যদি প্রশ্ন করেন রাম কোন্ দেশের রাজা ছিলেন? উত্তর ভারত’ বললে ডাহা ভুল। রাম ভারত উপমহাদেশের অন্তর্গত অতি ক্ষুদ্র এক দেশ অযোধ্যার রাজা ছিলেন, ভারত কখনোই নয়। তখনকার সময়ে ভারত কোনো একটি দেশের নাম ছিল না। অসংখ্য দেশগুচ্ছ নিয়েই ভারত উপমহাদেশ। তখন ভারত উপমহাদেশের সঙ্গে পারস্যও সংযুক্ত ছিল। সেই দেশগুচ্ছের মধ্যে অযোধ্যা একটি অতি ক্ষুদ্র দেশ। রাম এই অতি ক্ষুদ্র দেশেরই রাজা ছিলেন। তৎকালীন ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের নাম এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, তাতে খানিকটা ধারণা তৈরি হবে–লম্পক, নগরহার, গান্ধার, উদ্যান, বোলর-গান্ধার, তক্ষশীলা, সিংহপুর, উরস, কাশ্মীর, পুনচ, রাজপুরী, টক্ক, চীনাপতি, জালন্ধর, কুলুত, শতদ্রু, পারিযাত্র, মথুরা, স্থানেশ্বর, শ্রু, মতিপুর, ব্ৰহ্মপুর, হিরণ্যগোত্র, গোবিসান, অহিক্ষেত্র বা অহিচ্ছত্র, বীরসান, কপিঙ্খ, কনৌজ, অযোধ্যা, হয়মুখ, প্রয়াগ, কৌশাম্বী, বিশাখা বা বিশোক, শ্রাবস্তী, কপিলাবস্তু, বারানসী, গর্জপুর বা ঘাজিপুর, বৈশালী, বৃজি, নেপাল, মগধ, হিরণ্য পর্বত, চম্পা, কজুঘীরা, পুণ্ড্রবর্ধন, কামরূপ, তাম্রলিপ্ত, কর্ণসুবর্ণ, উড্র, কঙ্গোদ, কলিঙ্গ, কোশল, ধনকণ্টক, চোল, দ্রাবিড়, ভরুকচ্ছ, মালব, কাম্পিল্য, গুর্জর, উজ্জয়িনী ইত্যাদি।এই দেশগুলি প্রত্যেকটিই ছিল স্বাধীন, ছিল স্বাধীন রাজা। একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ কারোর শাসনাধীনে ছিলেন না, কোনো কেন্দ্রীয় শাসন ছিল না। এক সাম্রাজ্যের শাসক অন্য সাম্রাজ্যের শাসককে রাজস্ব দিতেন না। প্রাচীন ভারতীয় বলা যায় কোনো কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা ছিল না।
রাজা হওয়ার আগে রাম মাত্র দুটি দেশ জয় করেন বলা যায়–একটি কিষ্কিন্ধ্যা, অপরটি লঙ্কা। যদিও এই যুদ্ধগুলি শর্তসাপেক্ষে হয়েছিল, যথাক্রমে প্রথমটি সুগ্রীবের হাতে এবং দ্বিতীয়টি বিভীষণের হতে তুলে দিতে হয়। সুগ্রীব প্রতিজ্ঞা খেলাপ করলে তাঁকে হত্যা করে বালী-পুত্র অঙ্গদকে কিষ্কিন্ধ্যর রাজা হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল।
এই হল সংক্ষিপ্ত রামকাহিনি৷ রাম-রাবণের যুদ্ধ নয়, রামের সঙ্গে রাবণের যুদ্ধটা জাস্ট ইনসিডেন্ট মাত্র। মোটেই পূর্বপরিল্পিত নয়। রাবণের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য রামচন্দ্র অযোধ্যা থেকে চিত্রকুট, চিত্রকুট থেকে দণ্ডকারণ্য, দণ্ডকারণ্য থেকে লঙ্কায় পৌঁছোননি। এই অকারণ যুদ্ধ রামের প্রয়োজনও ছিল না। চাইলে সেই যুদ্ধ অযোধ্যা থেকেই পরিচালনা করা সম্ভব ছিল। লোকের দোরে দোরে করুণাপ্রার্থী হয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে হত না। দুষ্টের দমন শিষ্ঠের পালনও নয়। রামায়ণ হল রাজতন্ত্রের ইতিহাস। ষড়যন্ত্রের ইতিহাস। ষড়যন্ত্রের শিকার দশরথপুত্র রামচন্দ্র। যাই হোক, রামচন্দ্রকে সাধ্যমতো তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। এবার রামায়ণের অন্যান্য চরিত্রগুলিও বিশ্লেষণ করা যাক।
দশরথ : পক্ষপাতদোষে দুষ্ট, বিষয়াসক্ত, কামার্ত, স্ত্রৈণ রাজা
বিভিন্ন গ্রন্থ ঘেঁটে দশরথকে পাওয়া যায় ইক্ষ্বাকু বা সূর্যবংশীয় রাজা অজের পুত্র হিসাবে। ইনি অযোধ্যার রাজা এবং রাম লক্ষ্মণাদির পিতা হিসাবে সর্বজনবিদিত। কৌশল্যা, কৈকেয়ী ও সুমিত্রা নামে এঁর তিনজন প্রধান মহিষী ছিলেন। মুনিবর বাল্মীকি বলেছেন এছাড়াও প্রায় ৩৫০ টি স্ত্রী ছিল দশরথের–
“অর্ধসপ্তশস্তত্র প্রমদাস্তাম্রলোচনাঃ”।
মহাকবি কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর লেখা রামায়ণে দশরথের সাতশো স্ত্রীর কথা উল্লেখ করেছেন। অনেক প্রকৃত ঘটনার মতো ‘অর্ধ’ শব্দটি কৃত্তিবাস নজরের বাইরেই রেখে দিলেন। দশরথের প্রধান স্ত্রী তিনজনই–জ্যেষ্ঠা কৌশল্যা, দ্বিতীয়া কৈকেয়ী এবং কনিষ্ঠা সুমিত্রা। মূল বাল্মীকির রামায়ণে কৈকেয়ীকে ছোটো রানি হিসাবে উল্লেখ করা হলেও কৃত্তিবাস বলেছেন মেজো রানি। কৈকেয়ী কেকয়দেশের পাঞ্জাবি মেয়ে। কেকয় দেশ শতদ্রু ও বিপাশার মধ্যবর্তী অঞ্চলকে বোঝায়, যা বর্তমান পাঞ্জাব। বাল্মীকির রামায়ণে সুমিত্রার কোনো পিতৃপরিচয় জানা যায় না। তবে কৃত্তিবাস সুমিত্রাকে সিংহলের মেয়ে বললেও, মহাকবি কালিদাস তাঁর “রঘুবংশম’-এ মগধের মেয়ে বলে উল্লেখ করেছেন। কৃত্তিবাস এসব অসমর্থিত তথ্য কোথায় পেলেন তাঁর কোনো সূত্র তিনি দেননি। তিনশো স্ত্রীর বিষয়ে রামায়ণে মাত্র একবারই উল্লেখ হয়েছে, তা শ্রীরামচন্দ্রের বনবাসের বিদায় দেওয়ার সময়। এদের নাম-পরিচয় কিছুই জানা যায়নি।
বাল্মীকির রামায়ণ ছাড়া অন্য প্রাদেশিক কিছু রামায়ণে কৌশল্যাকে কোশল রাজার কন্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিচয় কোথায় পেয়েছেন সেটা তাঁরাই বলতে পারেন। বাল্মীকি তাঁর গোটা রামায়ণের কোথাও এ পরিচয় দেননি। কোশলরাজের যে উল্লেখ বাল্মীকি করেছেন, সেখানে কোথাও কৌশল্যার পিতা বা দশরথের শ্বশুর এমন উল্লেখ নেই। কৌশল্যা কোশলরাজের কন্যা না-হলেও কোশল দেশের মেয়ে হয়তো ছিলেন। সেই কারণেই তিনি কৌশল্যা। বাল্মীকির রামায়ণে মাত্র একবারই কোশলরাজকে পাই, যখন দশরথ অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন।তিনি এ যজ্ঞে নিমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে ছিলেন। বাল্মীকি কৌশল্যার পিতৃ-পরিচয় উল্লেখ না-করলেও, দশরথের দ্বিতীয় স্ত্রী কৈকেয়ীর পিতৃ-পরিচয় সযত্নে দিয়েছেন। কৈকেয়ী ছিলেন কেকয়রাজ অশ্বপতির কন্যা, অতএব তিনি রাজকন্যা। কৈকেয়ীর ভাই যুধাজিৎ। এই অশ্বপতি ও যুধাজিতের প্রসঙ্গ বাল্মীকির রামায়ণে বহুবার আছে। দশরথের কনিষ্ঠা স্ত্রী সুমিত্রা অভিজাত বংশের কন্যা ছিলেন, এমন পরিচয় বাল্মীকির রামায়ণে পাওয়া যায় না। তাহলে কি নিন্মবর্গীয়া ছিলেন? এর প্রমাণ পেতে গেলে শ্রীরামচন্দ্রের সম্ভাষণ অনুসরণ করতে হবে। শ্রীরামচন্দ্র বিমাতা কৈকেয়ীকে ‘আর্যা কৈকেয়ী’, ‘দেবী কৈকেয়ী’, ‘কৃষ্ণলোচনা কৈকেয়ী’ ‘জননী কৈকেয়ী’ বা ‘দেবী কৈকেয়ী’ প্রভৃতি সম্মানসূচক বিশেষণে সম্ভাষণ করতেন। অপরদিকে সুমিত্রাকে সম্মানসূচক বিশেষণ ছাড়াই নাম ধরে ডাকতেন। ন্যূনতম মা বলে ডাকতেন না। অতএব সুমিত্রা নিম্নবর্গীয় এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকছে না। প্রমাণ চান? শ্রীরামচন্দ্র তাঁর মা কৌশল্যাকে বলছেন–“দেখুন আপনি, আমি, জানকী, লক্ষ্মণ ও সুমিত্রা … পিতা যাহা বলিবেন তাহাই করিব।”
