মহাভারতে নিয়োগ প্রথার অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। যেমন দীর্ঘতমা মুনি বঙ্গদেশের রাজা বলির রানি সুদেষ্ণার গর্ভে এই পদ্ধতিতেই কয়েকটি পুত্র উৎপাদন করেছিলেন। ঋষি পরাশর সত্যবতীর গর্ভে ব্যাসদেবকে উৎপাদন করেছিলেন। আবার ব্যাসদেব কুরুরাজ বিচিত্রবীর্যের দুই বিধবা পত্নী অম্বিকা এবং অম্বালিকার গর্ভে যথাক্রমে ধৃতরাষ্ট্র এবং পাণ্ডুকে জন্ম দিয়েছিলেন। এছাড়া তাঁর দ্বারাই অম্বিকার অনাম্মী দাসীর গর্ভে বিদুরের জন্ম হয়। পাণ্ডুরাজার দুই স্ত্রী কুন্তী ও মাদ্রীর গর্ভে পঞ্চপাণ্ডবের জন্ম হয় নিয়োগ পদ্ধতিতেই। অগ্নিপুরাণে ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু এবং পঞ্চপাণ্ডবের নিয়োগ প্রথা অনুসরণে জন্মগ্রহণের কথা বলা হয়েছে। রাজা সুদাসের পুত্র সৌদাসের রানি দময়ন্তীর গর্ভে ঋষি বশিষ্ট অশ্যককে জন্ম দেন।
গরুড়পুরাণে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জাত সন্তানকে বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ঋকবেদে ১০/৪০/২ নম্বর শ্লোকটি বৈদিক যুগে নিয়োগ প্রথা চালু থাকার কথা বলেছে। গৌতম বশিষ্ট, বৌধায়ন, নারদ এবং মনু নিয়োগ সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। বৃহন্নারদীয় পুরাণের মতে নিয়োগ পদ্ধতি কলিযুগে কার্যকরী নয়। আদি পুরাণ এই নির্দেশিকা সমর্থন করেছে।
যাই হোক, রাজা দশরথকে কলঙ্কমুক্ত করতে এবং তাঁর মৃত্যুর পর পিতৃপুরুষের উদ্ধারের জন্যই উৎপাদন করা হয়েছে জন্ম বিষয়ক এই অলৌকিক কাহিনি। বাস্তবে যখন স্বাভাবিক উপায়ে রাজাকে পুত্রের স্বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, তখনই অলৌকিকতার আশ্রয় এসেছে। প্রাদেশিক কবিরা ফল বা চরু বা পায়েস খাইয়ে স্ত্রীদের গর্ভবতী করানোর গল্প বলেছেন। বাল্মীকি কিন্তু বালকাণ্ডে (প্রক্ষিপ্ত?) সোজাসাপটাই বলেছেন দশরথের স্ত্রীদের গর্ভবতী হওয়ার প্রকৃত কাহিনি। রাজা দশরথ পুত্র সন্তানের জন্য ‘পুত্রেষ্টি যজ্ঞ’ করেন। পুত্রের জন্য শেষপর্যন্ত ঋষ্যশৃঙ্গকে দশরথ আহ্বান করেন–
“ততঃ প্রণম্য শিরসা তং বিপ্রং দেববর্ণিনম্।/যজ্ঞায় বরয়ামাস সন্তানার্থং কুলস্য চ৷৷”
যজ্ঞের মুনি ঋষ্যশৃঙ্গ যজ্ঞ থেকে একটা ফল পান এবং সেই ফল রাজাকে দিয়ে তাঁর পত্নীদের খাওয়াতে বলেন। সেই মোতাবেক দশরথ ফল নিয়ে দুই ভাগ করে তাঁর প্রধান দুই রানী কৌশল্যা আর কৈকেয়ীকে খেতে দেন। এমন সময় তৃতীয় রানী সুমিত্রা এসে কান্নাকাটি করল পুত্রলাভের ফলের জন্য। তখন কৌশল্যা দয়াবতী হয়ে তার ভাগের আর্ধেকটা ফল আরও দু-ভাগ করে একভাগ সুমিত্রাকে দেন। যথাসময়ে কৌশল্যার ঘরে রাম জন্ম নিলেন। কয়েকদিন পর কৈকেয়ীর ঘরে ভরত জন্ম নেন আর সুমিত্রার ঘরে যমজ পুত্র লক্ষ্মণ আর শত্ৰুগ্ন জন্ম নেন। অন্য এক কাহিনি থেকে জানা যায়–ভারতবর্ষের সরযু নদীর কাছে অযোধ্যা নামের এক নগরে দশরথ নামের এক রাজা ছিলেন। তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। মনের দুঃখে একদা মন্ত্রীদের বললেন–আমি দেবতাদের তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করব। যজ্ঞের আয়োজন সম্পন্ন করা হল। প্রথমেই করা হল ‘অশ্বমেধ যজ্ঞ’। ঘোড়ার মাংস দিয়ে এই যজ্ঞ করা হয়। জটিল এক প্রক্রিয়া, প্রথমে ঘোড়াটা ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘোড়া এক বছর যেখানে খুশি সেখানে ঘুরে বেড়ায়, তারপর এটাকে ফিরিয়ে আনা হয়৷ ‘অশ্বমেধ যজ্ঞ’-তে যে ঘোড়াটা ছেড়ে দেওয়া হত সেটাকে নিজ রাজ্যে না-ফেরা পর্যন্ত কোথাও বাধা দেওয়া হত না। এই সময়টায় ওই ঘোড়ার পিছন পিছন খুব শক্তিশালী একটা সৈন্যদল থাকত। ঘোড়াটা ঘুরতে ঘুরতে অনেকগুলি রাজ্যে ঢুকে পরত এবং নিয়মটা ছিল ঘোড়াটা যেসব রাজ্যে ঢুকে পরত সেসব রাজাকে যজ্ঞকারী রাজার ‘জয়’ বলে মেনে নিতে হত৷ না-মানলে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হত।
যাই হোক, অশ্বমেধ যজ্ঞের পর ঋষ্যশৃঙ্গ বললেন–
“এরপর পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করিলে মহারাজের ছেলে হইবে”।
যজ্ঞের ফলে অলৌকিক ‘পায়েস’ এল। সেই পায়েস রানিদের খেতে দেওয়া হল। দশরথের তিন রানি কৌশল্যা, কৈকেয়ী, সুমিত্রা। কিছুদিন পর তাঁদের ছেলে হল। কৌশল্যার পুত্র রাম। কৈকয়ীর পুত্র ভরত। সুমিত্রার দুই পুত্র–লক্ষ্মণ এবং শত্রুঘ্ন। দশরথ নয়, দশরথের কোনো ভূমিকাতেও নয়–সন্তানের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব রানি-ত্রয়ী এবং অবশ্যই ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি৷ যুক্তিবাদী প্রাবন্ধিক প্রবীর ঘোষ স্পষ্টত বলেছেন–
“ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির সঙ্গে মিলনের ফলে জন্ম হয় দশরথের চার পুত্রের”।
অতএব রাম, লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্রুঘ্নের ‘বায়োলজিক্যাল ফাদার’ দশরথ নন, মুনি ঋষ্যশৃঙ্গ। ‘ছাল’, ‘পায়েস’ খেয়ে কৌশলা রামের জন্ম দিয়েছেন–এটা যদি বিশ্বাস করতে বলেন, তাহলে রাম এবং রামায়ণ কিছুতেই ঐতিহাসিক হতে পারে না। অতএব অলৌকিক নয়, লৌকিক উপায়েই রাম ও অন্যান্য পুত্রদের জন্ম হয়েছিল। মুনিবর বাল্মীকি রামের জন্মতিথিও বলে দিয়েছেন–
“ততো যজ্ঞে সমাপ্তে তু ঋতুনাং ষট্ সমতায়ুঃ।
ততশ্চ দ্বাদশে মাসে চৈত্রে নাবমিকে তিথৌ৷৷
নক্ষত্রেদিতিদৈবততা স্বোচ্চসংস্থে্যু পঞ্চসু।
গ্রহেষু কর্কটে লগ্নে বাকপবিন্দুনা সহ৷৷”
এবং “পুষ্যে জাতন্তু ভরতো মীনলগ্নে প্রসন্নধীঃ।
সার্পে জাতৌ তু সৌমিস্ত্রী কুলীরে অ্যুদিতে রবো৷”
অসংখ্য বিয়ে করলেও, ৩৫০ টি স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও একটি স্ত্রীকেও তিনি সন্তান উপহার দিতে সক্ষম হননি। বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত তাঁর কোনো পুত্রসন্তান হয়নি।
