দশরথ জানতেন তাঁর প্রতিজ্ঞার কথা রামকে জানালে রাম বিনা কৈফিয়তে তা মেনে নেবেন, সে তাঁর বাধ্য সন্তান। রামের এই আত্মত্যাগ দশরথ সহ্য করতে পারবেন না, সেই কারণে দশরথও নিজের মুখে রামকে সেকথা বলতে পারেননি–সেকথা বলেছেন স্বয়ং কৈকেয়ী। রামও বিনা বাক্যব্যয়ে বনের পথে বাড়ালেন। এ কেমন পিতৃসত্য পালন! যেকথা ভেবে পিতা দশরথ বলতে পারলেন না, সেকথা পালন করার আগে একবারও পিতার কথা ভাবলেন না রাম! কার কথা রাখলেন রাম–পিতা দশরথের কথা, না বিমাতা কৈকেয়ীর? রামের (লক্ষ্মণ ও সীতা সহ) বনবাস যে পিতা হজম করতে পারবেন না, সেকথা কী একবারও রামচন্দ্রের মনে হয়নি? পিতৃসত্য পালন করতে গিয়ে তিনিই পিতার মৃত্যুর কারণ হলেন? নিজের মায়ের দুরবস্থার কী একবারও কানে ঢোকেনি রামচন্দ্রের? কেমন পুত্র তিনি? সেদিক থেকে লক্ষ্মণকে অবশ্যই ‘হ্যাটস অফ” জানাতে হয়। স্পষ্টবাদী লক্ষ্মণ সোজাসাপটা কথা বলেন। বাবা বলে দশরথকেও রেয়াত দেননি পুত্র লক্ষ্মণ। বলেছেন–
“এই নাকি আমার বাবা, বুড়ো বয়সে খোকা সেজেছেন।… ওঁর ভীমরতি ধরেছে।… মেনিমুখো পুরুষ, যিনি মেয়েছেলের কথায় ছেলেকে বনে পাঠান। এই বয়েসে এত কামুক হলে তিনি কিই-না বলতে পারেনা.. কৈকেয়ীর ওপরে গদগদ হয়ে তিনি যদি আমাদের সঙ্গেও শত্রুতা করেন, তবে মেরে ফেলাই উচিত।”
কী পাঠকবন্ধু আহত হলেন? পড়ন, মহাকবি বাল্মীকির ভাষায়–
“পুনর্বাল্যমুপেয়ুষঃ… বিপরীতশ্চ বৃদ্ধশ্চ স্ক্রিয়ো বাক্যবশং গতঃ .. নৃপঃ কিমিব ন ক্ৰয়াচ্চোদ্যমানঃ সমন্মথঃ।… বধ্যতাং বধ্যতামপি।”
লক্ষ্মণ এখানেই থেমে থাকেননি। ক্রোধ আরও ঊর্ধ্বগামী হয় তাঁর–
“হনিষ্যে পিতরং বৃদ্ধং কৈকয্যাসক্তমানসম্। কৃপণঞ্চ স্থিতং বাল্যে বৃদ্ধভাবেন গর্হিতম”।
অর্থাৎ “আমি মেরেই ফেলব; আমাদের উপর যার একটুও মায়া নেই আর কৈকেয়ীর উপর যাঁর এত মোহ, সেই কুচুটে কুৎসিত বুড়ো বয়সের রামখোকাটিকে আমি মেরেই ফেলব।”
লক্ষ্মণের এই প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক, কিন্তু রাম কীভাবে সব মুখ বুজে বেমালুম হজম করে গেলেন সেটা বোধের বাইরে। তা সত্ত্বেও লক্ষ্মণকে কোনোরূপ শাস্তি দেননি দশরথ। শাস্তি দিয়েছেন ভরতকে, ত্যাজ্যপুত্র করে বসলেন ভরতকে–
“সন্ত্যজামি স্বজঞ্চৈব তব পুত্ৰং ত্বয়া সহ।”
অযোধ্যায় বসে রামচন্দ্র তাঁর পিতা দশরথকে কটু কথা না-বললেও, চিত্রকুটে অবস্থানকালে গায়ের ঝাল মিটিয়ে লক্ষ্মণকে বলেছেন–
“কিং করিষ্যতি কামাত্মা কৈকেয্যা বশমাগতঃ”।
অর্থাৎ পিতাকে রামও ‘কামুক’ বললেন। কেবল পিতাই নয়, বিমাতা কৈকেয়ী উদ্দেশেও বললেন–
“অপি ন চ্যায়েৎ প্রাণান্ দৃষ্ট, ভরতমাগতম্”। এখানে বিমাতাকেও ‘খুনি’ বললেন রাম।
দশরথ পক্ষপাতদোষে দুষ্ট ছিলেন। পিতা হিসাবে রামের প্রতিই তাঁর একমাত্র দুর্বলতা। রামের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত স্নেহশীলতাই অন্যান্য পুত্রদের প্রতি উদাসীনতা দেখিয়েছেন চরমভাবে। শর্তানুযায়ী রাজ্যের অধিকার ভরতকে ছেড়ে দিতে হবে জেনেও তিনি অত্যন্ত গোপনে রাজ্যাভিষেকের জন্য রামকে প্রস্তুত করেছেন। এই প্রস্তুতি নিচ্ছিদ্র করার জন্য ভরতকে বছরের পর বছর মাতুলালয়ে ফেলে রেখেছিলেন। রামের বনবাসের আগে শেষ বারো বছর তো ভরতকে অযোধ্যা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন। ভরতের সঙ্গে সামান্য যোগাযোগ পর্যন্ত করেননি তিনি। রামকে বনবাসে পাঠিয়ে দশরথ যতটা ব্যথিত হয়েছিলেন, ভরতকে বনবাসে পাঠালে বিন্দুমাত্র ব্যথিত হতেন না, এ সিদ্ধান্তে আসাই যায়। লক্ষ্মণ, শত্রুঘ্ন তো অনেক দূরের কথা। রাম দশরথের কাছে এত প্রিয় ছিলেন যে, রামের অভিষেকের কথা পরম প্রিয়তমা কৈকেয়ীর কাছেও গোপন রেখেছিলেন। কৈকেয়ী, রাজ্যপাট ছেড়ে তিনি যাঁর ঘরেই সারাক্ষণ পড়ে থাকতেন। এর পরেই শেষরক্ষা করতে পারেননি দশরথ। “এই ক্রোধাগারে হয় প্রাণত্যাগ করিব, না-হয় ভরতকে রাজ্য দিব।”–প্রিয়তমা কৈকেয়ীর এমন কঠিন কথায় দশরথ টু ফাঁ পর্যন্ত করতে পারলেন না। কৈকেয়ী রণমূর্তি ধারণ করলেন, বললেন–
“তুমি এখন রামকে এই স্থানে আনাও এবং তাহাকে বনবাস দিয়া ভরতকে রাজা করো। তুমি আমার শত্রু দূর না-করিরা এ-স্থান হইতে এক পদও যাইতে পারিবে না।”
দশরথ বন্দি হলেন কৈকেয়ীর ক্রোধাগারে, অন্তরীণ হলেন। নিঃস্ব, অসহায় রাজা। যদিও একবার শেষবারের মতো গর্জে উঠে কৈকেয়ীকে ইতরভাষায় বলেছিলেন–
“এক্ষণে তোকে ও আমার ঔরসজাত পুত্র তোর ভরতকে পরিত্যাগ করিলাম। … আমি কিছুতেই তোর কথা শুনিব না৷ তোকে অবমাননা করিব এবং রামকে রাজ্য দিব।”
ওই পর্যন্তই। তারপর বুঝলেন রাজঅন্তঃপুর তাঁর জন্য প্রতিকূল। শেষপর্যন্ত একেবারে চুপসে গেলেন। গলার স্বর মিইয়ে গেল। শুধু পুত্রদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব ছিল না, পক্ষপাতিত্ব ছিল কমবয়সি স্ত্রী কৈকেয়ীর প্রতিও। কৈকেয়ীর প্রতি বেশি প্রেমপিরিতির কারণে কৌশল্যাকে তো অবজ্ঞা করেছেই, সুমিত্রার কোনো খোঁজখবর নিতেন বলে তো শুনিনি। কৈকেয়ীর সঙ্গে দশরথের বেশি ‘ঢলাঢলি’ তাঁর পুত্রদেরও চোখও এড়ায়নি।
রাম চোদ্দো বছরের বনবাসে গেলে দশরথ চরম আহত হন। সারথি সুমন্ত্র কৈকেয়ীর কাছ থেকে দশরথকে মুক্ত করে আনতে সমর্থ হন। রামের বনবাসের ষষ্ঠ দিন তাঁর মৃত্যু হয়। প্রাদেশিক রামায়ণে বলা হয়েছে পুত্রশোকেই নাকি পিতা দশরথের মৃত্যু হয়েছে। শোক কীসের? রাম তো মারা যাননি! তবে শ্বাপদশঙ্কুল দণ্ডকারণ্যে রামের নিশ্চিত মৃত্যু হবে, সেই আশঙ্কাতেইও শোক হতে পারে। শোক নয়, বলা যেতে পারে বিরহ। দশরথের অতি প্রিয় পুত্র ছিলেন রাম। রামকে যতটা স্নেহ করতেন দশরথ, তার ছিটেফোঁটা স্নেহও করতেন না অন্য পুত্রদের ক্ষেত্রে। বিরহ তো ছিলই, কিন্তু বিরহে মৃত্যু! বাল্মীকির রামায়ণে ঘটনার পারিপার্শ্বিক বিচার বলছে কিন্তু দশরথের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। চলে যাই বাল্মীকির রামায়ণে অযোধ্যা কাণ্ডে–
