রামায়ণ অনুসারে, সীতা পৃথিবীর কন্যা এবং জনকের পালিতা কন্যা। জনক কারোর নাম নয়, জনকপুর থেকে জনক–দেশের নাম। আধুনিক নেপালের দক্ষিণ সীমান্ত এবং পাটনার প্রায় চল্লিশ ক্রোশ উত্তর-পূর্বে জনকপুর অবস্থিত। মিথিলার রাজাদেরকে ‘জনক’ উপাধিতে সম্মানিত করা হত। সীতার পালিত পিতা জনকপুরার রাজার নাম সীরধ্বজ (ধর্মধ্বজ?)। কেউ বলেন জানকীকুণ্ড নামে একটি পুকুরের কাছে মিথিলেশ্বর সীতাকে পেয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন সীতামাড়ীর তিন মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে পনৌড়া গ্রামে ‘জনক’ সীরধ্বজ সীতাকে পেয়েছিলেন। রামায়ণে বর্ণিত আছে, ক্ষেত্ৰকৰ্ষণকালে জনকরাজা সীরধ্বজ লাঙ্গলের ফালে এক কন্যাশিশু পান। এই ক্ষেত্ৰকৰ্ষণকে বলে ‘লাঙ্গল-পদ্ধতি। লাঙ্গল-পদ্ধতির অন্য নাম ‘সীতা। সীতার জন্মসূত্রকে রহস্যাবৃত রেখে বলা হয়েছে যে সীতা ‘অযোনিজা’। মহাভারতের টীকাকার নীলকণ্ঠ বলেছেন–
“ত্বষ্টা প্রজাপতিঃ স্বয়মেব সঙ্কল্পেন চকার, ন তু মৈথুনদ্বারা, অযোনিজাম্ ইত্যর্থ।
সীতা যে অযোনিজা, তার কোনো সমর্থন অন্য রামায়ণে মেলে না। এই মুহূর্তে মন্দোদরীর দুটো কাহিনি উল্লেখ করতে পারি। এক, মন্দোদরীর প্রথম সন্তান ছিল বিয়ের আগে। যাকে সে জঙ্গলে ফেলে এসে রাবণকে বিয়ে করে। দুই, রাবণকে বিয়ের পরেই সে প্রথম সন্তান। রাবণ আর মন্দোদরী দুইজনে পরামর্শ করে সেই সন্তানকে জঙ্গলে ফেলে আসে। সংস্কৃত ভাষায় রচিত ‘অদ্ভূত রামায়ণ’ গ্রন্থে এ বিষয়ে এক ব্যাপক গপ্পো আছে, সেটা একটু শোনাতে ইচ্ছে করছে–রাবণ ত্রিভুবন (স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল) জয় করে দণ্ডকারণ্যে (দাক্ষিণাত্যের পূর্বভাগ) অবস্থান করলেন। জয়ের দম্ভে এবার তাঁর মনে হল ঋষিদের পিছনে লাগলে কেমন হয়! এঁরা কেমন অগ্নিতেজী একটু চেখে দেখা যাক। যেই ভাবা সেই কাজ। না, তাঁদের হত্যা করার কথা ভাবলেন না, ঋষিদের শরীরে বাণের খোঁচা মেরে রক্তাক্ত করতে থাকলেন। শুধু রক্তাক্তই করলেন না, সেই রক্ত সংগ্রহ করে একটি কলসীতে ধারণ করলেন। কলসীটি কিন্তু পূর্বে ফাঁকা ছিল না, তাতে ছিল মন্ত্রপূত’ দুধ। এই মন্ত্রপূত দুধ সংগ্রহ করে রেখেছিলেন ঋষি গৃৎসমদ, ইনি শতপুত্রের পিতা। ইনি স্বয়ং লক্ষ্মীকে কন্যা হিসাবে পাওয়ার জন্যই সেই কলসীটিতেই প্রতিদিন মন্ত্রপূত দুধ সংগ্রহ করছিলেন, যেই কলসীটিতে রাবণ ঋষিদের রক্ত সংগ্রহ করছিলেন। যাই হোক, রাবণ তো এর দুধ মিশ্রিত রক্ত নিয়ে চলে এলেন লঙ্কায়। লঙ্কায় এসে রাবণ স্ত্রী মন্দোদরীকে পইপই করে বলে দিলেন–সাবধান গিন্নি, এই কলসীর ভিতর মুনিঋষিদের রক্ত আছে, যা বিষের থেকেও ভয়ংকর! এই বলে তিনি পর্বতে পর্বতে বেরিয়ে পড়লেন সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে কামকেলি করার জন্যে। এ ঘটনায় মন্দোদরীর খুব মনঃকষ্ট হল। দীর্ঘকাল যুদ্ধ করে ফেরার পর কোথায় তাঁর সঙ্গে আদর-সোহাগ করবে, সেখানে তাঁকে অবজ্ঞা করে অন্য মেয়েদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি! কষ্ট সহ্য করতে না-পেরে তিনি নিজের জীবন শেষ করে দেবেন ভাবলেন। অতএব হাতে আছে এই বিষের চেয়ে ভয়ংকর রক্ত, যা পান করলেই এক লহমায় মৃত্যু। উঁহু, মৃত্যু তো হলই না, উল্টে রক্ত পান করে মন্দোদরী গর্ভবতী হয়ে গেলেন–পান করার মুহূর্তেই পূর্ণমাস। লজ্জায়-ঘৃণায় তিনি তীর্থদর্শনের বাহানা দিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লেন। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলেন কুরুক্ষেত্রে, এখানেই তিনি গর্ভমুক্ত হলেন। কী করবেন তিনি এ সন্তান নিয়ে, অতএব ‘ফেক দে কাঁচড়া মে’। না, তিনি সদ্যোজাত সন্তানকে কাঁচড়াতে ফেলেননি, তিনি সেখানেই মাটি তে চাপা দিয়ে দিলেন সদ্যোজাতকে এবং কাছেই সরস্বতীর জলে স্নান সেরে শুদ্ধটি হয়ে বাড়ি ফিরলেন। মহারাজ জনক হলকর্ষণ করতে এসে তাঁর লাঙ্গলের উঠে এল একটি কন্যা সন্তান, নাম দিলেন সীতা।
পণ্ডিত নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী তাঁর ‘সীতা’ প্রবন্ধে লিখেছেন–
“ক্ষত্রিয় রাজা নিজে লাঙল হাতে কৃষিকার্য করছেন, এটা তৎকালীন সমাজে প্রায় অসম্ভব এক কল্পনা। বিশেষত খোদ রামায়ণের মধ্যেই যেখানে স্বধর্ম ত্যাগ করে শূদ্র শম্বুক ব্রাহ্মণোচিত তপস্যা করার জন্য শাস্তি লাভ করেন, সেখানে রাজর্ষি জনক ধর্মধ্বজ লাঙল দিয়ে জমির ফসলযোগ্যতা তৈরি করছেন, এটা খুব স্বাভাবিক কথা নয়, সমাজসংগত তো নয়ই সেকালের দিনের নিরিখে। জনক ধর্মধ্বজ এই ব্যবহারের মধ্যে যে একটা সামাজিক বৈপরীত্য আছে এবং সেটা যে আমরা ঠিক ধরেছি, তার প্রমাণ পাওয়া যাবে পরম্পরাবাহী রামায়ণ-টীকাকারদের চেষ্টাকৃত সমাধান-কল্পনার মধ্যে। ওঁরা বলেছেন–না, না, জনক ধর্মধ্বজ সাধারণ কৃষকের মতো লাঙল দিয়ে জমি চাষ করছিলেন না, তিনি অগ্নিচয়নের জন্য যজ্ঞভূমি কর্ষণ করছিলেন। টীকাকারেরা শাস্ত্র উদ্ধার করে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের কাছে যজ্ঞভূমির একটা অন্য মর্যাদা ছিল। যজ্ঞের জন্য যজ্ঞভূমি চাষ করাটা কোনো হেয় কাজ নয়, বিশেষত অগ্নিচয়নের জন্য এটা-ওটা শস্যেরও প্রয়োজন হত, অতএব তার জন্য একেবারে ছ-ছটা গোরু জুড়ে লাঙল হাতে চাষ করতে লজ্জা পেতেন না। ব্রাহ্মণেরা এবং রাজ-রাজড়ারাও। এখনকার পণ্ডিত গবেষকরা জানিয়েছেন যে, এই যজ্ঞভূমিতে লাঙল ছোঁয়ানোর ব্যাপারটা অনেকটাই প্রতীকী। কেননা ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের মতো উচ্চবর্ণের জাতকেরা জমি চাষ করার ব্যাপারটা খুব মর্যাদাসম্পন্ন মনে করতেন না। কিন্তু যজ্ঞভূমি বলে কথা, সেখানে যজ্ঞকর্মের মর্যাদায় একটু আধটু লাঙল ছুঁয়ে হলকর্ষণের আরম্ভটুকু করে দিলেই অধস্তন কৰ্ষক-চাষিরা লাঙল ধরে নিত। এত কথা বলছি। এই জন্য যে, সীতাকে জনক ধর্মধ্বজ নিজেই লাঙলের রেখাদীর্ণ ভূমিতে আবিষ্কার করেছিলেন, নাকি অন্য কেউ, নাকি তেমন কোনো কঠিন-হৃদয় মানুষ জনকের যজ্ঞভূমিতে রেখে গিয়েছিল এক শিশুকন্যাকে, সেই সন্দেহটা বড়ো প্রবল হয়ে ওঠে। অলৌকিকতায় বিশ্বাস করলে ঠিক আছে–তাহলে তো জনক ধর্মধ্বজের যজ্ঞভূমির মাটির তলায় এক শিশুকন্যা নিশ্বাসান্ধ অবস্থায় পড়ে ছিলেন, আর লাঙলের ফলায় নিচের মাটি উপরে উঠতেই পুরাতন প্রত্নমূর্তির মতো ভূমিকন্যা সীতা উঠে এলেন উপরে। ধর্মধ্বজ তাঁকে কোলে করে নিয়ে রানির কোলে দিলেন। ব্যস! নটে গাছ মুড়িয়ে গেল। কিন্তু ব্যাপারটা অত সহজ নয় বলেই এবং তেমন বিশ্বাসযোগ্য নয় বলেই হয়তো সীতার জন্ম নিয়ে এত গল্প, এত রহস্য তৈরি হয়েছে। রহস্য তৈরি হওয়ার মূল কারণ অবশ্যই এই যে, সীতা ধর্মধ্বজ জনকের নিজের মেয়ে নন।”
