“বর্বর রাক্ষস, তোর হাতে ধর্ষিত হয়ে আমি আর জীবিত থাকতে চাই না। তোর সবংশে নিধনের জন্য আমি কোনো ধার্মিকের গৃহে অযযানিজা কন্যা রূপে পুনরায় জন্ম নেব।”
সেই কন্যাই সীতা রূপে রামের ঘরে রামের স্ত্রী হলেন।
সীতার পূর্বজন্মের বেদবতীর সম্বন্ধে আর দু-চারটে কথা না বললেই নয়। বেদবতীও লক্ষ্মীর অবতার ছিলেন। বেদবতী বিষ্ণুর অপেক্ষায় ছিলেন আমৃত্যুকাল। বিষ্ণুকেই তিনি পতিরূপে কল্পনায় গ্রহণ করেছেন। বিষ্ণু ছাড়া তিনি আর কারোকেই পতি বলে স্বীকার করতে পারবেন না। বেদবতী অতীব সুন্দরী ছিলেন। কেমন সুন্দরী ছিলেন? শেখর সেনগুপ্ত বলেছেন–
“কৃষ্ণবর্ণ হরিণচর্মে উর্ধাঙ্গ ও নিম্নঙ্গ আচ্ছাদিত। প্রশস্ত জঘা, ক্ষীণ কটিদেশ, সুপক্ক আম্রের ন্যায় স্তনযুগল, বিশাল তৃষ্ণার্ত মেঘসমান কেশসম্ভার, দুই আয়ত লোচনে নারীর চিরন্তন প্রণয়তৃষ্ণা।”
জঙ্গলে যেসব রাজা-যক্ষ-দক্ষ-দৈত্য-দানো মৃগয়ায় আসতেন তারাই তপোবনের কন্যা দেখে মুগ্ধ হয়ে পড়তেন, কামসিক্ত হতেন। কেবল রাবণই নয়, এর আগে বহু পুরুষ বেদবতীকে কামনা করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। কারণ বেদবতীর স্বামী একমাত্র বিষ্ণুই, দ্বিতীয় অন্য অন্য কেউ হতে পারে না। সীতার সঙ্গে বেদবতীর চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্যটির খুব সাদৃশ্য। রাবণের আগে দৈত্যরাজ শম্ভ বেদবতীকে কামনা করে। দৈত্যরাজ শম্ভ সমুদ্র মন্থনকালে অসুরদের সঙ্গে দেবতারা বেইমানি করেছিলেন বলে দেবতাদের স্বর্গ শুধু নয়, মর্ত্য ও পাতালের অধিকার পেতে বদ্ধপরিকর। তো এহেন দৈত্য অরণ্যে পরিভ্রমণকালে বেদবতীকে দেখে কামাতুর হয়ে পড়লেন। বেদবতীকে কামনা করলেন পিতা কুশধ্বজের কাছে। প্রত্যাখ্যাত হলে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হলেন শম্ভু। অনিয়ন্ত্রিত হুঙ্কার ছাড়লেন শম্ভ। সেই হুঙ্কারে বেদবতীর পিতা ও মাতা উভয়রই মৃত্যু হয়। এরপর অনেক খুঁজেও বেদবতীকে পাননি। সেদিন পালিয়ে দৈত্যরাজ শম্বুর হাত থেকে রক্ষা পেলেও ভুবনবিজয়ী লঙ্কার রাজা রাবণের হাত থেকে নিজেকে আর রক্ষা করতে পারলেন না বেদবতী। রাবণ সরাসরি বেদবতীকে প্রস্তাব দিলে প্রত্যাখ্যাত হন। কামক্ষিপ্ত অপমানিত রাবণ বেদবতীর কেশরাশি ধরে টেনে আনলে বেদবতী কেশত্যাগ করেন। এরপর চারধারে আগুন জ্বালিয়ে বেদবতী স্বেচ্ছামৃত্যুবরণ করলেন। আত্মবিসর্জনের সময় রাবণকে বলে গেলেন–“তুই আমাকে যেভাবে অপমান করলি, তার শাস্তি তোকে পেতেই হবে।”
এখন প্রশ্ন–বেদবতীও লক্ষ্মী বা লক্ষ্মীর অবতার, বিষ্ণুর বাগদত্তা। সেই বেদবতীকে দৈত্যরাজ শম্ভ ও রাক্ষসরাজরাজ রাবণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারলেন না বিষ্ণু, এমনকি এদের বধ পর্যন্ত করতে পারলেন না। সেই রাবণকে বধ করতে বেদবতীকে সীতা হয়ে জন্মানোর প্রয়োজন কোথায়? কী এমন হল যেটা সীতার ক্ষেত্রে সম্ভব হল, অথচ বেদবতীর ক্ষেত্রে হল না! সীতাকে লাঞ্ছনা করার জন্য যদি রাবণকে বধ করা ন্যায্যত করা হয়, তাহলে এত যুদ্ধ-ফুদ্ধের কী প্রয়োজন! যুদ্ধ মানে তো উভয়পক্ষের অসংখ্য প্রাণের বিনাশ। যদি রাবণকে হত্যা করাই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এত প্রাণের বিনাশ কেন! কেনই-বা বালীকে হত্যার মতো এমন জঘন্য কাজ করতে হবে? কেন বিভীষণকে ভ্রাতৃঘাতীতে পরিণত করতে হবে? কেন মেঘনাদ, কুম্ভকর্ণদের মতো বীরদের হত্যা করতে হবে? এঁরা তো সীতা বা অন্য কোনো নারীকে টেনে এনে অপমান করেননি! বিষ্ণুকে প্রতিষ্ঠা করতেই রাম-লক্ষ্মণ-ভরত-শত্রুঘ্নর কাঁধে বিষ্ণুকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস?
সীতাও লক্ষ্মী, সীতামাঈ। একথা কিন্তু মানতেই হবে, অগস্ত্যমুনির গল্প অনুসারে সীতা নয়, বেদবতীই রাবণের মৃত্যুর কারণ। তাই-বা বলি কী করে, তাহলে তো স্বৰ্গবেশ্যা পুঞ্জিকস্থলী ও রম্ভার অভিশাপবাণীর গল্পটির কোনো মানেই হয় না। প্রথমজনে হয়ে অভিশাপ দিলেন স্বয়ং ব্রহ্মা, দ্বিতীয়জনের ক্ষেত্রে অভিশাপ দিলেন নলকুবর। অভিশাপটি ছিল এইরকম–রাবণ যদি জোর করে কোনো রমণীকে উপভোগ করে তাহলে সেই মুহূর্তে তাঁর মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। পুঞ্জিকস্থলী সীতাহরণের আগের কাহিনি, রম্ভা সীতাহরণের পরের কাহিনি। এর আগে-পরে-মাঝে রাবণ অসংখ্য নারীকে জোর করে ভোগ করেছেন বা ভোগ করার চেষ্টা করেছেন, তা সত্ত্বেও কিন্তু রাবণের মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যায়নি। অনিয়ন্ত্রিত কল্পনায় পাখা মেলা বোধহয় একেই বলে! তাহলে কী বুঝব বিষ্ণুর মাহাত্ম্য প্রচার করতেই এইসব ‘অপার্থিব’ গল্পের অবতারণা?
‘রামায়ণ’-এর কিছু অন্য এক রচনা থেকে জানা যায়, রাবণ সীতাকে হরণই করেননি। যাকে রাবণ হরণ করেছিলেন, সে নাকি মায়াসী। দেবী পার্বতী আসল সীতাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন এবং রাম-রাবণের যুদ্ধের পরে আসল সীতা প্রকট হন। মায়াসীতা নাকি পরে দ্রৌপদী হিসাবেও জন্মগ্রহণ করেন। তাহলে লক্ষ্মী থেকে বেদবতী, বেদবতী থেকে সীতা, সীতা থেকে দ্রৌপদী, দ্রৌপদী থেকে….। না, এরপর আর কোনো এমন মহাকাব্য লেখা হয়ে ওঠেনি, যাতে আর কোনো ধ্বংসের কারণ’ নারীর জন্ম নিতে পারে। এমনও হতে পারে, যেহেতু পৃথিবীতে আর কোনো রাবণ বা রাবণের মতো দুশ্চরিত্র’ পুরুষ জন্মায়নি, তাই এমন ‘অগ্নিকন্যা’রও জন্ম নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
