লঙ্কায় ভূগোল-ইতিহাসটা একটু দেখা যাক। রাবণের জন্মের বহু আগে মালী, সুমালী ও মাল্যবান এই তিন রাক্ষস ভাই স্বর্গের দখলদারির স্বার্থে দেবতাদের উপর খুব অত্যাচার শুরু করেছিল। সৰ্বলোক জয় করে তাঁরা এবার তাঁদের জন্য একটি প্রাসাদ বানালেন বিশ্বকর্মাকে দিয়ে। কেউ কেউ বলেন লঙ্কা রাক্ষস-স্থপতি ময়দানবের সৃষ্টি। ময়দানব অনার্যদের স্থপতি। ময়দানবের রচিত গ্রন্থের নাম ময়মত। কথিত আছে, ময়দানব ছিলেন বিশ্বকর্মারই পুত্র, অন্যদিকে আর্যদের স্থপতি বিশ্বকর্মা। অবশ্য বিশ্বকর্মা গোড়াতে অনার্যদেরই সভাপতি ছিলেন, পরে আরও বেশি সুযোগের সন্ধানে আর্যদেবতাদের মহাস্রষ্টা আসন অলংকৃত করেন, আর্যরাও তাঁর পরিচয় আর্যরূপেই প্রচার করতে থাকেন। বিশ্বকর্মার রচিত গ্রন্থের নাম ‘বিশ্বকর্মাস্তুশাস্ত্রম্ বিশ্বকর্মা “স্থাপত্য বেদ’ নামক একটি উপবেদের রচয়িতা। বিশ্বকর্মার নামে অন্ততপক্ষে দশখানি বাস্তুবিদ্যার গ্রন্থ পাওয়া যায়। বিশ্বকর্মার আর-এক পুত্র ছিলেন, তিনি বানর যুথপতি নল। পৌরাণিক মতে বিশ্বকর্মাও বানর জাতীয় বলা হয়েছে।
লঙ্কায় সৌন্দর্য বর্ণনায় বাল্মীকি অকৃপণ। ত্রিভুবন খুঁজলেও লঙ্কার মতো সৌন্দর্য-বৈভব পাওয়া যাবে না। লঙ্কার উত্তর দ্বার ছিল সুরক্ষিত। গৃহগুলো বহুতল ও গগনস্পর্শী। হনুমান লঙ্কায় পৌঁছে তো থ। লঙ্কাগৃহের স্থাপত্য দর্শন করে হনুমান তো বুঝতেই পারছেন না, এটা স্বর্গপুরী নাকি ইন্দ্রপুরী!–
“স্বর্গোহয়ং দেবলোকোহয় ইন্দ্রস্যাপি পুরী ভবেৎ।”
হনুমান দেখলেন মেঘাকার লম্ব পর্বতে প্রতিষ্ঠিত লঙ্কায় সমস্ত পথই অতি প্রশস্ত। সর্বত্র প্রাসাদ, স্বর্ণস্তম্ভ ও স্বর্ণজাল। কোনো কোনো সাপ্তভৌমিক ভবন, কোথাও-বা অষ্টতল গৃহও দেখা গেছে। স্থানে স্থানে স্বর্ণময়। তোরণ। এ যেন যথার্থই স্বর্ণলঙ্কা।
চন্দ্রাবতী রামায়ণে এইভাবে বর্ণিত হয়েছে–
“স্বর্গপুরে আছে যথা ইন্দ্রের নন্দন।
সেইমতে লঙ্কাপুরে গো অশোকের বন।”
কিংবা “সোণার পালঙ্কে তারা গো শুইয়া নিদ্রা যায়।
দেবের অমৃত তারা গো সুখে বৈসা খায়।
বিচিত্র সুবর্ণ লঙ্কা গো নিৰ্মাইল বিশাই।
এমন বিচিত্র পুরী গো তিরভুবনে নাই।”
রামচন্দ্রের স্ত্রী সীতাকে অপহরণ করে রাবণ এই লঙ্কাতেই নিয়ে আসেন। সীতার উদ্ধারকল্পে কিষ্কিন্ধ্যার বানরসেনার সাহায্যে রামচন্দ্র লঙ্কা আক্রমণ করলে রাবণের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ হয়। রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে অগ্যস্ত মুনির মুখ দিয়ে তাঁর পূর্বজীবনের কথা বলা হয়েছে।
রাবণ কোনোদিনই অপরাজেয় ছিলেন না। মৃত্যু না-হলেও বহু যুদ্ধে বহুবার তিনি পরাজিত হয়েছেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে–নর্মদা নদীর তীরে মাহিষ্যতি নগরী, সেখানকার রাজা হলেন সহস্রহাতসর্বস্ব (সহস্রহাতসর্বস্ব হাত শুনে ভেবে নেওয়ার কারণ নেই যে, কোনো ব্যক্তির ১০০০ টি হাত। বাস্তবে সেটা কখনোই হয় না। এই সহস্রহাত মানে কার্তবীর্যাজুনের ৫০০ দেহরক্ষীর কথা বোঝানো হয়েছে। ৫০০ দেহরক্ষীর ১০০০ হাত। সেটাই বাস্তব) কার্তবীর্যাজুন। যুদ্ধ করতে গিয়ে রাবণ কার্তবীর্যাজুনের সেই হাজার হাতের মাঝে বন্দি হন, কার্তবীর্যাজুন রাবণকে জাপটে ধরে বন্দি করে রাখেন। রাবণের বাবা বিশ্রবা এসে কার্তবীর্যাৰ্জুনকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন। বিশ্রবার অনুরোধে রাবণ মুক্তি পান। রাবণ বালীর কাছেও পরাজিত হয়েছিলেন। বালি আহ্নিক করছিলেন, এমন সময় রাবণ তাই পা টিপে টিপে নিঃশব্দে তার পিছনে এসে দাঁড়ান এবং আচমকাই চেপে ধরবেন। নির্বিকার বালী রাবণকে বগলে চেপে ধরে চার সমুদ্র ঘুরে সন্ধ্যা আহ্নিক সমাপ্ত করলেন। রাবণের আর-একটি পরাজয়ের গল্প মনে পড়ছে। রাবণ নারদকে জিজ্ঞাসা করলেন কোথায় গেলে একটি মনের মতো যুদ্ধ করতে পারবেন। বহুদিন তিনি তেমন যুদ্ধ করে তৃপ্তি পাননি। নারদ বললেন, সমুদ্রের মধ্যে শ্বেতদ্বীপ। সেখানকার অধিবাসীরা সবাই সাদা রঙের। তুমি সেখানে গিয়ে যুদ্ধ করতে পারো। সময় নষ্ট না-করে রাবণ দ্রুত শ্বেতদ্বীপে চলে গেলেন। কিন্তু সেই দ্বীপে একজনও পুরুষ নেই যে! কেবলই নারী। তবুও রাবণ যুদ্ধ করতে চাইলেন। রাবণের সেই ইচ্ছার কথা শুনে সেইসব নারীরা তো হেসেই কুটিপুটি। তাঁরা রাবণকে কোলে তুলে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। দশ মাথা কুড়িটা হাত দেখে তাঁরা খুব মজা পাচ্ছিলেন। মান্ধাতার সঙ্গেও রাবণের যুদ্ধ হয়। তবে এ যুদ্ধ অমীমাংসিত ছিল–কারোর হার বা জিৎ হয়নি। ব্রহ্মা মহর্ষি পুলস্ত্যরা এসে মান্ধাতাকে ক্ষান্ত করেন ও রাবণকে তিরস্কার করে দুজনের সখ্যতার আয়োজন করেন।
‘রাবণ’ নামটি শিবের কাছ থেকে পাওয়া। কোথাও কোথাও মূর্তিশিল্পে বা চিত্রশিল্পে তার দশটি মাথা, কুড়িটি হাত ও দশটি পা দেখানও হয়। অন্য রামায়ণে ‘কামুক’ ও ‘ধর্ষকামী’ বলে নিন্দিত হলেও বাল্মীকির রামায়ণে রাবণকে মহাজ্ঞানী ও তাপসও বলা হয়েছে। রাবণকে যে দশানন বা দশমাথা বলা হয় সেটা হল তার দশ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, জ্ঞানের জন্য। তার মাঝে আছে ছয়টি শাস্ত্র আর চারটি বেদ–মোট দশটা জ্ঞান। মহাকাব্য ‘রামায়ণ’-এ লঙ্কাধিপতি রাবণকে কখনোই সম্পূর্ণ ভিলেন হিসাবে প্রতিপন্ন করা হয়নি। বরং বলা যায়, রাবণ রামায়ণ-কাহিনির অ্যান্টাগনিস্ট। এই বিশেষ চরিত্রটিকে ঘিরে এত বেশি কথা, উপকথা এবং অতিকথা এই ভারতভূমে আবর্তিত হয়েছে যে, রামায়ণের বর্ণনাই অনেক সময়ে চলে গিয়েছে অন্তরালে। সামনে এসে গেছে রাম, সীতা ও হনুমান–ইতিহাস ছাপিয়ে দেবত্বে। বীরপূজাই যে আমাদের রোগ! আর সেই বীর যদি দেবতা হয়, তাহলে তো পোয়া বারো। তাই রাবণ হয়ে উঠেছেন এক পরিপূর্ণ খলনায়ক। কারোকে খলনায়কের তকমা দেগে দিলে তার গুণগুলি আর দেখা যায় না, দেখা গেলেও সেটা আড়ালে রাখতেই বেশি তৃপ্ত বোধ করি। অথচ রামায়ণকে অনুসরণ করেই বলা যায়, রাবণ অজস্র গুণে গুণান্বিত এক ব্যক্তিত্ব। কিছু দুর্বলতা হেতু তাঁর পতন ঘটে এই মাত্র।
