভিশাপগ্রস্ত হন। তাতেই তাঁদের রাক্ষসজন্ম ঘটে বলে উল্লেখ আছে।
(৯) রাবণকে ত্রিলোকের অধীশ্বর হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে বহু রামায়ণে। সুতরাং তাঁর ক্ষমতা যে-কোনো রাজার থেকে অনেক বেশি ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
(১০) রাবণ কেবল লঙ্কারই অধীশ্বর ছিলেন না, তিনি সমগ্র দক্ষিণ ভারতে রাজ করতেন।
(১১) অন্ধ্রপ্রদেশের কাকিনাড়ায় রাবণ ও শিবলিঙ্গ একত্রে পূজিত হন। এ থেকে বোঝা যায়, মানুষের রাবণ চিরকালই খলনায়ক ছিলেন না।
লঙ্কায় রাজা রাবণের জন্ম হয় বিশ্রবা মুনির ঔরসে কৈকসীর (অন্য নাম নিকষা) গর্ভে। কৈকেসী মোট চারটি সন্তানের জন্ম দিয়েছিল। এই চারটি সন্তানের মধ্যে পুত্র হল–রাবণ, কুম্ভকর্ণ, বিভীষণ ও কন্যা শূর্পণখা। বিভিন্ন রামায়ণে বলা হয়েছে–রাবণের দশটি মাথা, কুড়িটি হাত। গায়ের রং ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, উজ্জ্বল চুল ও দাঁত এবং টকটকে লাল ঠোঁট ছিল। ইনি স্থপতি ময়দানবের কন্যা মন্দোদরীকে বিবাহ করেন। কথিত আছে, তাঁর প্রায় এক লক্ষ পুত্র ও সোয়া লক্ষ নাতি ছিল। প্রাচীন যুগে প্রজাদের সন্তানের চোখে দেখা হত। রাজা নিজেকে প্রজাদের পিতৃতুল্য বা অভিভাবক ভাবত। এটাই ছিল রীতি। রাবণের উল্লেখযোগ্য পুত্র ছিলেন মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিৎ। বিশ্রবার প্রথমা স্ত্রী দেবর্ণিনীর সন্তান কুবের ছিলেন যক্ষদের রাজা। কুবের অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারী ছিলেন বলে কৈকসী ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁর পুত্রদেরকে অনুরূপ ঐশ্বর্য এবং সেই সঙ্গে অমিত তেজ অর্জনের জন্য তপস্যা করতে আদেশ দিলেন। এঁরা ব্রহ্মার গভীর উপাসনা শুরু করলে ব্রহ্মা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে বর প্রার্থনা করতে বললেন। রাবণ অমরত্বের বর প্রার্থনা করলেন এবং ব্রহ্মা তা দিতে অসম্মত হলেন। পরে ইনি দেব, দানব, দৈত্য, যক্ষ, রক্ষ ইত্যাদির কাছে অজেয় ও অবধ্য হওয়ার বর প্রার্থনা করলেন। মানুষকে তিনি এই তালিকায় রাখলেন না। ব্রহ্মা এই বর মঞ্জুর করলেন।
এসময় কুবের লঙ্কার রাজা ছিলেন। কুবের রাবণের দাদা। প্রথমে রাবণ কুবেরকে লঙ্কা থেকে বিতারিত করে সেখানে রাক্ষসরাজ্য স্থাপন করেন। এই সময় ইনি কুবেরের পুষ্পক রথ অধিকার করেন। এরপর তিনি দিগ্বিজয়ে বের হয়ে নর্মদা নদীতীরে শিবপুজো আরম্ভ করলেন। সেখানে হাজার হাতবিশিষ্ট কার্তবীর্য নামক এক রাজা জলক্রীড়া করছিলেন। এর ফলে নদীর জল ঘোলা হতে থাকলে ক্রুদ্ধ রাবণ তাঁকে আক্রমণ করেন। এই যুদ্ধে রাবণ পরাজিত ও বন্দি হন। পরে রাবণের স্বর্গীয় পিতামহ পুলস্ত্যের অনুরোধে কার্তবীর্য তাঁকে মুক্তি দেন।
মহর্ষি নারদের প্ররোচনায় ইনি যমরাজের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেন। পরে অবশ্য ব্রহ্মার অনুরোধে এই যুদ্ধ বন্ধ হয়। কৈলাসের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাবণের রথের গতি রুদ্ধ হয়। এই সময় মহাদেবের অনুচর নন্দী রাবণকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এখানে হর-পার্বতী আছেন। নন্দীর বানর মুখ দেখে রাবণ অবজ্ঞায় হাস্য করলে নন্দী অভিশাপ দেন যে, তাঁর মতো বানরদের হাতেই রাবণবংশ ধ্বংস হবে। রাবণ এরপর ক্ষিপ্ত হয়ে কৈলাস মাটি থেকে উপরে তুলতে থাকলে পার্বতী চঞ্চল হয়ে উঠেন। তখন মহাদেব পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে রাবণকে চেপে ধরেন। রাবণ সে চাপ সহ্য করতে না-পেরে প্রচণ্ড চিৎকার করতে থাকেন। পরে মহাদেবের স্তব গুণগান করে মুক্তি পান। এই সময় মহাদেব তাঁকে ‘চন্দ্রহাস’ নামে একটি দীপ্ত খড়া উপহার দেন। স্বর্গে গিয়েও রাবণ দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে ইন্দ্র সহ সকলকে পরাজিত করেন। রাবণের পুত্র মেঘনাদ কপট যুদ্ধে ইন্দ্রকে পরাজিত ও বন্দি করে লঙ্কায় নিয়ে আসেন। এই কারণে মেঘনাদ ইন্দ্রজিৎ’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেন। পরে ব্রহ্মার অনুরোধে ইনি ইন্দ্রকে মুক্তি দেন। এরপর রাবণ ধীরে ধীরে অত্যন্ত অত্যাচারী রাজায় পরিণত হলেন। ইনি দেব, দানব ও ঋষি কন্যাদের হরণ করতে থাকেন। একবার ইনি বৃহস্পতির পুত্র মহর্ষি কুশধ্বজের কন্যা বেদবতীকে হরণ করতে উদ্যত হলে, ইনি অগ্নিতে আত্মাহুতি দেন। আত্মাহুতিকালে ইনি রাবণকে জানান যে, পরে ইনি কোনো ধার্মিক পুরুষের ‘অযোনিজ’ কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করবেন এবং রাবণ বধের কারণ হবেন। এই কন্যাই পরে সীতারূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
