তাঁর সংগ্রহে সবর্ণেরই নারী নয়, জাতিবর্ণনির্বিশেষে নারীরা আছেন–“রাজর্ষি-বিপ্র-দৈত্যানাং গন্ধর্বনাঞ্চ ঘোষিতঃ।” তা সত্ত্বেও রাবণের বিশ্বস্ত অনুচর মহাপার্শ্ব লঙ্কাকাণ্ডের ১৩ তম সর্গে রাবণকে স্পষ্টত বলেছিলেন–
“হে মহাবল, যদি রমণকালে সীতা আপনার অনুকূল না-হয়, তাহলে আপনি কুকুটবৃত্তিতে অর্থাৎ বলপ্রয়োগ করে আক্রমণ করবেন, তাকে উপভোগ ও রমণ করুন।” (বলাৎ কুকুটবৃত্তেন প্রবর্তস্ব মহাবল।/আত্রুম্যাক্রম্য সীতাং বৈ তাং ভুং চ রমস্য চ) রাবণ নিজেও বলেছেন–
“দ্বৌ মাসৌ রক্ষিতবৌমে যো অবধিন্তে ময়াকৃতঃ।
ততঃ শয়নমারোহ মম ত্বং বরবৰ্ণিনি।”
অন্যথা হলে খণ্ড খণ্ড করে কেটে খাওয়ার কথাও বলা হয়েছে–
“দ্বাভ্যামূর্ধন্তু মাসাভ্যাং ভর্তারং মামনিচ্ছতীম্।
মম ত্বাং প্রাতরাশার্থে সূদাচ্ছেৎস্যন্তি খণ্ডশঃ।”
অপহৃত হয়ে সীতাও রাবণকে বলেছিলেন–তুই আমাকে ধর্ষণ করেছিস। সেই হেতু তোর নিজের, রাক্ষসদের এবং অন্তঃপুরের বিনাশকাল আসছেই। “মাং প্রধৃষ্য স তে প্রাপ্তো অয়ং রাসসাধম্।/আত্মনো রাক্ষসানাঞ্চ বধায়ান্তঃপুরস্য চ।” রাবণের স্ত্রী মন্দোদরীও লঙ্কাকাণ্ডের ১১৩ তম সর্গে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছেন–
“তদৈব যন্ন দগ্ধস্তং ধর্ষংস্তনুধম্যমাম্।
দেবা বিভ্যতি তে সর্বে সেন্দ্রাঃ সাগ্নিপুনরাগমাঃ।”
অর্থাৎ তুমি যে সেই জানকী ধর্ষণ করতে করতেই দগ্ধ হওনি, তার কারণ ইন্দ্রাদি দেবগণও তোমাকে ভয় করে চলেন। মন্দোদরী বিলক্ষণ জানতেন রাবণের চরম ‘আলুর দোষ আছে। সীতা ছাড়া অন্য কোনো নারীদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করার দোষে মন্দোদরী রাবণকে তিরস্কার করেছেন এমন কোনো কাহিনি জানা নেই। যদিও সে যুগে ব্রাহ্মণ আর রাজরাজড়াদের একাধিক নারীসঙ্গ নিন্দিত ছিল না–তার উপর রাবণ কেবল রাজাই ছিলেন না, তিনি চতুর্বেদী ব্রাহ্মণও ছিলেন। তবে রাবণ পূর্বে যাঁকেই ধর্ষণ করুন-না কেন, সীতাকে ধর্ষণ করার উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। উদ্দেশ্য কী ছিল, সেটা বরং রাবণের মুখ থেকেই শোনা যাক। সীতা অপহরণের অব্যবহিত পরেই নিজেকে ছদ্মবেশ মুক্ত করে রাবণ বলছেন–আমি বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক নারী এনেছি, তুমি আমার মহিষী হয়ে তাঁদের সকলের প্রধান হও। তুমি যদি আমার স্ত্রী হও, তবে সবরকমের অলংকার ভূষিতা ৫০০০ দাসী তোমার সেবা-পরিচর্যা করবে। মিলিয়ে নিন পাঠকবন্ধু–
“বীনামূত্তমন্ত্ৰিণামাহৃতানামিতস্ততঃ।
সর্বাত্ৰামেষ ভদ্রং তে মমার্গমহিষী ভব।
… পঞ্চ দাস্যঃ সহস্রাণি সর্বাভরণভূষিতাঃ।
সীতে পরিচারষ্যন্তি ভার্যা ভবসি মে যদি।”
রাবণকে মানুষ যতটা ‘ছোটোলোক’ ভাবেন, রাবণ ঠিক ততটা ছোটোলোক নন। সেই উদারতা নিয়ে উত্তরকাণ্ডের ৪৬ সর্গে মহাতেজা অগস্ত্য কী বলছেন সেটাও জেনে নিতে পারি–
“লঙ্কামানায় যত্নেন মাতেব পরিরক্ষিতা।
এবমেতৎ সমাখ্যাতং তব রাম মহাযশ।”
অর্থাৎ, রাবণ সীতাকে লঙ্কায় এনে সযত্নে মায়ের মতো সবরকমভাবে রক্ষা করেছিলেন। মহাযশা রাম, এই সমস্ত বিবরণ তোমার কাছে বর্ণনা করলাম। কম্বনের রামায়ণে রাবণ সীতাকে অপহরণ করেননি, বলপ্রয়োগ করেননি, স্পর্শ করেননি–যেমনভাবে বাল্মীকি রাবণ কর্তৃক সীতাকে অপহরণ করিয়েছেন। কম্বন রামায়ণে রাবণ সীতাকে স্পর্শ না-করে যেখানে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন সেখানকার মাটি সমেত তাঁকে তুলে নিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, কোনো আকাশযানে নয়। রাবণ যাকে অপহরণ করেছিলেন তিনি আসল সীতা নন, মানে রক্তমাংসের নারী নন। মায়া-সীতা।
রাবণ যেদিন অপহরণ করেছিলেন সেদিন থেকেই অশোকবনে রাখেন। কিন্তু হরিশঙ্কর জলদাস এক লেখায় বলেছেন–সীতাকে অপহরণের পর রাবণ তাঁর নিজ প্রাসাদের সবাইকে বাইরে বের করে দিয়ে এক রাত্রি সীতার সঙ্গে থাকে। তার পরের দিন মন্দোদরীর তীব্র বাধায় সীতাকে অশোকবনে সরিয়ে দেয়। মন্দোদরী যে জবরদোস্ত বাধা দিয়েছিল তা প্রায় সব রামায়ণেই পাওয়া যায়। বাধা দিয়েছিল কেন? শুধুই কি একজন নারী অপমানিত হচ্ছিল বলে বাধা? নাকি তাঁর মুখের আদলের সঙ্গে সীতার মুখের আদলে মিল পাওয়া গিয়েছিল বলে! রাবণ কেন তড়িঘড়ি অশোকবনে সীতাকে রেখে এসেছিল? রাবণের সঙ্গে সীতার সম্পর্ক কি সেটা মন্দোদরী রাবণকে বলে দিয়েছিলেন? অশোকবনে রাখার পর রাবণ কিন্তু ভুলেও একবারের জন্যেও সীতাকে স্পর্শ করেননি। হনুমানও কিন্তু লঙ্কায় পৌঁছে দূর থেকে মন্দোদরীকে সীতা বলে ভুল করেছিল। যদিও বেশিরভাগ রামায়ণ থেকে জানা যায় সীতা অপহরণের পর সুগ্রীবের সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রাক্কালে হনুমানের সঙ্গে পরিচয় হয়। অর্থাৎ তার আগে সীতাকে দেখার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু খটকা লাগে যে কারণে, সেটা হল, যদি পূর্ব-পরিচয় না-ই থাকে তবে রাম-লক্ষ্মণের সঙ্গে হনুমানের যে সম্পর্ক এবং আনুগত্য পরিলক্ষিত হয়, তাতে তো অন্য রহস্য আছে মনে হয়। না-হলে সুগ্রীবের আদেশ পেয়ে রাম-লক্ষ্মণকে দেখে ভক্ত হয়ে যায় কোন্ আদরে! যে হনুমানের বয়সের গাছপাথর নেই, যাকে মহাভারতেও দেখা মেলে–তাঁর কাছে যে সীতার সঙ্গে পূর্ব-পরিচয় থাকবে না, তা মেনে নেওয়া কঠিন। সেই কারণেই সীতার আদলের সঙ্গে মন্দোদরীর আদল গুলিয়ে ফেলছিল হনুমান। মেয়ের সঙ্গে মায়ের চেহারা মিল থাকাটা তো অস্বাভাবিক নয়।
