তবে রাম ও ভ্রাতৃসকল ঋষ্যশৃঙ্গের ক্ষেত্রজ সন্তান একথা আমি মানছি না। দশরথ বৃদ্ধ বয়সেই পুত্র-সন্তান লাভ করেন এবং বৃদ্ধ বয়সেও সন্তানের পিতা হওয়া সম্ভব। এমন উদাহরণ ঝুড়ি ঝুড়ি আছে। দশরথ বৃদ্ধ হলেও তাঁর স্ত্রীরা বৃদ্ধা ছিলেন না। তাঁরা বয়সে দশরথের চেয়ে অনেক নবীন ছিলেন। অতএব রানিদের সন্তানধারণে কোনো অসুবিধা নেই। রানিরা সন্তানের মা হলেন, তবে তা স্বামীর দ্বারা নয়, অন্য পুরুষ দ্বারা। কৌশল্যার জ্যেষ্ঠ সন্তান শান্তা রোমপাদ মুনির দ্বারা। শান্তার স্বামী রোমপাদের ছেলে ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি। রোমপাদের স্ত্রী বর্ষিণী হলেন কৌশল্যার বোন। রোমপাদের দ্বারা ক্ষেত্রজ সন্তান শান্তাকে লাভ করেন কৌশল্যা। সেই হিসাবে ঋষ্যশৃঙ্গ যেমন রোমপাদের নিজের ঔরসজাত সন্তান, অপরদিকে শান্তা ক্ষেত্রজ হলেও নিজের ঔরসজাত সন্তান।
রাজা দশরথের এই স্ত্রীরা সকলেই ক্ষত্রিয় ছিলেন, তা কিন্তু নয়। ছিলেন প্রচুর বৈশ্যা ও শূদ্রা স্ত্রীও। প্রধানা মহিষী কৌশল্যাকে অশ্বমেধের ফিরে আসা ঘোড়ার সঙ্গে রাত কাটাতে হয়েছিল, তেমনি যজ্ঞের পুরোহিতরা দশরথের অন্যান্য সকল (ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রা) রানিদেরও ঘোড়ার সঙ্গে রাত কাটানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তবে জাতপাতের মূল্যায়নে এইসব স্ত্রীদের ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ও ছিল, তাতেই বোঝা যেত কোন্ রানি ক্ষত্রিয়া কোন্ রানি শূদ্রা। যেমন ক্ষত্রিয়া রানিদেরকে বলা হত মহিষী’, বৈশ্যা রানিদের বলা হত ‘বাবা’ এবং শূদ্রা রানিদের বলা হত ‘পরিবৃত্তি’। দশরথের যে বৈশ্যা-শূদ্রা স্ত্রী ছিল সে কথা বাল্মীকি তাঁর রামায়ণে অকপটে উল্লেখ করলেও কৃত্তিবাস, তুলসীদাস, কম্ব, রঙ্গনাথনের মতো স্বনামধন্য কবিরা ভুলেও উল্লেখ করেননি। কারণ ইতিমধ্যে সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদ জাঁকিয়ে বসেছিল। সমাজের ঘৃণার জিনিস ক্ষত্রিয়রাজার স্ত্রী শূদ্র হলে তো সত্যনাশ হয়ে যাবে যে!
যাই হোক, রামের বনবাসে বিদায় দেওয়ার সময় রাজা দশরথ সুমন্ত্রকে তাঁর সমগ্র স্ত্রীদের ডেকে আনতে বললেন এবং তিনি জানান সমগ্র স্ত্রীপরিবৃত হয়ে রামকে দর্শন করতে চান–“দারৈঃ পরিবৃতঃ সর্বৈঃ দ্রষ্টুমিচ্ছামি রাঘবম”। রাম বনে যাওয়ার সময় কৌশল্যা সহ আরও ৩৫০ মাতাকে প্রণাম করেছিলেন। দশরথের কিন্তু রামের বনবাসের ব্যাপারে একদম রাজি ছিলেন না। “বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা’ বলে কৈকেয়ীর প্রতি দশরথের যারপরনাই দুর্বলতা ছিল। কৈকেয়ী সরাসরি বর চেয়ে বসলে দশরথও সরাসরি ‘না’ বলতে পারেননি। এই দুর্বলতার কথা কৈকেয়ী যে জানতেন না, তা কিন্তু নয়। এমন প্রাণঘাতী বর চেয়ে বসলে যে বৃদ্ধ স্বামী মর্মাহত হবেন, সেকথা কৈকেয়ী জানতেন। সেই কারণেই কৈকেয়ী বরদুটো চাইতে গিয়ে দোনোমনো করছিলেন। কিন্তু মন্থরার জব্বর ব্রেনওয়াশে শেষপর্যন্ত বরদুটি চাইলেন কৈকেয়ী। দশরথের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। দশরথ বললেন–
“বালিশো বত কামাত্মা রাজা দশরথো ভৃশ৷
স্ত্রীকৃতে যঃ প্রিয়ং পুত্রং বনং প্রস্থাপয়িষ্যতি।”
কামুক রাজা, স্ত্রীর কথায় ছেলেকে বনে পাঠাল? রাস্তাঘাটের লোকেরা পর্যন্ত যার সম্বন্ধে বলেছে ‘কামাত্মা’, ‘কামবেগবশানুগ’। লক্ষ্মণ যেমন পিতাকে ‘কামুক’ বলে তিরস্কার করেছিলেন, রামও অনুরূপ ভাষায় তিরস্কার করেছিলেন। দশরথ নিজেও বেশ স্পষ্ট করেই জানতেন যে তিনি কামুক। লোকে যে বলে লোকে যে বলবে সে বিষয়ে দশরথ বিলক্ষণ অবগত। কৈকেয়ী-কামুকত্বেই দশরথ শেষ হয়েছে। রামের বনবাসও সেই কামুকতারই ফল। কামজৰ্জর রাজা তথা পিতা কৈকেয়ীর বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে পারেননি। তবে প্রিয়পুত্র রামের জন্য দশরথ গর্জে উঠেননি, তা নয়–
“ন নাম তে কেন মুখাৎ পতত্যধো বিশীমানা দশনা সহস্রধাঃ।”
এইখানেই শেষ হয় না ক্রোধ, দশরথ বলেন–
“মা স্বাক্ষীঃ পাপনিশ্চয়ে…ন হি ত্বাং দ্রষ্টুমিচ্ছামি ন ভার্যা ন চ বান্ধবী…সকামা ভব কৈকেয়ী বিধবা রাজ্যমাবস।”
এটা রাজার মনের কথা, কঠিন বাস্তব। কৈকেয়ীর প্রেমে রাজা এতটাই ডগমগ ছিলেন যে, কৌশল্যা-সুমিত্রাদের এক্কেবারেই পাত্তা দিতেন না। কিন্তু অবস্থাকালে দশরথ স্বমূর্তি ধারণ করলেও কেকেয়ীর কাছে হারই মানতে হয় শেষপর্যন্ত।
কৈকেয়ীকে সবসময় তুষ্ট করে চলতেন স্বামী দশরথ। স্বামী দশরথ সেই কারণেই বড়ো রানি কৌশল্যাকে চরম অবহেলা করতেন, সেকথা কৌশল্যার আত্মকথনেই জানা যায়–
“ত্বয়ি সন্নিহিতে প্যেমহমাসং নিরাকৃতা। কিং পুনঃ প্রোষিতে তাত ধ্রুব মরণমেব মো… অত্যন্তং নিগৃহীতাস্মি ভর্তুর্নিত্যমসম্মতা… পরিবারেণ কৈকেয়্যাঃসমা বাপ্যথবাবরা.. তদক্ষয়ং মহ দুঃখং নোৎসহে সহিতুং চিরম্। বিপ্রকারং সপত্নীনামেবং জীর্ণাপি রাঘব”
অর্থাৎ “বাবা, তুই কাছে কাছে থাকতেই তোর বাবা আমার এই দশা করলেন, সেখানে তুই বনে গেলে আমার কপালে মরণ লেখা আছে।… তুই জানিসনে, বাবা, আমি সহ্য করেছি, কত অত্যাচার মাথা পেতে নিয়েছি, আসলে তোর বাবা আমায় দেখতেই পারে না।… এই যে ছোটোবৌ কৈকেয়ী, তার দাসীর চেয়েও অধম করে আমাকে রেখেছে।… এখন বুড়ি হয়ে গেছি, এই বয়সে আর সতীনের মুখ-ঝামটা সহ্য করতে পারব না, আমাকে তুই সঙ্গে নিয়ে চল বাবা।”
