দশরথ অযযাদ্ধা বা অযোধ্যার রাজা ছিলেন। অযোধ্যা একটি অতি ক্ষুদ্র রাজ্য বা দেশ ছিল, যার আয়তন ৭৪৩ বর্গমাইল। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ছিল আরও কম, মাত্র ৪৯৫ বর্গমাইল। যদিও প্রাদেশিক কিছু রামায়ণে বলা হয়েছে, বসুন্ধরায় যতদূর সূর্যকিরণ পৌঁছোয় ততদূর পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য। বাল্মীকি কিন্তু দশরথকে অত বড়ো সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হিসাবে দেখাননি। তাঁকে বরং অতি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের নরপতি হিসাবে দেখিয়েছেন। দশরথের সাম্রাজ্যকে ‘নগররাষ্ট্র’ বলা হত। দশরথ আটজন মন্ত্রী এবং ঋত্বিক, বামদেব, বশিষ্ঠের সাহায্যে তাঁর স্বাধীন রাজ্য চালাতেন। সে যুগে এমন রাষ্ট্র অসংখ্য ছিল। রামায়ণের যুগে তো বটেই, মহাভারতের যুগেও এমন ‘নগররাষ্ট্রের সংখ্যা প্রচুর পাওয়া যায়।
দশরথ যখন কৈকেয়ীকে বিয়ে করছেন, তখন পর্যন্ত অপুত্রক ছিলেন। একে অপুত্রক মায় ক্ষুদ্র নরপতি, তায় আবার দোজবর। কেকয়রাজ অশ্বপতি এমন বিয়েতে রাজি হলেন কেন? রাজি হলেন এই কারণে যে ভবিষ্যতে কৈকেয়ীর সন্তানই হবে অযোধ্যার রাজা। হিসাবমতো (প্রথা) প্রথমা মহিষীর পুত্রই রাজত্বলাভ করে থাকে। যদিও তখনও পর্যন্ত দশরথ অপুত্রক, তা সত্ত্বেও কেকয়রাজ অশ্বপতি কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি। তাই তিনি বিয়ের আগেই প্রতিজ্ঞা বা চুক্তি করিয়ে নিলেন দশরথকে দিয়ে। বলা হল পরিস্থিতি যেমনই থাক, কৈকেয়ীর পুত্রকেই দশরথ সমস্ত রাজ্য লিখে দেবেন।
যদিও কৌশল্যাকে দশরথ পুত্রসন্তান দিতে পারেননি, কৈকেয়ীকেও পুত্রসন্তান দিতে পারেননি। সুমিত্রাকেও নয়। অতএব এটা বুঝতে হবে, দশরথ সন্তান জন্মদানে অক্ষম ছিলেন। তবে যৌনতায় অক্ষম ছিলেন একথা বলা যায় না। যৌনতা না-থাকলে তিনি এতগুলি বিয়ে করতেন না, ‘কচি’ বউ কৈকয়ীর কাছে সর্বক্ষণ লেপটে থাকতেন না। নারীই তাঁর ধ্যানজ্ঞান। নারীই তাঁর সর্বনাশ।
তিন-তিনটে প্রধানা থাকা সত্ত্বেও দশরথ সন্তানের পিতা হতে পারেননি। বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত তিনি নিঃসন্তান বা অপুত্রক ছিলেন। সে যুগে রাজা নিঃসন্তান হলে সেই রাজার মুখ দেখাও অমঙ্গল ছিল। তা ছাড়া পরবর্তী রাজা কে হবেন, সেই চিন্তায় অপুত্রক রাজার বিনিদ্র রজনি কাটত। তার উপর চারিদিক কানাঘুষোও চলত। রাজা দশরথকে লাঞ্ছিতও হতে হয়েছিল। সেকালে পুত্র-সন্তানের আশায় রাজারা যেমন একাধিক বিয়ে করতেন, তেমনই একই কারণে সাধারণ পুরুষরাও একাধিক বিয়ে করতেন–“পুত্ৰৰ্থে ক্রিয়তে ভাৰ্য্যা”। সন্তান বা পুত্র সন্তান জন্ম দিতে না-পারার সমস্ত দায় মাথায় নিয়ে মেয়েদেরকে অসংখ্য সতীনদের সঙ্গে সংসার করতে হত।
এত সংখ্যক রমণীকে বিয়ে করেও রাজা দশরথ পুত্র-সন্তানের স্বাদ পাননি। তাহলে কি দশরথে নিজেই পুত্র সন্তান উৎপাদনে অসমর্থ ছিলেন। শান্তার জন্মের ব্যাপারটাও তো রহস্যাবৃত। শান্তাই দশরথের একমাত্র কন্যা সন্তান। সন্তান বা পুত্র-সন্তান জন্ম দিতে না-পারার জন্য পুরুষ বা স্বামীদের কোনো দায় নিত না–সেকালেও নয়, একালেও নয়। শুধু দশরথই নয়–রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণগুলিতে অসংখ্য সন্তান জন্মদানে অক্ষম ক্ষত্রিয় রাজাদের পরিচয় আমরা পাই। এরা কেন সন্তান জন্মদানে অক্ষম ছিলেন তার ব্যাখ্যা সবক্ষেত্রেই পাওয়া যায়নি।
দশরথ, দিলীপ, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু–এঁরা এরকমই অক্ষম পুরুষ ছিলেন। তবে দশরথ মোটেই ধ্বজভঙ্গ বা লিঙ্গ উত্থানরহিত (Improtent) ছিলেন না। স্মর্তব্য, এইসব অক্ষম পুরুষরা ক্ষত্রিয় রাজা ছিলেন। অথচ ব্রাক্ষণকুল এবং দেবতাকুল এরা বলে বলে পুত্র-সন্তানের জন্ম দিতেন, এই প্রক্রিয়ায় তাঁরা কোনো কন্যা-সন্তান জন্ম দিয়েছেন বলে শুনিনি৷ অক্ষম ক্ষত্রিয় রাজাদের স্ত্রীগণ হয় দেবতাদের দ্বারা, নয় ব্রাহ্মণ-ঋষিদের দ্বারা গর্ভবতী হয়েছেন। মহাকবি কালিদাসের ‘রঘুবংশম’-এ দিলীপ-ভার্যা সুদক্ষিণা বশিষ্ঠমুনি কর্তৃক গর্ভবতী হয়েছিলেন বলেই অনুমান করা যায়। দশরথ-ভার্যা তিন রানিই ঋষ্যশৃঙ্গ ঋষি কর্তৃক গর্ভবতী হয়েছিলেন বলে অনেক গবেষক বলেন। পাণ্ডু-ভার্যা কুন্তি ও মাদ্রির গভরক্ষা হয় যথাক্রমে সূর্য (পুত্র কর্ণ), ধর্ম (পুত্র যুধিষ্ঠির), পবন। (পুত্র ভীম), ইন্দ্র (পুত্র অর্জুন), অশ্বিনীদ্বয় (পুত্র নকুল ও সহদেব) কর্তৃক। এরকম অসংখ্য উদাহরণ উল্লেখ করা যায়। অলৌকিকের মোড়কে এই সমস্ত জন্মকে বর্ণনা করা হয়েছে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে।
শিবের গলগল করে ঝরে-পড়া বীর্যে মনসা, কার্তিক ইত্যাদি শিশুদের জন্ম এবং অবশেষে পরিত্যক্তও হতে হয় সেইসব অসহায় সন্তানদের। ব্রাহ্মণ মুনিঋষিরা তো রানিদের গর্ভবতী করার মহান দায়িত্ব নিতেন, বেশ্যাদেরও গর্ভবতী করতে তাঁরা ছাড়েননি। অনভিপ্রেত যৌনসম্ভোগ করে বিশ্বামিত্র স্বৰ্গবেশ্যা মেনকাকেও গর্ভবতী করেছেন এবং সন্তান শকুন্তলাকে পরিত্যক্তা করেছেন। গবেষক-প্রাবন্ধিক মাহবুব লীলেন তাঁর সহজিয়া রামায়ণ রচনায় বলেছেন–
“দশরথ সাড়ে তিনশোখান বিবাহ করছে কি খালি শালা-শ্বশুরের প্রদর্শনী দিবার লাইগা? মোটেও তা না। এক বাপের এক পুতের অতখান বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হইল পোলা জন্মাইয়া নিজের ঘরেই একখান সেনাবাহিনী গইড়া তোলার পাশাপাশি আশপাশের রাজ্যগুলায় পোলা-মাইয়া বিবাহ দিয়া বন্ধুত্ব কিংবা নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা। তয় একলা এক মানুষের পক্ষে অতগুলা বৌর ঘরে পোলাপান জন্ম দিতে খাটনিও লাগে, সময়ও লাগে। তার থাইকা পুত্রেষ্টী যজ্ঞে রাজার বৌদের একলগে গর্ভবতী কইরা একলগে একগাদা পোলাপানের বাপ হইয়া যাওয়া শাস্ত্রসম্মত সহজ উপায়। পুত্রেষ্টী যজ্ঞে রাজার বৌরা আমন্ত্রিত বামুন দ্বারা গর্ভবতী হইয়া রাজার ঘরে পোলাপানের জন্ম দেন, শাস্ত্রমতে রাজার পোলাপান হিসাবেই গণ্য হয়।”
