বিবাহের সময় সীতার স্তন কেমন পুষ্ট হয়েছিল সেটাও উল্লেখ করেছেন মুনিবর বাল্মীকি–“স্তনৌ চাবিরলৌ পীনৌ মগ্নচুচুকৌ”। এহেন স্তন কখনোই ছয় বছর বয়সে হতে পারে না। লঙ্কাকাণ্ডে ৪৮ তম সর্গে সীতার নিজের মুখে তাঁর শরীর ও উদ্ভিন্ন যৌবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করেছেন, বলেছেন–
“আমার কেশসকল সূক্ষ্ম, সমান নীলাবর্ণ। জ্বজোড়া পরস্পর অসংশ্লিষ্ট। জঙ্ঘাদ্বয় সুগোল এবং লোমহীন। দন্ত সকল বিরল। কটাক্ষ, চোখ, হাতজোড়া, পাজোড়া, গোড়ালি, উরুদ্বয় পরস্পর সংযুক্ত। আমার সবকটি আঙ্গুলের মধ্যভাগ হল অক্ষ ও আনুভূমিক, বর্তুলনখশোভিত। আমার স্তনজোড়া পরস্পর অসংসক্ত পীন ও উন্নত এবং স্তনের বোঁটা দুটি মধ্যনিমগ্ন। অধিকন্তু আমার স্তন নিকটবর্তী পার্শ্বদেশ ও বক্ষঃস্থল বিশাল, নাভিপার্শ্ব উন্নত ও সুগভীর।”
অপ্রাসঙ্গিক হলেও জেনে রাখা যায়–আদিকাণ্ডে রামের জীবনের ১৫/১৬ বছরের কথা, অযোধ্যা কাণ্ডে রামের জীবনের অনুমান ১ সপ্তাহের কথা, কিকিন্ধ্যাকাণ্ডে অনুমান ১০ মাস, সুন্দরকাণ্ডে মাসাধিক কাল এবং লঙ্কাকাণ্ডে মাসাধিক সময়ের কথা বর্ণিত হয়েছে।
রামচন্দ্র চোদ্দো বছরের জন্য বনবাসে গেলে সীতা তাঁর সঙ্গী হন। মনে রাখতে হবে, কেবলমাত্র রামকেই চোদ্দো বছরের জন্য বনবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সীতা ও লক্ষ্মণ স্বেচ্ছায় রামের সঙ্গে বনবাসে গিয়েছিলেন। লক্ষ্মণ তো রামের সঙ্গী হবেনই, এটা লক্ষ্মণের কর্তব্য। নতুন কিছু ব্যাপার নয়। কিন্তু সীতা কেন রামের সঙ্গী হলেন? সীতা রামের পিছু নিলে, রাম সীতাকে জঙ্গলের বিপদের কথা বর্ণনা করেছিলেন। বলেছিলেন–বন নয়, অযোধ্যায় অবস্থান করে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করে জীবন কাটিয়ে দাও। রাজা ভরতের অনুবর্তিনী হয়ে থাকো। একথার উত্তরে সীতা রামকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন–
“ন পিতা নাত্মজো নাত্মা ন মাতা ন সখীজনঃ … কিমিদং ভাষষে রাম বাক্যাং লঘুতয়া ধ্রুবম্। .. স্ক্রিয়ং পুরুষবিগ্রহ। … শৈলুষ ইব মাং রাম পরেভ্যো দাতুমিচ্ছসি। … ত্বং তস্য ভব বশ্যশ্চ বিধেয়শ্চ সদানঘ।”
এ থেকে প্রমাণ হয় সীতা মিনমিনে মুখচোরা ছিলেন না, রীতিমতো মুখরাই ছিলেন। স্পষ্ট কথা স্পষ্ট করে বলে দিতেন সীতা। একথা যেমন রামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনি রাবণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রাম কিংবা রাবণ–কারোকেই তিনি ছেড়ে কথা বলেননি।
নিয়ম অনুসারে বনে বাসের জন্য রাজপপাশাক ত্যাগ করে মুনি-পরিধেয় চীর ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ গাছের ছাল পরে থাকতে হবে। সীতার ঘোরতর আপত্তি থাকলেও লক্ষ্মণ রামের অনুসরণে বিধিসম্মতভাবেই চীরবসন ধারণ করেন। এবং এই চীরবসন দশরথের সামনেই গ্রহণ করেন। কিন্তু কৌশেয়-সীতা চীরবসন দেখে আঁতকে উঠলেন। ভীত হয়ে পড়লেন। এই এক চিলতে গাছের ছালে একজন উদ্ভিন্নযৌবনা নারীর লজ্জা নিবারণ হবে কীভাবে! বাষ্পপূর্ণ চোখে স্বামী রামের কাছে তাঁর কৌতূহল প্রকাশ করলেন–বনবাসীরা কীভাবে এই বসন পরিধান করেন? রাম স্বয়ং সীতার অঙ্গে কৌশেয় বসনের উপরেই চীরবসন বন্ধনের চেষ্টা করতে থাকেন। এ দৃশ্য দেখে কুলগুরু বশিষ্ঠ বললেন “যেহেতু সীতা এই বনবাসে নিযুক্ত হননি, তাই তাঁর চীরবসনও অনাবশ্যক।” ব্রাহ্মণ যা বলেন, তাই-ই বিধান (আইন)। অতএব চীরসনকে সরিয়ে দিয়ে উত্তম আভরণ ও বসন পরিধানের ব্যবস্থা করে দিলেন। বনবাস যাত্রায় সীতা অলংকারে সেজে উঠুক, সেটা স্বয়ং দশরথই অনুমোদন করেছিলেন। স্বয়ং দশরথই কোষাধ্যক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিলেন–
“বাসাংসি চ বরাহণি ভূষণানি মহান্তি চ।
বর্ষাণ্যেতানি সংখ্যায় বৈদেহ্যাঃ ক্ষিপ্রমানয়।
নরেন্দ্রেণৈবমুক্তস্তু গত্বা কোশগৃহং ততঃ।
প্রাযচ্ছৎ সর্বহৃত্য সীতায়ৈ ক্ষিপ্রমেব তৎ।
সা সুজাতা সুজাতানি বৈদেহী প্রস্থিতা বনম্।
ভূষয়ামাস গাত্রাণি তৈর্বিচিত্রৈবিভূষণৈঃ।
ব্যরাজয়ত বৈদেহী বেশ্ম তৎ সুবিভূষিতা।
উদ্যতোহংশুমতঃ কালে খংপ্রভেব বিবস্বতঃ।”
কোশাধ্যক্ষ নরেন্দ্র দশরথ কর্তৃক মহামূল্য বসন ও উৎকৃষ্ট ভূষণ আনার ব্যবস্থা করা হল এবং মহামূল্যবান অলংকারে সেজে উঠলেন সীতা। অযোধ্যাকাণ্ডের ৩৯ তম সর্গ পাঠ করে দেখতে পারেন। রামের সহধর্মিনী সীতাদেবী রাজবধূর বেশবিন্যাস ত্যাগ করে রাম-লক্ষ্মণের মতো গাছেল ছাল পরিধান করেছিলেন, এমন কথা মহাকবি বাল্মীকি কোথাও বলেননি। পতিব্রতার সংজ্ঞা বদলে নাকি!
রাবণ সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার সময় এই অলংকারগুলো ছড়ানোর কাজে লাগিয়েছিল, যা দেখে রাম-লক্ষ্মণ বিপদের আন্দাজ করতে পেরেছিল। সোনার অলংকারের চেয়ে নিজের প্রাণ ও মান উভয়ই দামি। বলাই বাহুল্য, এই সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় নিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করেই রাম ও রাবণের মধ্যে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। তাঁকে উদ্ধার করতেই রাম, লক্ষ্মণ, সুগ্রীব, হনুমানের যারপরনাই উদ্যোগ সহ বিশাল বাহিনী লংকা আক্রমণ ও লঙ্কা ধ্বংস করে। সীতাকে উদ্ধারের পরেও স্বয়ং রাম লঙ্কাতেই সীতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সীতার চরিত্রের পবিত্রতা প্রমাণের জন্য রাম অগ্নিপরীক্ষার আয়োজন করেন। অগ্নিপরীক্ষার অংশ হিসাবে সীতাকে অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করতে হয়। সীতা ‘সতীসাধ্বী’ হলে আগুন তাঁর কোনো ক্ষতি করবে না, এটাই প্রমাণ করানোর চেষ্টা। অপমানের পর অপমানিত হয়েছেন সীতা। লক্ষ্মণ এবং বাইরের লোক বিভীষণ, সুগ্রীব, হনুমান, জাম্ববান ও বানরদের সামনেই সীতা অপমানিত হলেন স্বামী রামের দ্বারা, যাচ্ছেতাইভাবে মাথা নিচু হয়ে গেল সীতার। উপস্থিত অসংখ্য অনার্যদের সামনে আর্যভার্যার এই অপমান কারোর জন্যই সহনীয় হতে পারে না। সীতা আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণ করতে চাইলেন। ভাবলেশহীন রাম সীতার সেই ইচ্ছাকে অনুমোদন দিলেন, সীতা লক্ষ্মণকে চিতা সাজানোর আদেশ দিলেন। জ্বলন্ত চিতায় সীতা প্রবেশ করলেন, কিন্তু তিনি দগ্ধ হলেন না। অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমে সীতার চরিত্রের পবিত্রতা প্রমাণ হলে রামচন্দ্র সীতাকে অযোধ্যায় নিয়ে যান। অগ্নিপরীক্ষা প্রসঙ্গে পণ্ডিত হরপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য–
