কাহিনিগুলি থেকে জানা যায়, সেই জঙ্গলে বা জলে বা জমিতে পরিত্যাগ করা সন্তানটি ছিল কন্যা। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলছে। আজও কন্যাসন্তান জঙ্গলে-আস্তাকুড়ে-ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে যায় স্বয়ং মা, কিংবা বাবা কিংবা মা-বাবা উভয়ই। পরিত্যক্ত কন্যাসন্তান যত্রতত্র কুড়িয়ে পাওয়া যায়–বর্তমানেও এটা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, অতীতেও ছিল না। কার্তিক, শকুন্তলা, কৃপ, কৃপীর মতো অজস্র ‘নাজায়েজ’ সন্তান কুড়িয়ে পাওয়ার ঘটনা আমরা জানি।
নারী-পুরুষের যৌনমিলন (শুক্রাণু ও ডিম্বাণু) ছাড়া কখনোই সন্তান উৎপাদন সম্ভব নয়। অতীতেও হয়নি, বর্তমানেও হয় না, ভবিষ্যতেও হবে না। যিনি জন্মেছেন তিনি অবশ্যই নারী-পুরুষের যৌনমিলনের ফলেই জন্মেছেন। তা বৈধ পথেই হোক বা অবৈধ পথে? ‘অযোনিস্যুতা’ একটি মিথ্যাচারের নাম, সত্য লুকোনোর পথ। এখনও অনেককে বলতে শুনি অমুক ঠাকুরবাড়ির কলা-পড়া খেয়ে নাকি অমুক গর্ভবতী হয়েছে। আরে ভাই, কলা-পড়া খেয়েই যদি গর্ভবতী হওয়া যায়, তাহলে যৌনমিলনের আর প্রয়োজন কী! পটাপট কলা খেয়ে নিলেই তো হয়। কত নিঃসন্তান দম্পতি একটি সন্তানের জন্য কত কীই-না করে বেড়ান, ধরে ধরে কলা খাইয়ে দিলেই তো হয়!
‘লাঙ্গল’ কথাটি এখানে গভীর দ্যোতনাবাহী। কেননা সংস্কৃতে ‘লাঙ্গল’ শব্দটি একদিকে যেমন ভূমিকৰ্ষণের যান্ত্রিক রূপ, তেমনই তা পুরুষের লিঙ্গকেও বোঝায়। লাঙ্গল’ শব্দটি প্রতীকী অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। ফুলের মতো কমনীয় ও গৌরবর্ণা হওয়ার কারণেই জনকদুহিতার নাম সিতা’। অভিধানকার বামন শিবরাম আপ্তের অভিধানে ‘সি’ শব্দের অর্থ মনোরমা স্ত্রী (a graceful woman) বলা হয়েছে। সত্যকে আড়াল করে সীতার জন্মকে গূঢ় রহস্যাবৃত করা হয়েছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই। কারণ রামচন্দ্র যখন ভগবান, ভগবান নারায়ণের অংশ তখন তাঁর স্ত্রী কুড়িয়ে পাওয়া, অজ্ঞাত পরিচয়, অতি সাধারণ, এটা হজম করা যায় কীভাবে! সুতরাং ‘অযোনিজ’ কল্পনা জারিয়ে নিজের বক্তব্যকে ‘সত্যগন্ধী করে তুলতেই ‘সি’ রূপান্তরে সীতা’য় বদলে যায়। জনকরাজা সীরধ্বজ নিজের মুখেই সে কথা বলছেন। বলছেন বরকর্তা বিশ্বামিত্রকে–“বীর্যশুক্লেতি মে কন্যা স্থাপিতেয়মযোনিজা।/ভূতিলাদুখিতাং তান্তু বর্ধমানাং মমাত্মজাম্।”
সীতার জন্মেতিহাস বাল্মীকি রামায়ণে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সেটির খোঁজ করতে হবে পরবর্তী পুরাণগুলিতে। কারণ দেবতার ভাবমূর্তিকে রক্ষার জন্য সীতার লক্ষ্মীস্বরূপী একটি মূর্তি গড়া হয়েছে সেখানেই। যেমন স্কন্দপুরাণে বলা হয়েছে–
“পুরা ত্রেতাযুগে পুণ্যে রাবণং হতবানহম্।
তদা বেদবতী কন্যা সাহায্যমকররাচ্ছিয়ঃ।
সীতারূপাভবল্লক্ষ্মীর্জনকস্য মহীতলাৎ।”
একসময় রাক্ষসদের হত্যা করার জন্য বিশ্বামিত্র ঋষির রামকে মনে পড়ল। অভিযোগ, রাক্ষসদের উপদ্রবে তাঁরা যজ্ঞ সম্পাদন করতে পারছিলেন না। হত্যাকার্য সম্পাদনের জন্য ঋষি বিশ্বামিত্র দশরথের কাছ থেকে রামকে ১০ দিনের জন্য চাইলেন। রামের বয়স তখন মাত্র ১৫। দশরথ শঙ্কিত হলেন, বললেন–
“উনষোড়শবর্ষো মে রামমা রাজীবলোচনঃ।
ন যুদ্ধযোগ্যতামস্য পশ্যামি সহ রাক্ষসৈঃ।”
দশরথের একথা শুনে বিশ্বামিত্র ক্রোধে জ্বলে উঠল। এতটাই সেই ক্রোধ যে, পৃথিবী কম্পিত হল, দেবতারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। অবশেষে দশরথ বিশ্বামিত্রের হাতে রামকে সঁপে দিলেন। কৃত্তিবাস অবশ্য রাম-লক্ষ্মণকে বিশ্বামিত্রের সঙ্গে ভয়ংকর সব রাক্ষসবধ করতে পাঠাননি, পাঠিয়েছেন ভরত-শত্রুঘ্নকে। অর্থাৎ গিনিপিগ হওয়ার জন্য ভরত-শত্রুঘ্নই আদর্শ। অর্থাৎ ভরত-শত্রুঘ্নদের চেয়ে রাম-লক্ষ্মণের জীবনের দাম অনেক গুণ বেশি। এই ভাবনা বাল্মীকির সঙ্গে কৃত্তিবাসের খুব মিলে যায়।
যাই হোক, নয়দিন ব্যাপী কয়েকশো রাক্ষস-খোক্ষস হত্যা করে দশম দিনে মিথিলায় উপস্থিত হলেন এবং এগারোতম দিনে সীতাকে স্ত্রী হিসাবে লাভ করেন। রামায়ণের আদি কাণ্ডের ৬৬ তম সর্গে জানা যায়, বিবাহের পূর্বেই সীতা যৌবনাসম্পন্নাই ছিলেন। এমনকি বিবাহের বয়সের থেকে আরও দুই বছর অতিক্রান্ত হয়েছিল। মহাভারতের আদিপর্বের ৬৪ অধ্যায়ে উল্লেখ আছে, সে সময় যৌবনাবস্থায় পদার্পণ না করলে কেউ বিয়ে করত না। বিয়ের সময়ে সীতার বয়স যখন ১৮ ছিল, তখন রামের বয়স ১৫। অর্থাৎ রামের চাইতে সীতা ৩ বছরের বড়ো। সীতার বিয়ের পর ইক্ষ্বাকু বংশে ১২ বছর সংসার করার পর রামের সঙ্গে ১৪ বছর বনবাস যাপন। অরণ্যকাণ্ডে ৪৭ তম সর্গে সীতা রাবণকে বলছেন–
“উষিত্বা দ্বাদশ সমা ইক্ষ্বাকুণাং নিবেশনে।
ভুঞ্জানা মানুষ ভোগা সর্বকামসমৃদ্ধিনী।”
রামায়ণে রাম ও সীতার বয়স নিয়ে বিস্তর গোলমেলে ব্যাপার আছে। অনেক বলেন রাম যখন সীতার পাণিগ্রহণ করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ১৩ বছর, আর সীতার বয়স ৬। কোনটি গ্রহণীয়, কোনটি বর্জনীয় তা পণ্ডিতগণ ভাবুন–আমি সেই জটিলতায় যেতে চাই না। তবে এটুকু বলতে চাই–৬ বছর বয়সি একটি মেয়েকে স্ত্রী হিসাবে পাওয়ার জন্য পরাক্রমশালী রাজরাজড়ারা দেশ-দেশান্তর থেকে মিথিলায় জমায়েত হয়েছেন, একথা বিশ্বাসযোগ্য হয় কি? এ যুগে নিশ্চয় বিশ্বাসযোগ্য নয়, অতি প্রাচীন এমন ঘটনা তো আকছারই ঘটত। সমাজে যখন গৌরীদানে অক্ষয় স্বর্গপ্রাপ্তি এবং কন্যার একাদশ বয়সে না-হলে মাতা-পিতা এবং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নরকে যাওয়ার বন্দোবস্ত হয়ে যায়, এমন প্রথার প্রচলন আছে। অপরাপর পুরাণ গ্রন্থগুলিতে সীতার বয়স কখনো ৬, কখনো ৮ বছর লিপিবদ্ধ হয়েছে।
