চন্দ্রাবতী রামায়ণে আছে দেবতাদের চমকিয়ে রাবণ যখন লঙ্কায় ফিরল, সে সময় প্রভূত পরিমাণে দেবকন্যা অপহরণ করে নিয়ে এসেছিল। তাঁদেরকে নিয়ে অশোকবনে ফুর্তি করতে লাগল। এই কথা শুনে মন্দোদরী মনঃকষ্টে বিষপান করল। বিষপান করলেও মৃত্যু হয়নি, হল গর্ভবতী। দশমাস পর তিনি ডিম প্রসব করলেন। এই ঘটনায় গণকেরা নিদান দিল এই ডিম রাক্ষসদের ধ্বংস করবে। অতএব ধ্বংস করো। একথা শুনে মন্দোদরী কান্নায় ভেঙে পড়লেন এবং রাবণকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যাতে ডিমটি ধ্বংস না-করে যেন সোনা-রুপোর খাঁচায় বন্দি করে সমুদ্রে ফেলে দেয়। যেই কথা সেই কাজ। ডিমটি সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হল। একদিন গরীব জেলে মাধবের জালে সেদিন কোনো মাছ ধরা পরে না। হঠাৎ তাঁর জালে এই সোনা-রুপোর খাঁচায় ভরা ডিম পায়। সোনা-রুপো বিক্রি করে বড়লোক হয় সে। মাধবের বউয়ের নাম সতা। সতা স্বপ্ন দেখে ডিমের ভিতরে এক নারী আছে, যে তাকে বলছে জনকের কাছে নিয়ে যেতে, জনক তার পিতা। এইভাবে সীতার জন্ম। সতার নামে মিলিয়ে তার নাম সীতা রাখা হয়। তবে সীতা যাঁর গর্ভে যেখানে যেভাবেই জন্মাক না-কেন, প্রাপ্তি কিন্তু হলকর্ষণেই। এ ব্যাপারে সব কবিই একমত।
কবিবর বাল্মীকি রাবণ কর্তৃক সীতার অপহরণের সময় যে বর্ণনা দিয়েছিলেন, তাও বিবেচনা করার বিষয়–“সীতা রাবণ কর্তৃক ধর্ষিতা হলে স্থাবর ও জঙ্গম প্রাণীগণ সহ সমগ্র পৃথিবী মর্যাদাবিহীন ও ভীষণ অন্ধকারে আড়াল হল। সেখানে বায়ুপ্রবাহ স্তব্ধ হল এবং সূর্য নিষ্প্রভ হল। ব্রহ্মা দিব্যচক্ষে সীতাকে রাবণ কর্তৃক ধর্ষিতা হতে দেখে ‘কার্যসিদ্ধি হল’ বলেন।” তবে একথা মনে রাখা দরকার, প্রজাবৎসল রাজা রামচন্দ্র প্রজাদের সন্দেহ দূর করতে সীতাকে আগুনের ভিতর ঠেলে দিলেও, সে সময় রাম বলেছিলেন–
“ন চ শক্ত স দুষ্টাত্মা মনসাপি চ মৈথিলীম্।
প্ৰধর্ষয়িতুমপ্রাপ্যাং দীপ্তমগ্নিশিখামিব৷৷”
এই সংলাপে সীতাকে যে দুষ্টাত্মা ধর্ষণ করতে পারেনি সেই আত্মবিশ্বাস পরিলক্ষিত হলেও, এই রামই যখন অবলীলায় সীতার উদ্দেশে বলে ফেলেন ‘কুকুরে চাটা ঘি’, তখন বিস্ময়াভিভূত হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। লঙ্কাকাণ্ডের ১১৭ তম সর্গে ১৩ থেকে ২৪ নম্বর শ্লোক পর্যন্ত সীতাকে রাম যে ঘৃণ্য ভাষায় অপমান করেছেন, আক্রমণ করেছেন, তা কোনো আদর্শ মানবের কাছ থেকে আশা করা যায় না। একজন প্রাণপ্রিয় স্বামীর কাছ থেকে এহেন আচরণ একজন পতিব্রতা স্ত্রীর কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এ ঘটনায় সীতা এতটাই আহত হয়েছিলেন যে তা প্রকাশে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি।
হে পাঠক, সীতার কথা শুনুন–
“বীর, ভদ্রেতর ব্যক্তি যে ভাষায় আর্যেতর নারীকে বলে থাকে, সেই ভাষাতে কেন আমাকে এমন নিদারুণ রূঢ় বাক্য শোনাচ্ছেন? আপনি আমাকে যেমনটা ভাবছেন, আমি তেমনটা নই। আমি আমার চরিত্রের দিব্যি দিয়ে বলছি, আপনি আমাকে বিশ্বাস করুন। আর্যেতরা সাধারণী নারীর চরিত্র দেখে আপনি স্ত্রীজাতির উপর আশঙ্কা করছেন, কিন্তু আপনি অনেকবার পরীক্ষা করেছেন। সুতরাং এ আশঙ্কা পরিহার করুন। আমি আত্মবশে না থাকায় রাবণের সঙ্গে আমার যে শরীরের স্পর্শ ঘটেছিল, তা আমার ইচ্ছাকৃত নয়। অপরাধী সে তো দৈবই। যা আমার অধীন, সেই হৃদয় তো কেউ স্পর্শ করতে পারেনি। সেই হৃদয় আপনার জন্যই সমানভাবেই অনুরাগী আছে। কিন্তু শরীর আমার বশীভূত নয়, অতএব রক্ষক না-থাকায় রাবণ তা স্পর্শ করেছে। এতে আমার দোষ কোথায়? হায়, বহুদিন একসঙ্গে থেকে আমাদের উভয়ের অনুরাগ একসময় তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আপনি যে তাতেও আমার চরিত্রকে বুঝতে পারেননি, তাতেই আমি প্রচণ্ড দুঃখ প্রাপ্ত হয়েছি। আপনি যখন লঙ্কায় হনুমানকে পাঠিয়েছিলেন আমাকে দেখতে, তখনই কেন সেদিন আমাকে প্রত্যাখ্যান করেননি? হনুমান আমাকে আপনার সেই প্রত্যাখ্যানের খবর শোনালে আমি সেই মুহূর্তেই প্ৰাণত্যাগ করতাম। তাহলে আপনাকে আর প্রাণসংশয় হয় এমন যুদ্ধশ্রম করতে হত না।”
এরপর সীতা লক্ষ্মণকে আদেশ করলেন–
“সৌমিত্রে, এমন মিথ্যা অপবাদগ্রস্ত হয়ে আমি আর প্রাণধারণ করতে চাই না। এখনই চিতা প্রস্তুত করো, চিতাই আমার এই বিপদের একমাত্র ওষুধ। স্বামী আমার গুণে অসন্তুষ্ট হয়ে লোকজনদের মধ্যে আমাকে ত্যাগ করলেন। সুতরাং এক্ষুনি আগুনে প্রবেশ করে আমার কর্ম অনুসারে মুক্তিপ্রাপ্ত হই।”
এত কথার পরেও বরফ গলেনি। স্ত্রীর শরীরে অগ্নিসংযোগ করা হলই। স্বামী রাম গো-হারা হারলেন, কলঙ্কিত হলেন, তিরস্কৃত হলেন, নিন্দনীয় হলেন–রাজা রাম সার্থক হলেন, প্রজানুরঞ্জক হলেন, রামরাজত্ব দৃষ্টান্ত হল। বস্তুত এই অগ্নিপরীক্ষা নাট্যাংশে কী ঘটেছিল? অনেক গবেষক বলেন–সীতাবদল। হ্যাঁ, সীতাবদলই হয়েছিল। সবার সামনেই তা ঘটেছিল। যজ্ঞকুণ্ডও প্রজ্জ্বলিত হল। রাম যাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে বললেন তিনি সীতা নন, বেদবতী। যে বেদবতীকে রাবণ অপহরণ করে লঙ্কায় এনেছিলেন। রাম উদ্ধার করেছেন বেদবতীকে, সীতাকে নয়। যাই হোক, যাঁরা বদলাবদলি করে বেদবতীকে পঞ্চবটিতে রেখে সীতাকে নিয়ে গিয়েছিলেন নিরাপদ স্থানে, তাঁরাই এখন প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ডের পিছনে বেদবতীকে সরিয়ে সীতাকে আবির্ভূত করালেন অগ্নি পদাধিকারী ব্যক্তিটি। এ সব ঘটনাই লক্ষ্মণ, বিভীষণ, হনুমান চাক্ষুষ করলেও প্রকাশ্যে কিছু বলার সাহস পাননি। বাল্মীকি তাঁর বর্ণনায় স্পষ্ট করেছেন দুই নারীর উপস্থিতি। বেদবতীর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন ‘নীলকুঞ্চিতকেশা’, আর সীতার বর্ণনা বলেছেন ‘কেশকলাপ কৃষ্ণ ও কুঞ্চিত’। রামও বেদবতীকে ‘ভদ্রে’ (madam) সম্বোধন করেছেন।
