পাশাপাশি ঐতিহাসিকভাবে যুগটার কথাও মনে রাখতে হবে। সেটা হল, সীতাকে জানছেন রামায়ণের যুগে। রামায়ণের যুগ ও মহাভারতের যুগ–দুইয়ের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান। এই দুই যুগের দুই মহাকাব্যের নিরিখে যদি তুলনা করি তাহলে দেখব–রামায়ণের যুগে (ত্রেতা) নারীর একাধিক পতিত্ব এবং পরপুরুষের সঙ্গে যৌনসংসর্গ ছিল নিষিদ্ধ ও নিন্দনীয়। রামায়ণের নারীরা পরপুরুষ থেকে শতহস্ত দূরে অবস্থান করেন। জান দেবেন কিন্তু মান দেবেন না। সীতাও সম্মত হননি রাবণের বিলাস-বৈভবে ভেসে যেতে। রাবণের কোলে সীতা ধর্ষিতা হয়েছেন এমন সন্দেহ যদি রামের মতো পুরুষের হয়, যদি সীতা ধর্ষিতাও হন–যা যথাসাধ্য গোপন রাখাই সেই সমাজের রীতি। রামায়ণের কবিরা সেই চেষ্টা সর্বত্র করেছেন। রক্ষণশীল সমাজে নারীরা বিয়ের আগে তো দূরের কথা বিয়ের পরেও অন্য কোনো পুরুষের অঙ্গশায়িনী হয়ে গর্ভবতী হতে পারতেন না। পুরুষও সন্তানদানে অক্ষম হলে তাও গোপন রাখার প্রয়াস ছিল। তাই দশরথের পুত্রলাভের ব্যাপারটায় অলৌকিকতার প্রলেপ দিতে হয়েছে। রামায়ণের কাহিনি নিয়ে রচিত কালিদাসের ‘রঘুবংশম্’-এও দিলীপ সুদক্ষিণার পুত্রলাভের ঘটনাতেও অলৌকিকতা প্রদান করা হয়েছে। সত্য চেপে দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে মহাভারতের যুগে (দ্বাপর) এসে অনেকটাই খুল্লামখুল্লা। এ যুগে এত রাখঢাক নেই। নিয়োগপ্রথার প্রয়োগ মহাভারতের যুগে এসে ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। পরপুরষে যৌনসংসর্গ ব্যাপারটা বেশ খোলাখুলিই। এমনকি বিয়ের আগে যৌনসংসর্গও গ্রহণযোগ্য। ধরুন সত্যবতীর কথা। সত্যবতী অবিবাহিত সময়ে পরাশরের সঙ্গে নির্জনে যৌনসংসর্গ করে গর্ভবতী হয়েছিলেন। গর্ভের সেই সন্তানই কৃষ্ণদ্বৈপায়ন, দ্বৈপায়ন ব্যাস। সমাজ স্বীকৃত সন্তান, যিনি মহাভারতকার। তারপরেও সত্যবতীর প্রেমে পড়ে এবং তাঁকে বিয়ে করতে শান্তনুর কোনো সংস্কারে বাধেনি। সত্যবতাঁকে কখনোই তিনি বলেননি ‘কুকুরে চাটা ঘি’ ভোগ করা যাবে না সত্যবতাঁকে। রামায়ণের যুগে রাম কিন্তু সীতাকে লঙ্কা ফিরিয়ে আনার পর সীতাকে বলেছিলেন–“তুমি সচ্চরিত্রই হও আর অসচ্চরিত্রই হও, মৈথিলি, তোমাকে আমি ভোগ করতে পারি না, (তুমি) যেন কুকুরে চাটা ঘি।” না, এ ব্যাপারে শান্তনুর কোনো সমস্যা হয়নি। মৎস্যগন্ধা’ সুন্দরী সত্যবতীর মোহে স্বপুত্র ভীষ্মকে রাজ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত করলেন। ভীষ্মকেই শুধু বঞ্চিত করলেন না, ভীষ্মের কোনো বংশধরই রাজ্যের অধিকার দাবি করতে না-পারেন সে ব্যবস্থাও করে ফেললেন। ভীষ্ম চিরব্রহ্মচারী পালন করলেন। সত্যবতীর দই পুত্র বিচিত্রবীর্য ও চিত্রাঙ্গদের যখন অকালমৃত্যু হল তখন সত্যবতীর স্বপ্নকে পূরণ করতে ভীষ্মকে অনুরোধ করলেন তিনি যেন তার দুই পুত্রবধু অম্বিকা ও অম্বালিকার সঙ্গে যৌনসংসর্গ করে সন্তান দেন। সত্যবতী কাকে অনুরোধ করছেন, যিনি শান্তনু-গঙ্গার সন্তান ভীষ্ম। শান্তনু-গঙ্গার সন্তান ভীষ্মকে সত্যবতী অনুরোধ করছেন। শান্তনু-সত্যবতীর পুত্রবধুদের যৌনসংসর্গ করতে। সত্যবতী বিমাতা হলেও ভীষ্মের মা তো! কারণ রাজসিংহাসনের দাবিদার তো একমাত্র সত্যবতীর পুত্রেরই। তো পুত্রদের অকালমৃত্যু হয়েছে বলে হাল ছাড়লে চলবে! যে কোনো উপায়েই হোক নাতিই এখন শেষ ভরসা। কিন্তু ভীষ্ম প্রত্যাখ্যান করলে ভীষ্মেরই পরামর্শে সত্যবতী অগত্যা তাঁর কুমারীকালের জন্ম-দেওয়া বুড়োপুত্র দ্বৈপায়নকে দিয়ে অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে সন্তান রোপন করালেন। দ্বৈপায়নও অম্বিকা ও অম্বালিকাকে নারাজ সত্ত্বেও গর্ভবতী তো করালেনই, উপরি হিসাবে এক অজ্ঞাতনামা দাসীকেও একই সঙ্গে গর্ভবতী করে দিলেন। সেই পুত্ররাই হলেন যথাক্রমে ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুর। মহাভারতে এরকম ঘটনা অজস্র আছে, উল্লেখে শেষ করা যাবে না। মহাভারতকার কোনোরূপ লুকোছাপা করে এসব ঘটনায় বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। কারোর কোনো ছুৎমার্গ নেই। কিন্তু রামায়ণে বাল্মীকি এমন ঘটনা ঘটলেও জাহির করে বলার সাহস পাননি। কিন্তু ঘটনাগুলি যে ঘটেনি সে কথা জোর দিয়ে বলা যায় না, সেগুলি আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে তা স্পষ্টতই অনুমিত হয়। এসব কর্ম করতে মহাভারতে নীতির আগমার্কা ছাপ পেলেও, রামায়ণে কিন্তু তা এক অতি ভয়ংকর অপরাধ। ফলে সীতার প্রতি রামের তিরস্কার, অপমান, অবমাননার বিষয়গুলি এযুগের নিরিখে ভাবলে হবে না–রামায়ণের যুগটাকে স্বীকার করতে হবে।
সীতাকে বিসর্জনের পর রাম মহাসমারোহে এক বিরাট যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সীতাবর্জনের পর রামের কোনোরূপ অপরাধবোধ সৃষ্টি হয়নি, বিমর্ষ হয়ে পড়েননি, বিন্দুমাত্র যন্ত্রণাকাতর হননি। সীতাকে ফিরিয়ে আনা যায় কীভাবে সে ব্যাপারেও তিনি ভাবিত ছিলেন না। ত্যাগ মানে ত্যাগই! সীতার সতীত্ব প্রসঙ্গে সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর রামায়ণের সমালোচনা নিবন্ধে লিখেছেন–
“ভারতবর্ষীয় স্ত্রীলোক যে, স্বভাবতই অসতী, এই সীতার ব্যবহারই তাহার উত্তম প্রমাণ। সীতা যেমন গৃহের বাহির হইল, অমনই অন্য পুরুষ ভজনা করিল। রামকে ত্যাগ করিয়া রাবণের সঙ্গে লঙ্কায় রাজ্যভোগ করিতে গেল। নির্বোধ রাম পথে পথে কাঁদিয়া বেড়াইতে লাগিল। হিন্দুরা এই জন্যই স্ত্রীলোকদিগকে গৃহের বাহির করে না।”
