“প্রকৃত প্রস্তাবে যা ঘটেছিল তা অনেকটা এইরকম বলে অনুমান করা যায় : রামচন্দ্র চিতা প্রস্তুতের আজ্ঞা দিলে লক্ষ্মণ ও অন্যান্যরা রুষ্ট হয়েছিলেন। তারা সরাসরি রামের ইচ্ছায় বাধা দিতে পারেননি বটে, কিন্তু সুকৌশলে মৃত্যুর হাত থেকে সীতাকে রক্ষা করেছিলেন। রাক্ষসেরা জাদুবিদ্যায় পারদর্শী ছিল। মায়া সীতা, মায়া রামের কাহিনি রামায়ণের যুদ্ধকাণ্ডে এইভাবে উল্লিখিত আছে : রাবণের আহ্বানে বিদ্যুৎজ্জিত্ব রামের মায়ামুণ্ড, শরাসন সীতার সামনে নিক্ষেপ করেছিল। সীতা রামের ছিন্নমুণ্ড ও ধনুক স্বচক্ষে দেখলেন।…সীতা এই মায়ামূর্তিকে রামচন্দ্র বলে বিশ্বাস করেছিলেন। রাক্ষসরা এই মায়ামূর্তি নির্মাণে এমনই পারদর্শী ছিল যে, ওই মায়ামুণ্ড রামের নয়–সীতার পক্ষেও বোঝা সম্ভব হয়নি। শুধু তাই নয়, রথের উপর ইন্দ্রজিৎ সমস্ত বানরসৈনদের সামনে মায়াসীতা বধ করেছিলেন। হনুমান খুব ভালোভাবেই সীতাকে চিনতেন। তা সত্ত্বেও প্রবল সাদৃশ্যের জন্য তিনি এই মায়াসীতা’কে প্রকৃত সীতা বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু রাক্ষস বিভীষণ বিভ্রান্ত হননি। প্রকৃত ব্যাপার তার অজানা ছিল না। … রাক্ষসরা মায়ামূর্তি নির্মাণে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। এই পটভূমিকায় ধরে নেওয়া বোধহয় অসংগত হবে না, সীতার অগ্নিপ্রবেশের ব্যাপারটি সাজানো এবং সে ব্যাপারে রাক্ষসরাজ বিভীষণ অগ্রণীর ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁরই নির্দেশে সীতার পরিবর্তে রাক্ষস-নির্মিত আর-একটি ‘মায়াসীতাকে চিতায় প্রবেশ করানো হয়েছিল।”
পূর্বেই বিভীষণ অনুমান করে নিতে পেরেছিলেন পরপুরুষের কাছে থাকা স্ত্রী সীতাকে স্বামী হিসাবে রাম কী চোখে দেখবেন। রাম যে সীতার ঘৃণার চোখে দেখবেন সেটা অনুমান করেই বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভেবে রেখেছিলেন বিভীষণ।
কিন্তু পরবর্তীতে আবারও সীতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রশ্ন ওঠে অযোধ্যায় পৌঁছোনোর পর। রামচন্দ্রের কাহিনিকারের মতে চোদ্দো বছর বনবাসান্তে রামচন্দ্র দেশে প্রত্যাবর্তন করে নির্বিঘ্নে সংসারধর্ম তথা রাজ্যশাসন করেছিলেন দীর্ঘ ২৭ (?) বছর। অতঃপর প্রজাবিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল। কেননা লঙ্কার অশোককাননে বন্দিনী থাকাকালীন রাবণ সীতাদেবীর অঙ্গ স্পর্শ করে সতীত্ব নষ্ট করেছিলেন এবং অসতী সীতাকে গৃহে স্থান দেওয়ায় প্রজাগণ ছিল অসন্তুষ্ট। উপরোক্ত বিবরণটি শুনে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্নের উদয় হয় যে, মরার দু-যুগের পরে শোকের কান্না কেন? বনবাসান্তে রামচন্দ্র স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলে তাঁর বনবাসের বিবরণ তথা লঙ্কাকাণ্ড দেশময় ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর দেশে ফেরার সংগে সঙ্গেই এবং সীতাকলঙ্কের কানাকানিও চলছিল দেশময় তখন থেকেই। আর গুজবের ভিত্তিতে সীতাকে নির্বাসিত করতে হলে তা করা তখনই ছিল সংগত। তাহলে দীর্ঘ ২৭ বছর পর কেন? তারাকান্ত কাব্যতীর্থকৃত মূল বাল্মীকি রামায়ণের বঙ্গানুবাদে বলা আছে রাম বহুবছর সীতার সঙ্গে বিহার করে ও রাজ্যপালন করে কাটালেন। ২৭ বছর করেছিলেন তা কিন্তু বলা নেই। যাই হোক, রাম সীতাকে আবারও বনবাসে পাঠান এবং কোনোরূপ বিবেচনা না-করেই (“তস্মাত্ত্বং গচ্ছ সৌমিত্রে নাত্ৰ কাৰ্য্যা বিচারণা।/অপ্রীতিৰ্হি পরা মহং ত্বয়ৈতৎ প্রতিবারিতে।”)। রামের আদেশানুসারে লক্ষ্মণ পরদিনই ভোরে নৌকোযোগে তমসা নদীর তীরে বাল্মীকির আশ্রমে পরিত্যাগ করে আসেন। ফেরার সময় লক্ষ্মণের উদ্দেশ্যে সীতা তাঁর অপমানের কথা গোপন রাখেননি, বুক-ফাটা যন্ত্রণা নিয়ে তিনি বলেছেন–“লক্ষ্মণ! আমার গর্ভে সন্তান বড়ো হচ্ছে, এক্ষণে প্রাণত্যাগ করলে আমার স্বামীর বংশলোপ হবে। তা না-হলে আজই জাহ্নবীর জলে প্রাণ বিসর্জন করতাম (“ন খন্বদ্যৈব সৌমিত্রে জীবিতং জাহ্নবীজলে।ত্যজেয়ং রাজবংশস্তু ভর্তুর্মে পরিহাস্যতে।”)। নারীর এই মর্মভেদী যন্ত্রণা এই অপমান রামভক্তদের হৃদয়ে পৌঁছোয় না। প্রাণত্যাগ, অর্থাৎ আত্মহত্যার ইচ্ছা আরও-একবার প্রকাশ করেছেন সীতা, উত্তরকাণ্ডে–“চিতাং মে কুরু সৌমিত্রে ব্যসনস্যাম্য ভেষজম্।/মিথ্যাপবাদোপহতা নাহং জীবিতুমুৎসহে।/অপ্রীতেন গুণৈর্ভর্তা ত্যক্তায়া জনসংসদি।/যা ক্ষমা মে গতির্গন্তুং প্রবেক্ষ্যে হব্যবাহন।” (সৌমিত্রে! এমন মিথ্যাপবাদগ্ৰস্তা হয়ে আমি আর প্রাণধারণ করতে ইচ্ছা করি না। এখনই চিতাই আমার এই ঘোরতর বিপদকালের একমাত্র ওষুধ। অতএব তুমি চিতা প্রস্তুত করো। স্বামী আমার গুণে অসন্তুষ্ট হয়ে জনগণের মধ্যেই আমাকে পরিত্যাগ করলেন। সুতরাং আমি এখনই আগুনে প্রবেশ করে আমার কর্মানুরূপ গতি লাভ করতে প্রস্তুত।) লক্ষ করুন পাঠক, সীতাদেবী দু-বার প্রাণত্যাগ ইচ্ছা পোষণ করেছেন, দু-বারই দেবর লক্ষ্মণের কাছে–স্বামী রামের কাছে নয়।
স্বামী রামের চোখে সীতা কেমন ছিল? কার হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন সীতা? দেখুন কয়েকটা নমুনা–মেঘনাদের শক্তিশেল খেয়ে লক্ষ্মণ যখন অজ্ঞান হয়ে ভূলুণ্ঠিত হলেন, তখন রাম বিলাপ করতে থাকলেন–
“প্রাণ পেয়ে সীতা পেরে কী লাভ আমার? মর্তলোকে খুঁজলে সীতার মতো নারী আরও পাওয়া যাবে। কিন্তু লক্ষ্মণের মত সচিব ও যোদ্ধা ভাতা কোথাও পাওয়া যাবে না।”
এখানেই শেষ নয়, রাম আরও বলেন–
