এ কাহিনিগুলি যদি ইতিহাস হয়, যদি সমসাময়িক বর্ণনা হয়–তাহলে বলতেই হয় সে যুগে এ ধরনের যৌনমিলন এবং জন্ম দেওয়া স্বীকৃত ছিল। এ নিয়মকে বলা হত নিয়োগ প্রথা। প্রাচীন হিন্দুসমাজে প্রচলিত ছিল নিয়োগ বিধি, এটি একটি সংস্কার। বিধবা মহিলা অর্থাৎ যেসব মহিলার স্বামী মারা গেছেন, অথচ তার কোনো সন্তানসন্ততি নেই এবং যেসব মহিলার স্বামী আছেন কিন্তু তিনি সন্তান জন্মদানে অক্ষম সেই মহিলা তার স্বামী ও বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির অনুমতিক্রমে একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানানোকেই ‘নিয়োগ প্রথা’ বলে।
এখানে উল্লেখ্য যে–(১) বিষয়টির সঙ্গে স্বামী ও অন্যান্য বয়োজ্যষ্ঠ ব্যক্তির অনুমতির ব্যাপার আছে এবং (২) এই প্রথাটি যৌন পরিতৃপ্তির সঙ্গে মোটেই সম্পর্কযুক্ত নয়। বরং এটা সমাজ ও পরিবারের একান্ত প্রয়োজন অনুসারেই শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদনের জন্যই এই প্রথা অনুশীলন করা হয়। নারী-শরীরের সুস্থ বীর্য-স্থাপনাই এই প্রথার উদ্দেশ্য। তৎকালীন সময়ে নিয়োগ প্রথায় কিছু শর্ত শক্তভাবে পালিত হত। এটা সাধারণত কেন এবং কোন্ অবস্থায় করা হত, সেটা জেনে নেওয়া যেতে পারে–
নরক থেকে পূর্বপুরুষদের উদ্ধার করার জন্য পুত্র উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তার উপর স্মৃতিকাররা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই যুগে যুগে ‘পুত্রেষ্টি যজ্ঞ চলছেই, পাশাপাশি চলছে কন্যাভ্রণ হত্যা। এই কারণে বিবাহিত জীবনে যদি সন্তান উৎপন্ন না-হয়, কী নিঃসন্তান অবস্থায় যদি কেহ মারা যায়, তা হলে তার স্ত্রী বা বিধবার ক্ষেত্রে’ অপরের দ্বারা সন্তান উৎপাদনের বিধান স্মৃতিকাররা দিয়েছিলেন। প্রধানত রাজপরিবারগুলিতে এবং অধিক ভূসম্পত্তির অধিকারী পরিবারগুলিতে বংশপরম্পরা রক্ষা এবং উত্তরাধিকারীর জন্যই এ প্রথা পালন করা হত। সাধারণত হিন্দুসমাজ পিতৃতান্ত্রিক এবং পিতার দিক থেকেই বংশ পরিচয় এবং উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয়। এই অবস্থায় ধনাঢ্য পরিবারগুলির স্ত্রীদেরকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়া হলে সেই স্ত্রীলোকের গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানেরা পরবর্তীতে ওই (দ্বিতীয়বার বিবাহিত) নারীর দ্বিতীয় স্বামীর উত্তরাধিকারীরূপে পরিচিতি লাভ করবে। এ অবস্থায় ওই নারীর প্রথম স্বামীর পরিবার বিনাশের পথে যেতে পারে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্যই এহেন বিধি পালন করা হত।
কারা নিয়োগ প্রথার অধিকারী ছিলেন?
(১) একজন নারী এই প্রথা অনুসরণ করবে শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদনের জন্য, যৌন আনন্দ লাভের জন্য নয়।
(২) নিয়োগকৃত পুরুষ এই কাজটি করবেন ধর্মের জন্য, নারীকে সন্তান উৎপাদনে সাহায্যের জন্য–যৌন আনন্দ উপভোগের জন্য নয়।
(৩) এই উপায়ে জন্মগ্রহণকৃত সন্তান স্বামী-স্ত্রীর সন্তানরূপে বিবেচিত হবে, নিয়োগকৃত পুরুষ সেই সন্তানকে নিজের সন্তানরূপে দাবি করতে পারবে না।
(৪) ভবিষ্যতে নিয়োগকৃত পুরুষ সন্তানের পিতৃত্ব দাবিও করতে পারবে না।
(৫) অপব্যবহার রোধের জন্য একজন পুরুষ তার সারাজীবনে মাত্র তিনবার নিয়োগকৃত হয়ে যৌনমিলন করে গর্ভবতী করতে পারবে।
(৬) এই কাজকে ধর্ম হিসাবে দেখা হবে, যাতে নারীর মনে বা পুরুষের মনে এই ব্যাপারে কোনো আকাঙ্ক্ষা বা লোভ জন্ম না নেয়–একজন পুরুষ এই কাজটি নারীকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে করবে, আর নারী এই কাজটি করবে তার ও তার স্বামীর জন্য সন্তান লাভের উদ্দেশ্যে।
(৭) এই প্রথায় কোনো শৃঙ্গার হবে না, কোনোরূপ যৌনক্রিয়া হবে না, শুধুমাত্র যোনিতে লিঙ্গ প্রবেশ ছাড়া।
(৮) সেখানে একটা অর্ধস্বচ্ছ আচ্ছাদন থাকবে, যা দিয়ে নারীর উর্ধাঙ্গ ঢেকে দেওয়া হবে এবং নিয়োগকৃত পুরুষ শুধুমাত্র নারীর যৌনাঙ্গ দেখার অনুমতি লাভ করবে, যাতে সে শুধুমাত্র নিয়োগ-কর্ম সমাধা করতে পারে।
মহাভারতের একস্থানে ভীষ্ম বলেছেন–“দেবতারা পাঁচ প্রকারে সন্তান উৎপাদন করেন–বাসনা দ্বারা, বাক্য দ্বারা, দর্শন দ্বারা, স্পৰ্শন দ্বারা ও যৌনসঙ্গম দ্বারা”। বেদ, মনুসংহিতায় নিয়োগ প্রথার স্পষ্ট উল্লেখ আছে। কিন্তু রামায়ণ ও মহাভারত যখন লেখা হল তখন নিশ্চয় এ ধরনের প্রথা এবং জন্মদান নিশ্চয় বৈধতা হারায়। আর সেই কারণেই বোধহয় এহেন যৌনমিলন অলৌকিকতার মোড়কে মুড়ে দেওয়া হয়। না-হলে কেন ‘আপস্তম্ভ ধর্মসূত্র’-এ বলা হয়েছে–
“সন্তান প্রজননের জন্য স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে অপরের হস্তে সমর্পণ করা কলিযুগে নিষিদ্ধ হয়েছে। কলিযুগে এরূপ যৌনমিলন ব্যভিচাররূপে গণ্য হয় এবং এরজন্য স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হয়।”
এই উক্তি থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, পূর্ববর্তীকালের সমাজে ‘নিয়োগ’ প্রথা অনুমোদিত হলেও, পরবর্তীকালের সমাজে এ প্রথা নিষিদ্ধ হয়েছিল। প্রাচীনকালে দেবতা ও ঋষিদের পক্ষে যা বৈধ এবং প্রশস্ত ছিল, পরবর্তীকালের মানুষের পক্ষে তা গর্হিত ও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আপস্তম্ভ বললেন যে, ব্যভিচার অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির লিঙ্গ ও অণ্ডকোশ কর্তন করে শাস্তি দেওয়া হবে এবং যদি সে কোনো অনুঢ়া কন্যার সঙ্গে ব্যভিচার করে থাকে, তাহলে তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং তাঁকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করা হবে। বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নারী বা কুমারীকে রাজা সমস্ত কলঙ্ক থেকে মুক্ত করবেন এবং তাঁর অভিভাবকদের হাতে তাঁকে প্রত্যর্পণ করবেন, যদি অভিভাবক তাঁর দ্বারা যথোচিত প্রায়শ্চিত্ত সম্পাদনের ব্যবস্থা করেন। ব্যভিচারীর শাস্তিস্বরূপ নারদ যে দণ্ড বিধান করেছেন তা হচ্ছে–১০০ পণ অর্থদণ্ড, সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ, লিঙ্গ কর্তন ও মৃত্যু। বৃহস্পতিও বলেছেন যে, কলিযুগে ‘নিয়োগ’ প্রথা যথাযথ নয়। নিয়োগ’ প্রথানুযায়ী অপর পুরুষের দ্বারা গর্ভসঞ্চারণ করানোর রীতি যখন বিলুপ্ত হল, তখন নারীর সতীত্ব সম্পর্কে হিন্দুসমাজে এক নতুন ধারণা কল্পিত হল। সে আর-এক অধ্যায়।
