অতএব রাম ‘অবতার’ হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। শ্রীরামচন্দ্রের ভগবত্তা নিয়ে আমার শেষ কথা–বুদ্ধ, অশোক, সাঁইবাবা, ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, রজনীশ, রবিশঙ্কর, বালক ব্রহ্মচারী, বাবা লোকনাথ, চন্দ্রস্বামী, রামকৃষ্ণ প্রমুখরা যদি ভগবান বা ভগবানতুল্য বা অবতার হতে পারেন–তাহলে শ্রীরামচন্দ্রের মতো মহান ব্যক্তির ভগবান বা অবতার হতে বাধা কোথায়! এক আশারামেরই ভক্তসংখ্যা ১০ কোটি। চাট্টিখানি কথা! বাকি অবতারের ভক্তসংখ্যা তো ঈর্ষণীয়। মনে রাখতে হবে প্রাচীন যুগে বাল্মীকি ও ব্যাসদেব পরবর্তী কবিয়া তাঁদের সংস্কৃত ভাষার কাব্য-সাহিত্যে কোনো-না-কোনোভাবে দেবতাদের টেনে আনতেন। তাঁদের সব কাহিনির সব চরিত্ররাই হয় দেবতা, নয় মুনি-ঋষি। দেবতা, মুনি-ঋষিরা নেই, এমন কোনো সংস্কৃত সাহিত্যই নেই। আর আছে অলৌকিক, অবাস্তব, অপার্থিব কাণ্ডকারখানা। কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় এমন একটি সংস্কৃত সাহিত্যের সংখ্যা কম নেই। পাঠকবন্ধুরা, পড়ে দেখতে পারেন ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের কবি দণ্ডী বিরচিত ‘দশকুমারচরিতম্। বাস্তুশাস্ত্রমের মতো কিছু কেজো গ্রন্থ সহ যৌনমূলক গ্রন্থ (বাৎসায়নের কামশাস্ত্র’, কোক্কাচার্যের ‘রতিরহস্য’, জ্যোতির্মল্লের ‘পঞ্চসায়ক’, বীরভদ্র দেবের ‘কন্দর্পচূড়ামণি’) ছাড়া বাকি সব সংস্কৃত সাহিত্যেই অপার্থিব ঘটনার ঘনঘটা। শুধু কাহিনিই নয়, কাহিনিকারও অলৌকিক হয়। যেমন মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি জন্ম, ইনি স্বর্গ থেকে সাপের রূপে মহাবৈয়াকরণ পাণিনির অঞ্জলিতে পতিত হয়। অঞ্জলিতে পতিত হলেন বলে তিনি পতঞ্জলি। পতৎ (পতনশীল) + অঞ্জলি = পতঞ্জলি।
মোট কথা, রামচন্দ্রের অবতার হিসাবে প্রতিষ্ঠা অনেক পরবর্তীকালের। পণ্ডিত হরিপদ চক্রবর্তী তাঁর ‘The Murder of Vali’ প্রবন্ধে লিখেছেন, একাদশ শতকের (AD 11) আগে অবতার রামের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা হয়নি।
পণ্ডিত হরিপদ চক্রবর্তী লিখেছেন–
“Although almost from the beginning of the Christion era Rama began to be identified with the same divinity as Visnu is, he was not fully established as so before the eleventh century AD. On the other hand, Krishna-baSED VAISNAVA-sect had always been in eminence.”
পণ্ডিত উপেন্দ্র নায়ক বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা জরুরি। তিনি তাঁর রচিত ‘Impact of Ramayana on the Socio-Cultural Life of Orissa’ প্রবন্ধে লিখেছেন–
“…erudite scholars are unable to ascertain accurately the exact date of the incarnation of Sri Rama. Moreover, whereas innumerable temples have been built for the worship of ‘Siva’, ‘Visnu’, ‘Durga’ since time immemorial, temples for worship of Rama are comparatively new, recently built … Ramkrishna Vandarkar opines that there was no Rama temple nor even the image of Rama before the 11th century AD. … Madhabacarya, the spokesman of Bramha sect of Vaisnavism, had introduced the Rama worship in South India by bringing for the first time the idol of warrior Rama from Badrikasram.”
বাল্মীকির রামায়ণে রাম নিজেই বলেছেন–
“আমি রাজা দশরথের পুত্র রাম। আমি আপনাকে মনুষ্য বোধ করিয়া থাকি। এক্ষণে আমি কে এবং আমার স্বরূপই-বা কী, আপনারা তাহাই বলুন।”
সুপরিকল্পিতভাবে রামচন্দ্র এমন স্মরণ করালেন ব্রহ্মাকে। ব্রহ্মাও চিত্রনাট্য মোতাবেক প্রত্যাশিত এবং অনিবার্য উত্তরটি দিয়ে দিতে দেরি করলেন না। ব্রহ্মা বললেন–
“তুমি ত্রিলোকের আদিকতা, কেহ তোমার নিয়ন্তা নাই,… তুমি আদ্যন্তমধ্যে বর্তমান।”
ব্রহ্মা আরও বোঝালেন–
রামচন্দ্র জন্মমৃত্যুরহিত নিত্য, অক্ষয় সত্যস্বরূপ ব্রহ্ম। তিনি খড়াধারী বিষ্ণু ও কৃষ্ণ, ত্রিলোকের আদিস্রষ্টা।
ব্যস, সব কালি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার। আর্যদেবতাদের আগ্রাসনের চক্রান্ত, রামচন্দ্রের নীতিহীন কার্যকলাপ ‘সব দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’ মাহাত্ম পেয়ে গেল।
জীবনের শেষদিন পর্যন্ত রামচন্দ্র প্রতিদ্বন্দ্বীহীন অযোধ্যার রাজা ছিলেন। সে রাজ্য যতই ক্ষুদ্র বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হোক না-কেন রাম কিন্তু সেই ‘রামরাজ্য’-এর উত্তরাধিকার পুত্রদ্বয় লব ও কুশ একজনকেও দেননি৷ লব ও কুশ কেউ কোনোদিনই অযোধ্যার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হতে পারননি। জ্যেষ্ঠ কুশ, কনিষ্ঠ লব। তবে অযশ এড়াতে রামচন্দ্র অযোধ্যার রাজসিংহাসনের পরিবর্তে লব ও কুশকে অন্যত্র ‘সেটেল্ড’ করে দিয়েছিলেন। কুশকে প্রতিষ্ঠা করা হল বিন্ধ্যপর্বতের প্রান্তে কুশাবতীর সিংহাসনে এবং লবকে প্রতিষ্ঠিত করা হল শ্রাবস্তীপুরীর সিংহাসনে। পিতা হয়ে পুত্রদের অযোধ্যা না-দিলেও অন্য রাজ্য দিলেন বটে, কিন্তু প্রথামাফিক অভিষেক করলেন না কেন? কেন সম্পূর্ণভাবে অনাড়ম্বর হল এ রাজ্যদান? নাকি ‘উড়ো খই গোবিন্দায় নমঃ। প্রশ্ন হল, রামচন্দ্র কীভাবে কুশাবতী ও শ্রাবস্তীপুরী ভূখণ্ডে যথাক্রমে কুশ ও লবকে প্রদানে সমর্থ হলেন? কুশাবতী ও শ্রাবস্তীপুরী কি রামরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল? যদি থাকে সেটা কীভাবে থাকল? রাম তো লঙ্কাযুদ্ধের পর আর কোনো যুদ্ধ করে রাজ্য করেছেন বলে তো কোনো উল্লেখ নেই। বিনাযুদ্ধে রাজ্য বাড়ে কীভাবে? যদি না-থাকে তাহলেই-বা বিনাযুদ্ধে কুশাবতী ও শ্রাবস্তীপুরী কুশ ও লব প্রাপ্ত করলেন কীভাবে? ভরত ও শত্রুঘ্নকে তো নতুন রাজ্য পেতে রীতিমতো মারণযুদ্ধ করতে হয়েছিল। প্রশ্ন থাকলেও উত্তর নেই!
