“কীদৃশং হৃদয়ে তব সীতাসম্ভোগজং সুখ।
অঙ্কমারোপ্য তু পুরা রাবণেন বলাক্বতাম্।”
অর্থাৎ “রাবণ যাকে অঙ্কে আরোপণ করে সবলে হরণ করেছিল, সেই সীতার সম্ভোগে তোমার হৃদয়ে কেমন সুখ হয়?”
এই হল রাম, ভারতের রাজা রাম। সীতার প্রতি রামচন্দ্রের এহেন আচরণে যদি ভেবে বসেন যে, সীতার প্রতি রামের বিন্দুমাত্র প্রেম ছিল না, তাহলে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বরং বলা যায়, রাম-সীতার প্রেম এতটাই ছিল যে, যা অত্যন্ত বিরল। বিবাহের পর থেকে পঞ্চবটিতে সীতার অপহরণের আগে পর্যন্ত রামের প্রেম অবিসংবাদিত। অরণ্যযাপনকালে খাবার, পানীয় ভাগ করে খাওয়াসহ সোনার হরিণ অসম্ভব অবাস্তব বুঝেও সীতাকে খুশি দেখতে ছুটে গিয়েছিলেন বিপদের ঝুঁকি নিয়ে।
উত্তরকাণ্ড থেকে জানা যায়, বাল্মীকির আশ্রমে সীতার নির্বাসন হওয়ার কিছুদিন পরেই সীতার দুই পুত্র সন্তান–লব ও কুশের জন্ম হয়। সে পুত্রযুগল জন্মেছিল তখন নাকি রামচন্দ্রের বিবাহের তেপ্পান্ন বছর পর (বাস্তব ১২ + ১৪ = ২৬ বছর পর)। বছরের এ হিসেবটা প্রিয় পাঠকদের কাছে একটু বেমানান বোধ হতে পারে। তাই বছরগুলির একটা হিসাব দিচ্ছি। বিবাহন্তে রামচন্দ্র গৃহবাসী ছিলেন ১২ বছর, বনবাসী ১৪ বছর এবং গৃহে প্রত্যাবর্তন করে রাজাসনে কাটান নাকি ২৭ বছর (ওই ২৭ বছর উদ্দেশ্যমূলক, কাল্পনিক)। এরপর ‘কলঙ্কিনী বলে অন্তঃসত্ত্বা সীতাকে নির্বাসিত করা হয় বাল্মীকির তপোবনে। সেখানই লব ও কুশের জন্ম হয় বলে উত্তরকাণ্ডে বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ সীতাদেবী বন্ধ্যা ছিলেন না এবং উক্ত তেপ্পান্ন বছরের মধ্যে বনবাসকালের। দশ মাস (অশোককাননে রাবণের হাতে সীতা বন্দিনী ছিলেন ১০ মাস) ছাড়া বাহান্ন বছর দু-মাস সীতা ছিলেন রামচন্দ্রের অঙ্কশায়িনী। অন্য হিসাবে সীতার যখন গর্ভসঞ্চার হয় তখন তাঁর বয়স ছিল (১৮+১২+১৪+২৭) ৭১ বছর, মতান্তরে (৬+১২+১৪+২৭) ৫৯ বছর। বাস্তবিক কোনো নারী এই বয়সে গর্ভধারণ করতে পারেন না। নারীর গর্ভধারণের সময় কিছু কমবেশি ১২ বছর থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। মেনোপোজ বা পিরিয়ড বন্ধ হয়ে গেলে কোনো নারীর পক্ষেই সন্তানধারণ সম্ভব নয়। এ ভুল মহাকবি বাল্মীকি করতে পারেন না। তাহলে প্রাচীনযুগে নারীর মেনোপোজ আরও দেরিতে আসত! না, তা নিশ্চয়ই নয়। চরক সেকথা বলছেন না। তা ছাড়া অনেক গবেষক মনে করেন, লব-কুশ চরিত্র দুটি বাল্মীকি সৃষ্টি করেননি, প্রয়োজনও মনে করেননি। আষাঢ়ে গল্প বানাতে গিয়ে উত্তরকাণ্ডের কবি এই বিপত্তি ঘটিয়েছেন। কারণ তিনি জানতেন না চিকিৎসার জনক চরক কী বলেছেন–
“দ্বাদশাদ্বৎসরাদূর্ধমা পঞ্চাশৎসমাঃ স্ত্রীয়ঃ।/মাসি মাসি ভগদ্বারা প্রকৃত্যৈবার্তবংসেবেৎ”
অর্থাৎ “স্ত্রীলোকের ১২ বছর বয়স থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত স্বভাবতই প্রতিমাসে তিনদিন করে আর্তব (রজঃ) যযানিমুখ দিয়ে প্রশ্রুত হয়। এ সময়কালেই গর্ভধানের উপযুক্ত সময়, এই সময়কালের আগে বা পরে নয়। এরপর কলঙ্কিনী’ বলে অন্তঃসত্ত্বা সীতাকে নির্বাসিত করা হয় বাল্মীকির তপোবনে। সেখানই লব ও কুশের জন্ম হয় বলে উত্তরকাণ্ডে বর্ণিত হয়েছে।
রামচন্দ্রের সন্তানের ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন–“সন্তান কামনা করে না, এমন কোনো লোক বা জীবজগতে নেই। কারও সন্তান না-থাকলে তার দুঃখের অবধি থাকে না; বিশেষত ধনিক পরিবারে। আর রাজ্যেশ্বর রামচন্দ্রের বৈবাহিক জীবনের দীর্ঘ ২৬ বছর পরে আসন্ন সন্তান পরিত্যাগ করলেন শুধু কি প্রজাদের মনোরঞ্জনের জন্য? নিশ্চয়ই তা নয়। তিনি জানতেন যে, সীতার গর্ভস্থ সন্তান তাঁর ঔরসজাত নয়, ঔরসজাত রাবণের। আর সংগত কারণেই সীতার গর্ভজাত সন্তানের প্রতি তাঁর কোনো মায়ামমতা ছিল না, বরং ছিল ঘৃণা ও অবজ্ঞা। তাই তিনি সীতা-সুতের কোনো খোঁজখবর নেননি বহু বছর যাবৎ। বিশেষত ঋষি বাল্মীকির আশ্রম অযোধ্যা থেকে বেশি দূরেও ছিল না, সেই আশ্রম তিনি চিনতেন। অতঃপর সীতাসহ কুশ-লব বিনা নিমন্ত্রণে (বাল্মীকির নিমন্ত্রণও ছিল) ঋষি বাল্মীকির সঙ্গে শ্রীরামের অশ্বমেধ যজ্ঞে উপস্থিত হয়ে যেদিন রামায়ণ কীর্তন করে, সেদিন কুশ-লবের মনোরম কান্তি ও স্বরে-সুরে মুগ্ধ হয়ে রামচন্দ্র তাদের দত্তকরূপে গ্রহণ করেন। হয়তো তখন তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে, ঘটনাক্রমে ফেলনা হলেও ছেলে দুটো (কুশ-লব) রাজপুত্র তো বটে। কুশ-লবকে গ্রহণ করলেও সীতাকে গ্রহণ করেননি রামচন্দ্র সেদিনও। সীতাদেবী হয়তো আশা করেছিলেন যে, বহু বছরান্তে পুত্ররত্ন-সহ রাজপুরীতে এসে এবার তিনি সমাদর পাবেন। কিন্তু তা তিনি পাননি, বিকল্পে পেয়েছিলেন যত অনাদর-অবজ্ঞা। তাই তিনি ক্ষোভে-দুঃখে হয়তো আত্মহত্যা করেছিলেন। নারীহত্যার অপবাদ লুকোনোর উদ্দেশ্যে এবং ঘটনাটি বাইরে প্রকাশ পাওয়ার ভয়ে শোনে দাহ করা হয়নি সীতার শবদেহটি, হয়তো লুকিয়ে গ্রোথিত করা হয়েছিল মাটির গর্তে। আর তা-ই প্রচারিত হয়েছে–“স্বেচ্ছায় সীতাদেবীর ভূগর্ভে প্রবেশ বলে। সে যা হোক, অযোধ্যেশ্বর রাম ও লঙ্কেশ্বর রাবণের সন্তান-সন্ততি সম্বন্ধে পযালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, রাবণ ছিলেন শত শত সন্তানের জনক, আর রামের ছিল না একটিও পুত্র। তিনি ছিলেন ‘আঁটকুড়ো’। লঙ্কেশ্বর রাবণের যাবতীয় গুণগরিমা ও সৌরভ-গৌরব গুপ্ত রাখার হীন প্রচেষ্টার মুখ্য কারণ–তিনি আধ্যাত্মবাদী ছিলেন না, ছিলেন জড়বাদী বিজ্ঞানী। বিশেষত তিনি আর্যদলের লোক ছিলেন না, ছিলেন অনার্যদলের লোক।” এরূপ অনুমান করা হয়তো সংগত নয়। সীতা রাবণকে কতটা ঘৃণা করতেন তা অশোকবনে সীতা রাবণের কথোপকথন থেকে জানা যায়। আসলে রামের সঙ্গে সীতার মিলন হয়েছিল বনবাস ছেড়ে অযোধ্যায় ফিরে আসার পরে। এইসব ঘটনা উত্তরকাণ্ডে আছে। রাম নিজে বহু বছর সীতার সঙ্গে মিলন করার পর নিজে সীতাকে গর্ভবতী দেখে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। যদি লব-কুশ রাবণের ছেলে হত, তাহলে লঙ্কায় সীতার উদ্ধারের সময়ই রাম সীতার গর্ভলক্ষণ দেখতে পেতেন। তা তিনি পাননি। সুতরাং ওরা যে রাবণের ছেলে নয় তা অনুমান করাই যায়।
