কৈকেয়ীর কবল থেকে মুক্ত দশরথ কৌশল্যার ভবনে অবস্থান করছেন। ভরতকে তিনি যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করতে একবিন্দুও রাজি নন। রাম বনবাসে চলে গেছেন। কিন্তু রামকে ফিরিয়ে আনা যায়, ফিরিয়ে এনে তাঁকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করবেন বলে দশরথ সিদ্ধান্তও নিলেন। অন্যদিকে কৈকেয়ীর অনুগামীরা রাজাদেশ ব্যতীত ভরতকে মাতুলালয় থেকে অযোধ্যায় ফিরিয়ে আনাও সম্ভব নয়৷ রাম ইতোমধ্যে বনবাসে চলে গেলেও দশরথ কিন্তু এখনও ভরতকে রাজ্যানুশাসনের দায়িত্ব সঁপে দেননি। কৈকেয়ীর অনুগামীদের এটাও বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, দশরথ যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন পর্যন্ত ভরতের পক্ষে অযোধ্যার রাজা হওয়া সম্ভব নয়। অতএব ভরতকে অযোধ্যার রাজা হতে হলে দশরথে মৃত্যু অনিবার্যই। রামের সন্দেহ অমূলক নয়। বনবাসের পথে রাম লক্ষ্মণকে সেই আশঙ্কাও প্রকাশ করে ফেললেন–
“কৈকেয়ীর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইয়াছে। ভরত উপস্থিত হইলে তিনি তাহাকে রাজ্যে অভিষেক করিবার নিমিত্ত রাজাকে আর প্রাণে বাঁচিতে দিবেন না।…ভরতকে রাজ্যে নিয়োজিত, আমাকে নির্বাসিত ও পিতার প্রাণান্ত করিবার নিমিত্তই কৈকেয়ী আসিয়াছেন।”
ষড়যন্ত্রের আঁধারে রাজান্তঃপুর থমথমে। দশরথ কৈকেয়ীর ঘরে ঢুকতে সাহস পাচ্ছেন না। কৌশল্যার ভবনে অবস্থান করেই তিনি রাজ্য চালাচ্ছেন। কেন? মৃত্যুভয়ে? বনবাসে এই মুহূর্তে রামের অবস্থান দশরথ উদগ্রীব হয়ে আছেন। সারথি সুমন্ত্র ফিরে এলেই জানবেন সব সংবাদ। বনবাসের ষষ্ঠদিনে সুমন্ত্র ফিরে এলেন অযোধ্যায়, দশরথের কক্ষে। সুমন্ত্রকে দশরথ বললেন–
“এক্ষণে তুমি আমাকে শীঘ্র রামের নিকট লইয়া চলো, তাহাকে না-দেখিয়া আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হইয়াছে। আমি আজ্ঞা দান করিতেছি, তুমি রামকে প্রত্যায়ন করো।”
যে সাহস কৈকেয়ীর গৃহবন্দি থাকাকালীন অর্জন করতে পারেননি, সেই সাহস কৌশল্যার ঘরে বসে দেখিয়ে দিলেন দশরথ।
রাজাজ্ঞা মোতাবেক সুমন্ত্র রামকে অযোধ্যায় প্রত্যানয়ন করবেন এমনই কথা হয়ে রইল। রাত্রি নেমে আসায় তক্ষুনি যাওয়া সম্ভব হল না। অতএব পরদিন সকালে যাত্রা শুরু হবে। অতএব বিরহক্লান্ত দশরথ ঘুমিয়ে পড়লেন। সেই রাতেই দশরথের মৃত্যু হল, ষষ্ঠ রজনীর অধ্যামে। রামকে ফিরিয়ে আনা হবে এই আশ্বাসে যখন দশরথ ঘুমোতে গেলেন, তখন পুত্রশোকে কেন মরতে যাবেন! পুত্রশোকে মৃত্যু হয়েছে এমন পিতা এ পৃথিবীতে খুবই বিরল। এ মৃত্যু স্বাভাবিক হতে পারে না। ভরতের যে রাজা হওয়ার সম্ভাবনা নেই একথা কৈকেয়ী এবং কৈকেয়ীর অনুগামীরা নিশ্চয়ই ওয়াকিবহাল। কিন্তু দশরথ যে রামকে ফিরিয়ে এনে অযোধ্যার যৌবরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করার সংকল্প করেছেন সেকথা জানবে কী করে! এ সংকল্প তো কৈকেয়ীর ঘরে বসে হয়নি, এ ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হয়েছে কৌশল্যার ঘরে বসেই–যেখানে সুমিত্রা, কৌশল্যা আর সুমন্ত্র ছাড়া কেউই। ছিলেন না। কেউ ছিলেন না মানে যে কেউ বুঝবেন না তা তো হয় না। সারা রাজবাড়ি যেখানে দশরথের প্রতিকূল, যেখানে ষড়যন্ত্র ছড়িয়ে আছে ইটপাথরের কোনায় কোনায়–তখন এ খবর চাপা থাকে কীভাবে! দশরথ যে শেষপর্যন্ত ভরত নয় রামকেই পছন্দ করেন, সেকথা কৈকেয়ীরা বিলক্ষণ জেনে গেছেন।
রাত্রি গভীর হয়েছে। দশরথ রানিদের অন্ধমুনির কাহিনি শুনিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। ঘুমিয়ে পড়েছেন কৌশল্যা, সুমিত্রাও। এত ঘুম! ঘুম এত গম্ভীর হল কেন যে, পরদিন ভোরের পরেও ঘুম ভাঙল না! বাল্মীকি বলছেন–“প্রাতঃকালে সুশিক্ষিত সুত, কুলপরিচয় দক্ষ মাগধ, তন্ত্ৰীনাদ নির্ণায়ক গায়ক ও স্মৃতিপাঠকগণ রাজভবনে আগমন করিল এবং স্ব স্ব প্রণালী অনুসারে উচ্চৈঃস্বরে রাজা দশরথকে আশীর্বাদ ও স্তুতিবাদ করিয়া প্রাসাদ প্রতিধ্বনিত করিতে লাগিল।” রাজার না-হয় মৃত্যু হয়েছে, তিনি আর উঠবেন না। কিন্তু এত কোলাহল আর হৈ হুল্লোড়ে কৌশল্যা, সুমিত্রার ঘুম ভাঙবে না! তাহলে কি গভীর রাতে কেউ এ ঘরে ঢুকে ঘুমের কিছু প্রয়োগ করে দিয়েছিলেন? দশরথের মৃত্যু কি তবে ঘুমের মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগে মৃত্যু হয়েছে? রাম তো এরকমই সন্দেহ করেছিলেন–“অপি ন চ্যায়েৎ প্রাণান্ দৃষ্টা ভরতমাগতম্”–“ভরত অযোধ্যায় এসে গেছে। তাকে দেখে জোর পেয়ে কৈকেয়ী আবার দশরথকে প্রাণে মেরে না-ফেলেন।” না, ভরতের অযোধ্যায় ফিরে আসা পর্যন্ত কৈকেয়ী অপেক্ষা করেননি। তার আগেই অযোধ্যাকে কাঁটামুক্ত করে রেখেছেন ভরতমাতা। রাজবাড়ির সেই অস্বাভাবিক ঘটনার পোস্টমর্টেম হয়নি, ফরেনসিক রিপোর্ট নেই, সিবিআই তদন্ত হয়নি। উত্তর খোঁজাও আজ তাই বৃথা। যাই-ই হোক, দশরথের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই প্রাসাদ-বিপ্লবের পরিসমাপ্তি ঘটে। মনে হতে প্রাসাদ-বিপ্লবের শেষ হয়ে গেছে। প্রাসাদ-বিপ্লব এত সহজেই শেষ হয়ে যায় না। বনবাস উতরে রাবণের সঙ্গে যুদ্ধশেষে অযোধ্যায় ফিরে এসে পুনরায় প্রাসাদ-বিপ্লব হয়ে গেল। সে কথা অন্য অধ্যায়ে আলোচনা করা যাবে।
সীতা : তেজস্বিনী, পতিব্রতা এবং নার্সিসিস
সীতা কে? একটাই উত্তর, রামের স্ত্রী। বড়োজোর জনকরাজার দুহিতা। উত্তরকাণ্ডকে বাদ রাখলে সীতার আর কোনো পরিচয় বাল্মীকি দেননি। সীতার বিবাহের সময় বরকর্তা বিশ্বামিত্রকে সীতার যেটুকু জন্মবৃত্তান্ত জনকরাজা সীরধ্বজ প্রয়োজন মনে করেন, সেটুকু হল হলকর্ষণ করে এ কন্যাকে পেয়েছেন। আসলে সীতা যে জনকরাজা সীরধ্বজের ঔরসজাত কন্যা নয়, সেটাই কায়দা করে পাত্রপক্ষকে জানিয়ে দেওয়া আর কী। সীতা হল রামের স্ত্রী। বাল্মীকির রামায়ণে বালকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ডে রামকে নারায়ণ, বিষ্ণু বা বিষ্ণুর অবতার হিসাবে মেলে ধরা হয়েছে। রাম পূজ্য, তাই তাঁর হিসাবে সীতাদেবীও পূজ্যা! রাম বিষ্ণুর অবতার হলে, সীতা স্বাভাবিক নিয়মেই লক্ষ্মীর অবতার। বিষ্ণু কে? বিষ্ণুপুরাণে পরাশর বলছেন–
