রামচন্দ্রের এই মহাযজ্ঞে বিভিন্ন দেশের রাজনগণ, মুনিঋষিগণও নানাবিধ উপহার নিয়ে এলেন। মহাকবি বাল্মীকিও এসেছিলেন লব-কুশ সহ তাঁর অন্যান্য শিষ্যদের নিয়ে। উদ্দেশ্য, সমগ্র রামগান শোনানো। তদুপরি ঋষিবর বাল্মীকি লব-কুশকে পইপই করে বলে দিলেন–
“যদি পৃচ্ছেৎ স্ কাকুৎস্থে যুবাং কস্যেতি দারকৌ।
বাল্মীকেরথ শিষ্যৌ ঘৌ ব্রতমেবন্নরাধিপম্।”
অর্থাৎ, “রামচন্দ্র যদি তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করে তোমরা কার পুত্র, তাহলে বলবে–আমরা বাল্মীকির শিষ্য।” একসময় রাম জানতে পারেন লব-কুশ সীতারই সন্তান। অতঃপর তিনি আশ্রমের শুদ্ধাচারী দূতদের বললেন–
“তোমরা ভগবান বাল্মীকির কাছে গিয়ে বলল, জানকীর চরিত্র যদি বিশুদ্ধ এবং নিষ্পাপ হয় তাহলে তিনি মহর্ষির অনুমতি নিয়ে তাঁর বিশুদ্ধতার পরিচয় দিন। সীতা যদি বিশুদ্ধতার প্রমাণ দিতে সম্মত হন তাহলে আগামীকাল প্রভাতেই তিনি সভামধ্যে শপথ করুন।”
হাড় হিম হয়ে আসা পরিবেশ, পরিস্থিতি! পরে ঋষিবর বাল্মীকি সীতাকে মহাযজ্ঞানুষ্ঠানের আসরে এনে উপস্থিত জনসমূহের মধ্যে বললেন–
“দাশরথি রাম! সীতা পতিব্রতা ধৰ্মচারিণী হলেও তুমি লোকনিন্দার ভয়ে তাঁকে আমার আশ্রমে ত্যাগ করেছিলে। লোকাপবাদের ভয়ে ভীত তুমি। অতএব যাতে লোকপবাদ দূর হয়, সীতা তোমাকে এমন প্রত্যয় দেবেন। রাম, তুমি অনুমতি দাও। আমি সত্য বলছি–“জানকীর গর্ভজাত এই দুর্ধর্ষ যমজসন্তান তোমারই পুত্র। আমি শপথ করে বলছি–যদি সীতা দুশ্চরিত্রা হন, তবে আমার বহু সহস্র বছরের তপস্যার ফল সব নষ্ট হবে। জানকী যদি নিষ্পাপ হন, তাহলে আমি কায়মনোবাক্যে যে পাপকর্ম করিনি তার ফলভোগ করব।”
এসব কথা শুনে রাম বললেন–
“এই যমজ সন্তান লব ও কুশ আমারই, আমি জানি।”
তা সত্ত্বেও রাম তাঁর সতীত্ব তথা বিশুদ্ধতার পরীক্ষার আয়োজন করলেন। সীতা কিন্তু সে সুযোগ রামকে আর দেননি। বল এবার সীতার কোর্টে। অনেক হয়েছে, আর নয়! এসময় বিভীষণ নেই, বিভীষণের মায়াবলও নেই। সীতাকে রক্ষা করার মতো কেউ নেই অযোধ্যায়। অশ্রুসজল চোখে সীতা বসুন্ধরাকে আহ্বান করলেন–
“যথাহং রাঘবাদন্যং মনসাপি ন চিন্তয়ে।
তথা মে মাধবী দেবী বিবরং দাতুমহতি।
মনসা কমণা বাঁচা যথা রামং সমৰ্চয়ে।
তথা মে মাধবী দেবী বিবরং দাতুমহতি।”
সীতার চরিত্র নিয়ে প্রজাদের সামনে নিন্দা শুরু হলে লজ্জায় ও ক্ষোভে সীতা পাতালে প্রবেশ করেন। নারীকে এভাবে অপমান করার মতো বাড়াবাড়িটা উত্তরকাণ্ডের কবি না-করলেই পারতেন!
অগ্নিপরীক্ষার ব্যাপারে একটি মত পাওয়া যায়। সেই মতানুসারে আমরা দেখব অগ্নিপরীক্ষা ব্যাপারটা কেমন? দাউদাউ জ্বলতে থাকা লেলিহান শিখার ভিতর প্রবেশ করা? তারপর পূণ্যবান ব্যক্তির সেই আগুনের ভিতর থেকে অবিকৃতরূপে বেরিয়ে আসা? একদম না। বিষ্ণুসংহিতায় একাদশ অধ্যায়ে অগ্নিপরীক্ষা ব্যাপারটা স্পষ্ট করেছে। পণ্ডিতপ্রবর শ্রীমনোনীত সেনের ভাষায় বলি–
“অগ্নিপরীক্ষার কথা কথিত হইতেছে। ষোড়শ-অঙ্গুলি-পরিমিত ষোড়শ-অঙ্গুলি অন্তর অন্তর সাতটি মণ্ডল করিবে। অনন্তর পূর্বমুখপ্রসারিত-বাহু অভিযুক্ত ব্যক্তির করদ্বয়ে সাতটি অশত্থাপত্র দিবে। দুই হস্তের সহিত সেই সকল পত্র সূত্র দ্বারা বেষ্টন করিবে। তৎপরে, অর্থাৎ পত্ৰাচ্ছাদিত হস্তদ্বয়ে পঞ্চাশৎপল-পরিমিত সমতল অগ্নিবর্ণ জ্বলন্ত লৌহপিণ্ড স্থাপন করিবে। (অভিযুক্ত ব্যক্তি) তাহা লইয়া সেই সকল মণ্ডলে নাতিশীঘ্র-নাতিবিলম্বিতভাবে পদক্ষেপ করত গমন করিবে। তৎপশ্চাৎ সপ্তম মণ্ডল পার হইয়া হস্তস্থিত লৌহপিণ্ড ভূমিতে ফেলিয়া দিবে। যে ব্যক্তির দুই হাতের মধ্যে কোন স্থল দগ্ধ হয়, তাহাকে অশুদ্ধ বলিয়া নির্দেশ করিবে। আর যে ব্যক্তি সর্বথা অদগ্ধ, সেই ব্যক্তি বিশুদ্ধ হইবে। যে ব্যক্তি ভয়ক্রমে লৌহপিণ্ড ফেলিয়া দেয়, অথবা যে ব্যক্তি দগ্ধ হইল কি না ঠিক করা যায় না, শপথক্রিয়ার অশুদ্ধিবশতঃ অর্থাৎ তাহা ঠিক না হওয়ায় তাহাকে পুনর্বার লৌহপিণ্ড গ্রহণ করিতে হইবে, অভিযুক্ত ব্যক্তি উভয় কর দ্বারা ব্রীহি মর্দন করিলে তাহার উভয় করতল অগ্রেই (অর্থাৎ অশ্বথপত্র দিবার পূর্বেই) লক্ষ্য করিবে (কোনো চিহ্ন আছে কি না দেখিবে)। অনন্তর মন্ত্রপাঠ করিয়া ইহার (অর্থাৎ অভিযুক্ত পুরুষের হস্তদ্বয়ে লৌহপিণ্ড (স্থাপন কর্তব্য। হে অগ্নি! তুমি সাক্ষীর ন্যায় সর্বভূতের অন্তরে বিচরণ করিতেছ; অতএব হে অগ্নি! যাহা মনুষ্যের অজ্ঞাত, তাহা তুমিই অবগত আছ। ব্যবহারস্থলে আরোপিত কলঙ্ক হইতে এই মনুষ্য শুদ্ধি আকাঙ্ক্ষা করিতেছে, অতএব ইহাকে এই সংশয় হইতে ধর্মতঃ পরিত্রাণ করা তোমার উচিত।”
সীতা কি সত্যিই ধর্ষিতা হয়েছিল? নাকি কেবলই অপবাদ! অমন পিলে চমকানো সুন্দরী রমণীকে দীর্ঘ দশ মাস নিজের কবজায় পেয়েও ‘দুঃশ্চরিত্র’, কামুক’ ও ‘ধর্ষকামী’ রাবণ ছেড়ে দিল! একথা ঠিক যে, বাল্মীকি বলেছেন সীতার চেয়েও পরমা সুন্দরী নারী রাবণের অন্দরমহল ভরপুর ছিল। প্রধানা মহিষী মন্দোদরীও ডাকসাইটে সুন্দরী। সুন্দরী নারী সংগ্রহে রাবণের জুড়ি মেলা ভার। সেইসব সুন্দরীদের দেখে হনুমানের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া–
“ন তত্র কাশ্চিৎ প্রমদা প্ৰসহ্য, বীর্যোপপন্নেন গুণেন লন্ধা।”
