রামায়ণের সবচেয়ে মজার বিষয়ই হল সীতার সতীত্ব প্রমাণ। রামের চরিত্র বিনির্মাণের জায়গায় সীতার চরিত্র প্রধান হয়ে যায়। কোনোভাবেই একজন অনার্যর সঙ্গে সীতাকে বিছানায় নামানো যায় না। দশমাস পার হলেও। রামের বউ একজন আদিবাসীর সঙ্গে ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় সময় অতিবাহিত করেছে, এটা কোনোভাবেই ইতিহাসে রাখা যাবে না। এই কারণেই রামায়ণে রামের চেয়ে সীতা অনেকাংশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রামের বউকে যে কোনো মূল্যে গরিব-গুরবো অনার্য রাক্ষসদের সংস্পর্শমুক্ত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা রামায়ণের কবি। রামায়ণ শেষপর্যন্ত যতটা-না রামের হয়েছে, বাধ্য হয়েই সেটা শেষপর্যন্ত সীতার চরিত্র নির্মাণের ঝাণ্ডা হয়েছে। তাই বলা হয়, রাবণ যে সীতাকে অপহরণ করেছিলেন সে আসল সীতা নয়, সে মায়া-সীতা। তা সেই মায়া-সীতার জন্য শ্রীরামের এত লঙ্কাকাণ্ড’! মায়া-সীতার ধারণা সম্ভবত মধ্যযুগের রচনাকারদের আবিষ্কার। যেমনটা আমরা হেলেনের ক্ষেত্রে দেখতে পাই। ইউরিপিদেস, স্তেসিকোরাস এবং হেরোডোটাস আসল হেলেনকে মিশরে পাঠিয়ে দিয়ে তার প্রতিরূপকে ট্রয়ে পাঠিয়েছিলেন। গ্রিকদের এই পিউরিটান ধারণা (নারী অপহৃতা হলে বা পরপুরুষের অনুগামিনী হলে ওই পুরুষের সঙ্গে তার যৌনসংসর্গ হতে পারে, তাতে তাঁকে আর গ্রহণ করা যাবে না) গ্রিকদের ভারতে আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আমদানি হয়ে থাকতে পারে। পিউরিটান ধারণার উৎস যাই-ই হোক ভারতীয় প্রক্ষিপ্ত রচনাকাররাই সীতার সতীত্ব বজায় রাখার উদ্দেশ্যেই মায়া-সীতার আমদানি করেছেন। বস্তুত উত্তরকাণ্ডের কবি সীতার আত্মসম্মান শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। নারীর সতীত্ব সম্পদ নেই, স্বামী ছাড়া স্বাতন্ত্র্যতা নেই।
ব্যতিক্রম কবিবর বাল্মীকি, রাম-রাবণ-বান্দর-ব্রাহ্মণ যখন সকলেই সীতাকে ‘অপবিত্র’ সাব্যস্ত করেই চললেন, তখন বাল্মীকিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি বললেন–
“সীতা যদি অপবিত্র হয়, তবে আমার সমস্ত ঋষিত্বের পূণ্য যেন শূন্য হয়ে যায়।”
বাল্মীকির এই হুংকারে কর্ণপাত করেননি উত্তরকাণ্ডের কবি। অগ্নিপরীক্ষার সিদ্ধান্তে অটুট থেকে সীতাকে মাটির নিচে সেঁধিয়ে দিলেন, বাল্মীকিকে অগ্রাহ্য করে। বস্তুত বাংলা রামায়ণটা তাই মূলত সীতায়ণ, আর বেশিরভাগ রামায়ণ মূলত হনুমানায়ণ।
রাবণ : প্রাজ্ঞ, নির্ভীক বীর, কামুক এবং অপরিমাণদর্শী
বাল্মীকির রামকথায় রাবণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যাকে বাদ দিলে রামের অস্তিত্ব নেই, রামায়ণও অর্থহীন। রাবণ ছাড়া রামের যশ নেই, খ্যাতিও নেই। রাম ঐতিহাসিক ব্যক্তি হলে রাবণও অবশ্যই ঐতিহাসিক ব্যক্তি। কোনো অলৌকিক অস্বাভাবিক কিম্ভুতকিমাকার কোনো বস্তু নয়। দশগ্ৰীব বিংশতিভুজ কোনো আজব প্রাণী নন তিনি। রাবণের জন্মবৃত্তান্ত বর্ণনা করতে গিয়ে কোনো অর্বাচীন কবি গঞ্জিকাসেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রভাবে রাবণের দশ মুণ্ডু বিশ হাতবিশিষ্ট অবয়ব বলে লিপিবদ্ধ করেছেন। বাল্মীকির রামায়ণে রাবণ সুশ্রী, সুপুরুষ, দ্বিভুজ। বিশ্বাস না হয়, মন্দোদরীর মুখেই শুনুন–
“উজ্জ্বলতায় সূর্য, কমনীয়তায় চন্দ্র এবং শোভায় পদ্মের তুল্য, ইহার জ্বযুগল, উন্নত নাসা ও ত্বক সুন্দর, ইহা রত্নকিরীট ও দীপ্ত কুণ্ডলে শোভিত।”
রাবণের মৃত্যুর পর একক মাথা কোলে নিয়ে শোকার্তা মন্দোদরীর এটাই ছিল বিলাপ-সংলাপ। হনুমান সর্বসুলক্ষণযুক্ত সুপুরুষ রাবণকে দর্শন করে মুগ্ধ হয়েছেন। এমনকি রামও যুদ্ধক্ষেত্রে রাবণকে দর্শন করে মুগ্ধ হয়ে বলেছেন–
“উঁহার যেমন দেহভাগ্য, দেব ও দানবেরও এইরূপ নহে।”
অতএব যাঁরা রাবণকে দশ মাথা কুড়ি হাতের অতিকায় রাক্ষস ভেবে রেখেছেন, তাঁরা কল্পনার দেশ থেকে বাস্তব মাটিতে নেমে আসুন।
সবদিক দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে বলা যায় রাবণ অনার্যই ছিলেন। শিবভক্ত শৈব্য। শিব আদিতে অনার্য দেবতাই ছিলেন, পরে আর্যরা তাঁকে আত্মসাৎ করে নেয়। মিথ্যা অপপ্রচারে রাবণ দশমুণ্ডধারী, পাপিষ্ঠ। বাল্মীকির রামায়ণে তিনি সুপুরুষ, ন্যায়নিষ্ঠ, ক্ষমাশীল, দুই হাতবিশিষ্ট, একটি মাথা সর্বস্ব এক দিগ্বিজয়ী শৈব রাজা। বস্তুত শৈব হওয়ার অপরাধে ব্ৰহ্মাবাদী বর্ণাশ্রমধর্মী জাতিভেদপ্রধান সমাজ-সংস্থাপক আর্যসমাজে রাবণ ব্রাত্য হন। রাম-রাবণের সংঘাত আদতেই আর ভার্সেস আর্যের সংঘাত। শিব আর ব্রহ্মার বিবাদ। আদিতে শিব অনার্য দেবতা, পশুপতি। শিব রাবণের সহায়ক ছিলেন। যতদিন শিব রাবণের সহায়ক ছিলেন, ততদিনই রাবণ অপরাজেয় ছিলেন। যেদিন থেকে অনার্য দেবতা শিবকে আর্ব দেবতারা নিজেদের দলে টেনে নিলেন (আর্য দেবতারা শুধু টেনেই নিলেন না, তাঁকে ‘মহাদেব’ ‘মহেশ্বর’ শিরোপা দিয়ে ব্রহ্মা আর বিষ্ণুর সঙ্গে এক পংক্তিতে বসালেন), সেইদিন থেকে রাবণের পতন ধীরে ধীরে অনিবার্য হয়ে উঠল।
রাবণ মহাকাব্য ও পুরাণে বর্ণিত লঙ্কা দ্বীপের রাজা। এই লঙ্কা কি বর্তমানের শ্রীলঙ্কা? শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে রাবণ তথা স্বর্ণলঙ্কার কোনো ইতিহাস পাওয়া যায় না। রামায়ণে উল্লিখিত রাবণের দেশ লঙ্কা আজকের শ্রীলঙ্কা কি না তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যেও বিতর্ক আছে। দক্ষিণ সমুদ্রের তীরে ত্রিকুট নামে একটি পর্বতের কথা জানা যায়। তার কাছে আরেকটি পর্বত, নাম সুবল। ওই পাহাড়ের উপর লঙ্কা নির্মাণ করেছিলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা। অতএব লঙ্কা যে সমুদ্রের ভিতর কোনো দ্বীপ বা বর্তমানের শ্রীলঙ্কা নয় একথা স্পষ্ট। তবে জম্মু-কাশ্মীরেও একটি ত্রিকুট পর্বতের সন্ধান পাওয়া যায়। এটির গুহায় বৈষ্ণোদেবীর মন্দির।
