“এই বিশ্বের উৎপত্তি বিষ্ণু থেকে। এর স্থিতিও তাঁরই মধ্যে, এটি এক ছন্দোময় সুসম্বন্ধ ব্যবস্থা। বিষ্ণুই এর একমাত্র রক্ষাকর্তা, একমাত্র নিয়ন্তা, আর আসলে এই বিশ্বই তিনি৷”
বাল্মীকি রামায়ণে সীতা ক্ষত্রিয়াণী, বীরাঙ্গনা, বঙ্গে এসে কৃত্তিবাস প্রমুখ বাঙালি কাছে সীতা হয়ে গেলেন গৃহস্থ ঘরের কোমলমতি অসহায় বধূ। অপরদিকে রাজস্থানে তিনি মধ্যযুগের রাজপুতানি, কেরলে তিনি কেরল সীমন্তিনী, তুলসীদাস প্রমুখ কবিদের কাছে তিনি উত্তর ভারতের লজ্জাশীলা অথচ তেজোদৃপ্তা কুলবধূ। সীতা মহিয়সী বীরাঙ্গনা–অথচ আমরা বাঙালি ঘরের ‘জনম-দুখিনী’ লাজুক বধূ সীতাকেই জানি।
রামায়ণের কেন্দ্রীয় বা প্রধান নারী চরিত্র যিনি সেই সীতা নেপালে অবস্থিত জনকপুরে জন্মগ্রহণ করেন। কোথাও-বা বলা হয়েছে জনক মিথিলার রাজা। প্রাচীন ভারতে মিথিলা কি জনকপুরের অন্তর্ভুক্ত ছিল? মিথিলাই-বা কোথায় ছিল? একটু খোঁজার চেষ্টা করব। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, রামায়ণে যেমন মিথিলার কথা জানতে পাই, তেমনই মিথিলার কথা জানতে পারি বিদ্যাপতির কল্যাণে। পঞ্চদশ শতকের মিথিলার কবি ছিলেন বিদ্যাপতি। প্রাচীন ভারতের পূর্বদিকে ছিল বিদেহ রাজ্য, মিথিলা ছিল বিদেহ রাজ্যের রাজধানী। বর্তমানে উত্তর বিহারের তিরহুত জেলা ও দক্ষিণ নেপালের জনকপুর মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন বিদেহ রাজ্য। এই বিদেহ রাজ্যের রাজা ছিলেন সীরধ্বজ, যিনি জনকরাজা নামেই পরিচিত। অতএব সীতা মিথিলাবাসী, ভাষা মৈথিলী। বিদেহ রাজ্যের কন্যা বলে সীতার অন্য নাম ‘বৈদেহী’। আবার অনেকে বলেন সীতার পালক পিতা জনক বিশেষ শক্তিবলে নিজের দেহকে অদৃশ্য করে রাখতে পারতেন, তাই তাঁর নাম বিদেহ। বিদেহর কন্যা বলে সীতা হলেন ‘বৈদেহী’।
হিন্দুসমাজে তাকে আদর্শ স্ত্রী তথা আদর্শ নারীর উদাহরণ হিসাবে মনে করা হয় সীতাকে। সীতা মূলত তাঁর উৎসর্গীকরণ, আত্মবিসর্জন, সাহসিকতা এবং বিশুদ্ধতার জন্যে পরিচিত হয়। বাল্মীকির রামায়ণে হলকর্ষণ করতে গিয়ে জনকরাজা সীরধ্বজ জমি থেকে সীতাকে পেয়েছেন। এর বেশি কাহিনি বাল্মীকি শোনাননি। বিবাহের আসরে জনকরাজা বলেছেন–
“অনন্তর একদা আমি হল দ্বারা যজ্ঞক্ষেত্র শোধন করিতেছিলাম। ওই সময় লাঙ্গল পদ্ধতি হইতে এক কন্যা উখিতা হয়। ক্ষেত্র শোধনকালে হলমুখ হইতে উত্থিত হইল বলিয়া আমি উহার নাম সীতা রাখিলাম। এই অযোনিসম্ভবা তনয়া আমার আলয়েই পরিবর্ধিত হইতে লাগিল।”
অর্থাৎ সীতার জন্ম স্বাভাবিকভাবে মাতৃগর্ভে হননি বলে সাব্যস্ত করার চেষ্টা। সীতা সীরধ্বজের দত্তককন্যা?
বাল্মীকি সরাসরি কিছু না-বললেও সীতা কখনোই অযোনিসম্ভবা নন, তাঁর জন্ম কোনো-না-কোনো মাতৃগর্ভেই হয়েছে। দিবাকর ভট্টের ‘কাশ্মীরি রামায়ণ এবং কৃত্তিবাসের ‘শ্রীরাম পাঁচালি’ এবং ‘অদ্ভুত রামায়ণ’ থেকে জানা যায়, সীতা হলেন রাবণ ও মন্দোদরীর মেয়ে। প্রত্যেকের কাহিনি অল্পবিস্তর হলেও কাহিনির অভিমুখ প্রায় একই। প্রাদেশিক এইসব কবিরা বলেছেন, তাঁর জন্মের আগে গণকরা জানিয়েছিলেন, সীতা রাবণের মৃত্যু এবং বংশের ধ্বংসের কারণ হবেন। দেবীভাগবত পুরাণ’-এ বলা হয়েছে–রাবণ যখন মন্দোদরীকে বিবাহ করতে চান, তখন ময়াসুর রাবণকে সাবধান করে বলেন যে, মন্দোদরীর কোষ্ঠীতে আছে, তাঁর প্রথম সন্তান তাঁর বংশের ধ্বংসের কারণ হবে। তাই এই সন্তানটিকে জন্মমাত্রই হত্যা করতে হবে। ময়াসুরের উপদেশ অগ্রাহ্য করে রাবণ মন্দোদরীর প্রথম সন্তানকে একটি ঝুড়িতে করে জনকের নগরীতে রেখে আসেন। জনক তাঁকে দেখতে পান এবং সীতারূপে পালন করেন। বাসুদেবহিন্দি, উত্তরপুরাণ ইত্যাদি জৈন রামায়ণেও সীতাকে রাবণ ও মন্দোদরীর কন্যাই বলা হয়েছে। এই সব গ্রন্থেও উল্লেখ আছে যে, সীতা রাবণ ও তাঁর বংশের ধ্বংসের কারণ হবেন বলে ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিল, তাই রাবণ তাঁকে পরিত্যাগ করেন।
মালয় ‘সেরি রামা’ ও জাভানিজ ‘রামা কেলিং’ গ্রন্থে রয়েছে, রাবণ রামের মা মন্দোদরীকে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পরিবর্তে তাঁরই মতো দেখতে এক ছদ্ম-মন্দোদরীকে রাবণ বিবাহ করেন। রামের পিতা সেই ছদ্ম-মন্দোদরীকে সম্ভোগ করেছিলেন। তাঁর ঔরসে ছদ্ম-মন্দোদরীর গর্ভে সীতার জন্ম হয়। এইভাবে সীতা নামেমাত্র রাবণের কন্যারূপে পরিচিত হন। “আনন্দ রামায়ণ অনুসারে, রাজা পদ্মাক্ষের পদ্মা নামে এক কন্যা ছিল। তিনি ছিলেন লক্ষ্মীর অবতার। যখন পদ্মার বিবাহ স্থির হয়, তখন রাক্ষসরা রাজাকে হত্যা করে। শোকাহত পদ্মা আগুনে ঝাঁপ দেন। রাবণ যখন পদ্মার দেহটি পান তখন তা পাঁচটি রত্নে পরিণত হয়েছিল। রাবণ একটি পেটিকায় ভরে সেটিকে লঙ্কায় নিয়ে আসেন। মন্দোদরী পেটিকা খুলে ভিতরে পদ্মাকে দেখতে পান। তিনি রাবণকে উপদেশ দেন পিতার মৃত্যুর কারণ দুর্ভাগিনী পদ্মা সহ পেটিকাটি জলে ভাসিয়ে দিতে। রাবণ যখন পেটিকার ঢাকনা বন্ধ করছিলেন, তখন পদ্মা রাবণকে অভিশাপ দিয়ে বলেন যে, তিনি লঙ্কায় ফিরে আসবেন এবং রাবণের মৃত্যুর কারণ হবেন। রাবণ পেটিকাটি জনকের নগরীতে প্রোথিত করেন। জনক পদ্মাকে পেয়ে সীতারূপে পালন করেন।
বাল্মীকি রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে অগস্ত্যমুনি রামকে যে রাবণের কাহিনি শোনাচ্ছিলেন তাতে বেদবতী নামে এক সুন্দরী কন্যাকে পাওয়া যায়। সীতা পূর্বজন্মে ছিলেন বেদবতী নামে এক পুণ্যবতী নারী। রাবণ তাঁর শ্লীলতাহানি করতে চাইলে তিনি রাবণকে অভিশাপ দেন যে, তিনি পরবর্তী জন্মে রাবণকে হত্যা করবেন। বেদবতী হলেন বৃহস্পতির পুত্র কুশধ্বজের কন্যা। ইনিই জন্মান্তরে মিথিলার রাজা জনকের গৃহে সীতা রূপে জন্ম লাভ করেন। ব্রহ্মর্ষি কুশধ্বজ লক্ষ্মীকে নিজের কন্যা হিসাবে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যা শুরু করেন। তাঁর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে লক্ষ্মী তাঁর কন্যা রূপে জন্ম নিতে রাজি হন। একদিন যখন কুশধ্বজ বেদ পাঠ করছিলেন, সেই সময় লক্ষ্মী বাত্ময়ী মূর্তিতে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি অযযানিসম্ভবা ছিলেন! কুশধ্বজ ও তাঁর স্ত্রী মালাবতী তাঁকে নিজের কন্যা রূপে স্বীকার করেন। বেদ পাঠকালে জন্ম লাভ করায় এঁর নাম হয় বেদবতী। একদিন রাবণ পায়চারী করতে করতে লক্ষ করলেন দেবীর মতো সুন্দরী কন্যা তপস্যা করছেন। রাবণ তাঁর পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাঁর সবিস্তারে জানিয়ে দেন। তিনি রাবণকে অতিথি হিসাবে সম্মান প্রদর্শনও করেন। কিন্তু ‘লেডিকিলার’ রাবণ তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। কিন্তু বেদবতী রাবণের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। রাবণ ক্ষুব্ধ হলেন, অপহরণ করার জন্য যেই-না বেদবতীর কেশস্পর্শ করলেন, তৎক্ষণাৎ বেদবতীর হাতখানি তরবারি হয়ে যায়। রাবণের যে হাত তাঁর কেশস্পর্শ করেছিল সেই হাত কর্তন করে দিলেন। এরপর নিজেই চিতা জ্বালিয়ে আত্মাহুতি দিলেন এবং হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন–
